আসলে স্রেফ প্রাত্যহিকতায় ভারাক্রান্ত রোজনামচা তো লেখেননি মণিমেখলা। তিনি নিজেকে খুঁড়ে তুলে এনেছেন স্মৃতি-জোনাকি। তার কোনোটি একটু বেশি অতীতের, কোনোটির সঙ্গে হয়তো সময়ের দূরত্ব ততটাও নয়। স্মৃতি আসলে ফেলে আসা যাপনের সাক্ষ্য। ফলে তাতে মিশতে থাকে নানা অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি। কোনও সমসাময়িক ঘটনার সাপেক্ষে তাই চকিতে চলে আসেন গান্ধিজী, কিংবা নিবেদিতার কথা। আবার সেই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আমাদের শিহরিত করে, যখন দেখি লেখিকার পাশে এসে বসেছেন পদাতিক কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। জীবন স্বতন্ত্র। কেন্দ্রে থাকেন একজন মানুষ। কিন্তু সেই এক জীবনের পরিধির মধ্যে ঢুকে পড়েন বহু মানুষ, তাঁদের ধ্যান, জ্ঞান, চিন্তা, চেতনা, উপলব্ধি। এ রোজনামচায় তাই কখনও লেখিকা ফিরে যান রবীন্দ্রনাথের ছিন্নপত্র-র কাছে। কখনও আবার রবার্ট লিন্ড মনে পড়ে যায় তাঁর। জীবন তো এমনই। বহু শাখে, বহু পুষ্পে ক্ষরিত মধু। সেটুকুই ছেনে নিয়ে এসে মণিমেখলা যে রোজনামচা আমাদের সামনে রাখেন, তা আমাদেরও দেয় এক অনির্বচনীয় স্বাদ। পাতা ওলটাতে ওলটাতে কোথাও একটা আমরাও এ জীবনের সঙ্গে একাত্ম হয়ে উঠি। লেখিকার কলমের গুণ এমনই যে, তিনি এক ঝটকায় তাঁর নিজের জীবন ও অভিজ্ঞতার ভিতর পাঠককে টেনে নিতে পারেন। সেটা ওই প্রাইমাল হওয়ার কারণেই। ‘রোজনামচা’র ভিতরে যে যাপনের দর্শন থাকে, সেটাই পাঠকের প্রাপ্তি। মণিমেখলার এ সফরে পাঠক অংশীদার হলে, এ প্রাপ্তি মোটেও হাতছাড়া হবে না, সে কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়।
প্রচ্ছদ ফোটোগ্রাফ – এভগেনি করনোদেভ
প্রচ্ছদ নামাঙ্কণ – উর্বা চৌধুরী
বইটি সম্পর্কে ‘সুখবর’ দৈনিকে প্রকাশিত আলোচনা।

সরিতা আহমেদ-এর ‘ভেবলির ডায়রি’ একজন গড়পড়তা মেয়ের, থুড়ি, একজন গড়পড়তা বাঙালি মুসলমান মেয়ের কাহিনি। আমরা সবাই কমবেশি সেই গল্প জানি। এবং আমরা এও জানি সে গল্প খুব স্বস্তিদায়ক নয়। একজন সচেতন পাঠকের জন্যে এই বই লজ্জার, অস্বস্তির এবং অসুখের। নিজের মুখোমুখি দাঁড়ানোর ইচ্ছে না থাকলে তসলিমা নাসরিনের ভূমিকা সম্বলিত এই বইয়ের সঙ্গে সযত্নে দূরত্ব তৈরি করা আবশ্যক।
বইটি সম্পর্কে ‘সাপ্তাহিক বর্তমান’ পত্রিকায় প্রকাশিত আলোচনা –

