কেমন লেখেন সুবর্ণা? এককথায়, স্মার্ট। তাঁর গল্পে থাকে সায়েন্স ফিকশন এবং ফ্যান্টাসির যাবতীয় উপাদান। আবার একই সঙ্গে লেখাগুলো কোথাও যেন বড় মাটির কাছাকাছি। তাঁর গল্পে স্পেশশিপ বা এলিয়েনের সঙ্গেই ঠাঁই পায় প্ল্যাটফর্মে বসে ফল বেচা প্রৌঢ়, ঘরের ঠিকানা ভোলা ভবঘুরে, দারিদ্রে পথে এসে দাঁড়ানো মানুষজন। কিন্তু সব গল্পেই যে জিনিসটা নজরে পড়ে, সেটা হল তাঁর Punch– শেষ কয়েক লাইনের মাস্টার স্ট্রোক বা ভালো বাংলায় মোচড়। তাই এই Punchকাহন নামটা যেমন সেদিক থেকে তাঁর লেখালেখির জন্যে যথোপযুক্ত, তেমনই কোথাও যেন বারবার নামটা বললে মনের মধ্যে পঞ্চকাহন কথাটাও ঘাই মারে।
]]>বয়স বাড়লে যখন চিঠি লেখার অনুমতি মিলল আর জন্ম নিল উত্তরের অপেক্ষা, স্কুলছুটির দুপুরগুলোতে উঁকি দিতাম সদর দরজার লেটারবক্সে। রঘুবীরকাকা নিঃশব্দে ফেলে দিয়ে যেত চিঠি। কেবল উলটোদিকে সুষমাদের বাড়িতে লেটার বক্স ছিল না বলেই হয়তো, একবার হাঁক দিত— চিঠি আছে! লোকটা যন্ত্রের মত বিলি করে যেত। কাঁধের ঝোলায় বয়ে নিয়ে বেড়াত হাজারো মানুষের সুখদুঃখ, হাসিকান্নার দাস্তান।
তখন থেকেই আমার কাছে চিঠি মানে গল্প। জীবনের গল্প। আর লেটারবক্স মানে ছিল গল্পের ভাণ্ডার। ঠিক যেমন গল্পরাও বয়ে চলে অসংখ্য জীবনের বার্তা, কান্নাহাসি, ভালোবাসা আর দীর্ঘশ্বাসের খবর। সেই অর্থে আমার এই তৃতীয় গল্পসঙ্কলন তো আক্ষরিক অর্থেই লেটারবক্স! বত্রিশটা অণুগল্প আর ছয়খান ছোটগল্পে ঠাসা এই ‘লেটারবক্স’ রইল পাঠকদের জন্য।
দেবাশিস সেনগুপ্ত সেই ধরনের লেখক, যাঁদের পাণ্ডুলিপির অপেক্ষায় থাকেন প্রকাশক।
]]>স্বপ্নের ভিতর (দেবাশিস সেনগুপ্ত) এবং শাফুং (সুবর্ণা রায়) কিনলে স্টারডাস্ট (সরিৎ চট্টোপাধ্যায়) ফ্রি।
]]>দেখেশুনে বেকুব বনে যায় রেশমা। জুম্মা জুম্মা সাতদিন হল কাজে ঢুকেছে এই উজিরকোঠিতে। দিনের বেলাতেও গা ছমছম করে। আব্বুর মুখে শোনা নবাবী লক্ষ্ণৌ যেন আটকে আছে এই বাড়িতে। চাচার কাছে শুনেছে কাল, কোন এক ইমদাদ হোসেন খান বানিয়েছিল এই হাভেলি, সেও প্রায় দুশ বছর আগে। নবাবের খাস উজির ছিল। তারপর ওয়াজেদ আলী শাহ নবাব হল। ফিরিঙ্গীরা তাকে খেদিয়ে নিয়ে গেল কলকাতা। ইমদাদ হোসেন যাননি সঙ্গে, এই হজরতগঞ্জেই রয়ে গেলেন। তারপর পাঁচপুরুষ ধরে এই হাভেলিতে। বলতে বলতে চোখটা চকচক করছিল নিয়ামত চাচার।
রোজ সকালে রাবড়ির হান্ডিটা দেখে জ্বলে ওঠে রেশমার চোখও। আব্বু যতদিন বেঁচে ছিল লাডলি রেশমার জন্য মাঝেমাঝেই আসত এই রাবড়ি। চিক্কন বাজারে কাজ করত আব্বু। স্কুল থেকে ফিরে সবজি রোটির সঙ্গে দু-চামচ পাতে বরাদ্দ হত তার। আশ মিটত না। আম্মি বোঝাত — বেটি, মিলেমিশে খেলে সোয়াদ বাড়ে!