এ কাহিনি ধরে যত এগোনো যায়, তত মালুম হয় আশ্চর্য আসলে এই পুরো ভ্রমণটাই। এই ভ্রমণ ঠিক আজকের বা সাম্প্রতিক নয়। আজ পিছু ফিরে তাকালে মনে হয় সে যেন কোনও গতজন্মের কাহিনি। অথচ আমরা তাকে জীবনের আবর্তে ফেলে এসেছি, সংখ্যার হিসেবে হয়তো এই বছর কয়েক আগেই। বছর কয়েক আগেই ছিল সেই কলেজ জীবন, সেই জীবনকে হাত পেতে চেটেপুটে নেওয়ার সু-অভ্যেস। আজও কি তা নেই! আছে হয়তো! তবু ধারালো সময় যখন দুই জীবনের মাঝে চেপে বসে, তখন অজান্তেই যেন একরকমের বিভাজন চলে আসে। অচেনা হয় অতীত। আবার তাকে ছুঁতে ভীষণ মন চায়। তবু তা সম্ভব নয়, সেটাই বাস্তবতা। এই দ্বন্দ্ব হেতুই রক্তক্ষরণ তথা নস্ট্যালজিয়া। সেই মেদুর দৃষ্টি যেন আজ, এই সময়ে দাঁড়িয়ে ওই ভ্রমণ কিস্সার পরতে পরতে খুঁজে পায় কেবলই বিস্ময়। আজ সত্যিই আশ্চর্য মনে হয় সে ভ্রমণ। এ বই তাই ভ্রমণের নয় কিছুতেই, আবার ভ্রমণেরই বটে।
]]>আলগোছে অনিমেষ ভাবনা ছড়িয়ে সরু, কাটা আলপথ পেরিয়ে হনহন চলে লোকটা। মৃদু কুলকুল শব্দে ভুলুকপথে জল এগিয়ে যায় এক সীমানা ছেড়ে অন্য সীমানার দিকে। যাযাবরের নির্দিষ্ট নিয়মের কোনও তোয়াক্কাই করে না সে। কাঁধে ঝুলি, গামছা কিম্বা পাগড়ি, নিদেনপক্ষে হাতে এক গাঁঠওয়ালা তৈলাক্ত বাঁশের লাঠি, এ সব কিছুই তার কাছে অনভ্যস্ত ছদ্মবেশ। মাঠের সীমাহীন আলপথে কুয়াশায় মোড়া ক্ষীণ দৃশ্যমানতায় এগিয়ে চলে লোকটা। তার স্বল্পকেশ আর অনির্দেশ দৃষ্টি সম্বল।
কুকুকুকু আওয়াজে ভৈরবী রাগে বেহালায় ছড় তোলে কোনও মেঘনাদ পাখি। নিকুম্ভিলায় বসার আগে বাজিয়ে নিতে চায় চারপাশের শত্রু অবস্থান। মাঝে মাঝে অরোমান্টিক দাড়িতে হাত বোলায়, চুলকায় লোকটা। গতরাতের নরম মেয়েটার সূক্ষ্ম যোনিভেদের উত্তাল বৃত্তান্ত, এখন আর তার মনে নেই। যেমন মনে নেই কাল সন্ধেয় হাতে গোনা তিন টুকরো রুটি জুটেছিল কিনা ঠিকঠাক! চারদিক সচকিত করে হঠাৎ হাঁচি আসে, গুনে গুনে ঠিক দু-বার।
জীবনের যত ঝর্নাপ্রপাত, বিষাদের সমুদ্রে কল্কেফুলের রঙ পরিবর্তন, সব সবকিছু তুচ্ছ হয়ে যায় এই রাত সকালের সন্ধিক্ষণে। চড়া সূর্যের আলোয় নৌকাবিহীন নদীর জলে আলোর ঝলকানি মুহূর্ত বিপর্যস্ত করে না স্বভাব যাযাবরকে। উশকোখুশকো চুলের গোপন কোণ থেকে উঁকি দেয় সূক্ষ্ম রুপোলি রেখা। কত মুখ এল গেল, কত মুখই রয়ে গেল, হারাল অন্ধকারের নিষিদ্ধ গলিতে। লেগে থাকে সময়ের গায়ে কত না বোঝা অভিমান, না পাওয়া আদর। কোনোদিকে ভ্রূক্ষেপ না করেই এগোয় সে জন। তার কোনও অতীত নেই, ভবিষ্যত নেই। আছে শুধু কুয়াশাময় নিপাট বর্তমান।
ছেঁড়া ছেঁড়া কাটা স্বপ্ন-নকশায় রাত্রি পার হয়। জঙ্গলের দূর ঘনছায়ায় খটখট শব্দে নিশিবাসর চকিতে জাগিয়ে তোলা সাদা লক্ষ্মীবাহন অজর গমন শেষে ঘরে ফিরে যায়। সেইসব তরুণী কস্তুরি মুখ, অথবা কস্তুরি মুখের হরিণী ছায়া, হেমন্তভোরের চুপিচুপি অভিমান হয়ে কুঁড়ি হয়, ফোটে, ফের ঝরে যায় নাছোড় জাতিস্মর স্মৃতির অক্ষম বাহক হয়ে। অগস্ত্য অভিযানে গালের দু-পাশে বলি ক্রমশ গভীর হয়। আলপথ ধরে ভাঙাচোরা অবয়ব এগিয়েই চলে সকল চাওয়ার হাতের ধরাছোঁয়ার সীমানার বাইরে। আঁকাবাঁকা রঙধনু দিগন্তরেখা একবার হলেও ছোঁবেই সে।
লাল কাঁকুরে ল্যাটেরাইট মাটিতে সূর্য ওঠার আগের হিম আর সকালের প্রারম্ভ রোদ্দুর ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে পড়ে। টলমল পায়ে হাঁটে, খিলখিল হাসে। হাসে আর লুটোপুটি খায়। গায়ে মেখে নেয় লাল ধুলোর আদুরে আস্তরণ। ভাঙে নিজেদের অহং, আজন্ম লালিত সংস্কার, অন্ধ কানাগলির বোধ। ভাঙতে ভাঙতে একসময় বিদ্যুৎ চমকের মতো জন্ম নেয় গোলাপি মুক্তোর খণ্ড।
একমুখ দাড়ি, গোঁফ আর ঝাঁকড়া চুল, কতদিনের না কাচা জামা আর বোতাম ছেঁড়া জিনস সম্বল লোকটা হেঁটে চলে সযত্নে মুক্তোগুলোকে পাশ কাটিয়ে। সম্পূর্ণ উদাস দুটো চোখে পৃথিবীর কোনও অনাচার কিম্বা আপাত দুর্লভ সম্পদমায়া কোনও ছাপই ফেলতে পারে না। একে একে পার হয় রুক্ষ অকৃষিযোগ্য মাঠের আল।
কোন দূরে সদগোপ গৃহস্থ সন্ধানী চাউনিতে খুঁজে ফেরে আগের রাতে গোয়ালের নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে না ফেরা গাভীর ঝুন্ড। সেদিকে একঝলক তাকিয়েই এলোমেলো লোকটার মনে পড়ে যায় গতরাতের স্বপ্নে রাগী মোষের লেজ কেটে নেওয়ার বিক্ষিপ্ত সিদ্ধান্ত। ঘুমভাঙা পাখিদের চমকে দিয়ে একাকী প্রান্তর কাঁপিয়ে হা হা করে হেসে ওঠে সে। স্বপ্নেও তাকে পালাতে হয় ক্রুদ্ধ মোষের তাড়া থেকে উদাসীন জীবন বাঁচানোর নিষ্ফল চেষ্টায়।
এইভাবে জীবনও তাড়া করে। আশেপাশে লোভী হাত যখন নির্জন রাতে কাজফেরত যোনির ওপর হামলে পড়ে। নেশাড়ু মননে ফাঁকা রাস্তায় ব্লাউজ ছিঁড়ে অনাবৃত করে সুডৌল স্তন।
যখন বলিরেখা আঁকা মুখের সামনে নেচে বেড়ায় শেষ বয়সের সম্বল দেবার আশ্বাসে অর্থলোলুপ হাত। বহু বসন্ত দেখা বৃদ্ধ চোখের সামনে নেমে আসে গাঢ় শীত। বরফ পড়ে। পাতা হারিয়ে সবুজ গাছেরা মৃতপ্রায়।
যখন চোদ্দো বছরের বিবাহিত জীবনে নপুংসক কিলবিলে হাত শুধু ঘুষি মেরে যায় কোমল প্রত্যঙ্গে। কালশিটে দেখে ভোগ করে নরকের দাউদাউ আনন্দ। চুরি করে বেচে দেয় কামনা মেটানো সোনালি শৈশব।
তখনও লোকটা দৌড়ায়। আধঘন জঙ্গলের আঁকাবাঁকা গাছেদের এড়িয়ে খোলা প্রান্তরের সীমানার দিকে।
খোঁচা খোঁচা আগাছার ভিড়ে শুধু মশাদের গুনগুন। সূর্য ওঠে। লাফ দেয় দেরি হয়ে যাওয়া নৈমিত্তিক দিনের শুরুতে। লোকটা হাঁটে নির্বোধপ্রায় চাউনির মরা আভা দিয়ে পথ খুঁজে খুঁজে।
কোথাও ধানকলের ভোঁতা সাইরেন জানান দেয় — ভাত দাও গো! বড় খিদে আজ চড়াপড়া এ পেটসর্বস্ব দেহে!