এই হুজুরের মতো আব্বুও বলত, খেলে আমিনাবাদের রাবড়ি খাও, হজরতগঞ্জের কাবাব। নইলে খেও না!
দুম করে মরে গেল আব্বু, কিছুদিন পর স্কুল যাওয়াও বন্ধ হয়ে গেল। ভাইয়া ঢুকে গেল গোমতীনগরের চুড়ি ফ্যাক্টরিতে। বাড়িতে রাবড়ি আসাও বন্ধ হয়ে গেল। কাল চাচার চোখ বাঁচিয়ে দু-চামচ চেখে দেখেছে রেশমা, সেই সোয়াদ, সেই বচপন ফিরে এল যেন এক লহমায়। ভয় ছিল খুব, বুড়ো হুজুর যদি ধরে ফেলে!
ফাই ফরমাসের কাজ তার। এদের অবস্থা ভালো না। ছেলে যা সামান্য পাঠায় আর হাভেলির পেছনের বস্তির কয়েকঘর ভাড়া সম্বল। তন্দুরি রোটি, ডাল-সবজিটুকু বানিয়েই হাঁপিয়ে যায় চাচা। চান্দির থালায় ওটুকুই বেড়ে দেয় রেশমা, সঙ্গে বড় বাটিতে রাবড়িটুকু। আজও দু-চামচ মেরে দিয়েছে চাচার চোখ বাঁচিয়ে।
নিজের খাওয়া সেরে সবে উঠেছে, নেমে এল চাচা। এবার এই বুড়োকে খাইয়ে তবে ছুটি।
– লে বেটি, রাবড়ি খা আজ মন ভরে। বাটিটা এগিয়ে ধরে নিয়ামত। চমকে দু-পা পিছিয়ে আসে রেশমা।
– হুজুরসাব খাননি?
গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছে না ভয়ে।
– হুজুরের তবিয়ত ঠিক নেই আজ। বললেন, নিয়ে যাও, নতুন বিটিয়াকে দাও। কাল থেকে তোমরাও নিও। আমিনাবাদের রাবড়ি! মিলেমিশে খেলে সোয়াদ বাড়ে।
মুখে না তুলেও টের পায় রেশমা, বচপন ফিরে আসছে আবার!
না! ধরে ফেলেছে ঋজু! পাখি বেঁচে গেছে। ঋজুর দু-হাতের নরম তালুতে জীবন ফিরে পেয়েছে ছোট্ট মিষ্টি পাখিটা।
মুঙ্কির চিৎকারে দৌড়ে এসেছে, মা, মাসি। মেসো আর বাবা নিচ থেকে দেখতে পাচ্ছে, বারান্দার গ্রিল থেকে বেরিয়ে আছে দুটো কাঁপা কাঁপা হাত।
হুইলচেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে ঋজু। বিজয়ীর হাসি মুখে। হাতের মুঠোয় বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা।
===================
গল্পের নাম ‘কমলার গান’। কলমের নাম সুবর্ণা রায়।
সুবর্ণা রায় অণুগল্প লিখছেন বেশ কয়েক বছর হয়ে গেল। এই বইমেলায় প্রকাশিত হচ্ছে তাঁর দ্বিতীয় গল্প সংকলন ‘শাফুং’। সুমিত রায়ের অলংকরণ আর প্রচ্ছদে মোড়া বইটি সৃষ্টিসুখ-এর ক্যাটালগে অমূল্য সংযোজন।
]]>