]]>আজ দিনটা বেশ গোলমেলে। বিশুদ্ধ পঞ্জিকা মতে আজকের দিনে মেষজাতকের কুলোকের কথায় কান দিতে নেই। অথচ, আজ কী কুক্ষণে সায়ন্তিকার বাবার ফোন এল। আমার মতিভ্রম হয়েছিল অথবা গ্রহ বিপর্যয় ঘটেছিল নিশ্চয়, নাহলে ফোনটা ধরলাম কেন?
ধরেই যখন ফেলেছি, অগত্যা কালমেঘ খাওয়া মুখ করে বললাম, “ভালো আছেন কাকু?”
ওপার থেকে হাঁড়িচাচা মাফিক আওয়াজ এল, “ভালো তো থাকবই। ভালো থাকব না মানে? তুমি কি চাও যে আমি ভালো না থাকি?”
“ইয়ে মানে, ছি ছি, কী যে বলেন কাকু। আমি কেন চাইব না যে আপনি ভালো থাকুন। আমি তো সব সময় চাই যে আপনি আরও ভালো থাকুন। আপনার বকেয়া ডিএ একলপ্তে প্রাপ্তি ঘটুক। লুপ্ত যৌবন ফিরে আসুক। সাদা চুল কালো হোক। পেটের ব্যথা, অম্বল সেরে যাক…”
“কী হে ছোকরা… তোমার সাহস তো কম নয়। ইয়ার্কি করছ আমার সাথে। জানো আমি তোমার বাবার বয়সি?”
“তাই নাকি, জানতাম না তো… ইসস… আমি তো ভাবতাম আপনি জাস্ট থার্টি।”
“ফাজলামো হচ্ছে? শোনো খোকা, নেহাত আমার মেয়ে তোমাকে পছন্দ করে, নাহলে তোমায় উচিৎ শিক্ষা দিয়ে দিতাম। আর আমি তো বুঝতেও পারি না যে তোমার মতো একটা গণ্ডমূর্খের সাথে সায়ন্তিকা বাকিটা জীবন কাটাবে কী করে?”
আমি যে গণ্ডমূর্খ, এই সারসত্যটা আমার মাস্টারমশাইরা বহুকাল আগে থেকেই জানিয়ে দিয়েছেন। তবুও বিদ্যাসাগর মশাই তো কোনকালে বলে গিয়েছেন যে কানাকে কানা, খোঁড়াকে খোঁড়া আর গণ্ডমূর্খকে গণ্ডমূর্খ বলতে নেই। তাই হেব্বি রাগ হল। না হয় আমি একটা পাতি ইস্কুল মাস্টার আর সায়ন্তিকার বাবা একটা সরকারি বিভাগের ডেপুটি ডিরেক্টর। তাই বলে অ্যাইসা অপমান? বাছা বাছা কিছু উত্তর মুখে আসছিল। সেগুলো চেপে দাঁত কেলিয়ে (মানে, ফোনে যতটা দাঁত ক্যালানো যায় আর কী), গলায় স্যাকারিন ঢেলে বললাম, “কাকু, আপনি একদম চিন্তা করবেন না। আপনার সাথে গত তেইশ বছরের অভিজ্ঞতাই ওকে আমার সাথে বাকিটা জীবন কাটাতে সাহায্য করবে।”
]]>গতবছর বইমেলায় তাঁর ‘তোমার পরশ আসে’ প্রকাশের পরে যে ভালোবাসা পাঠককুল ফিরিয়ে দিয়েছেন, তা এককথায় আমাদের জন্যে অভূতপূর্ব। এই বছর কলকাতা বইমেলায় প্রকাশিত হল বিমোচন ভট্টাচার্য-র ‘চেনা আলো চেনা অন্ধকার’। নিচে রইল বইটি থেকে একটি ছোট গদ্য।
===============
নিতাইদাকে মনে আছে তো আপনাদের? প্রতিদিন আমাদের পাড়ার মন্দিরে মা কালীকে গান শোনান। রাতে যাবার সময় ওয়ান্নিং দিয়ে যান মা কালীকে। মনে পড়ছে? সেই লকাই আর নিতাইদা।
তো এই নিতাইদা পেশায় ইলেক্ট্রিসিয়ান। থাকেন আমাদের আবাসনের পেছনদিকের রেল কোয়ার্টারে। আমাদের পাড়ায় কাজ করেন না। একটি দোকান আছে শুনেছি নাগেরবাজারের কাছে। সেই এলাকাতেই কাজ করেন।
প্রায় কুড়ি বছর দেখছি আমি নিতাইদাকে। যখন রেগুলার আড্ডা মারতাম, তখন রোজ দেখা হত। এখন কোনোদিন রাতে ক্লাব থেকে ফেরার পথে দেখা হয়ে যায়। মা কালীর সাথে কথোপকথন শেষ করে বাড়ি ফিরছেন। একগাল হেসে আমায় বলেন, “ভালো তো ব্রাদার?” পেছন পেছন যায় রাজ্যের কুকুর। ওদের বিস্কুট খাওয়াতে খাওয়াতে বাড়ি ফিরে যান নিতাইদা। বলে রাখা ভালো, এতদিনে কোনোদিন নিতাইদাকে সকালে দেখিনি আমি।
গত সোমবার আমার বাড়ির একটা পাখা খারাপ হয়ে গেল হঠাৎ। আমার বাড়ির ইলেক্ট্রিসিয়ান বলরাম বাইরে গেছে। আর কাউকে পেলাম না। এদিকে এই গরমে পাখা ছাড়া চলবে না। ভাবলাম, আরে নিতাইদা তো ইলেকট্রিক মিস্তিরি। যাই একবার।
ভিলার পেছনদিকের রেল কোয়ার্টারে গিয়ে জিজ্ঞেস করতে ওরা দেখিয়ে দিল নিতাইদার বাড়ি। দোতলা কোয়ার্টারের একতলায় যারা থাকেন, অধিকাংশই রেলের কর্মচারী নয়। সাবলেট করা। বেশিরভাগ বিহারী। একটি বাড়ির (এগুলিকেই মনে হয় ব্যারাক বলা হত) একেবারে শেষ ঘরটা নিতাইদার। ডাকলাম। একটা লুঙ্গি পরে খালি গায়ে বেরিয়ে এলেন নিতাইদা। বললেন, “কী চাই বলুন?” চিনতেই পারলেন না আমায়। বললাম, “একটা পাখা খারাপ হয়েছে বাড়ির।” কথা বাড়াতে দিলেন না নিতাইদা, রাগত স্বরে বললেন, “আপনাকে কে বলেছে আমি পাখা সারাই?” আমি বললাম, “কেউ বলেনি, শুনেছিলাম আপনি ইলেক্ট্রিসিয়ান।” আরও রেগে গিয়ে বললেন, “কে আপনাকে কী বলল সে নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। শালা, জোটেও সব আমার কপালেই। কোন শুয়োরের বাচ্চা রটিয়ে দিয়েছে যে আমি ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রি, রোজ বাঁ* কেউ না কেউ চলে এসে বলছে, পাখা সারাও, আলো সারাও। যান তো মশাই। আর কোনোদিন এলে গাঁ* ভেঙে দেব। চিনি না, শুনি না চলে এসেছেন বাঁ* সক্কাল সক্কাল নিতাইদার গাঁ* জ্বালাতে।”
বাইরে এলাম। কাল লাল হয়ে গেছে আমার অপমানে। দেখি শংকর, আমার গাড়ি চালায় মাঝে মাঝে। বলল, “কাকু, নিতাই জ্যেঠুর ওখানে গিয়েছিলেন কেন?” বললাম কেন গিয়েছিলাম। শংকর বলল, “নিতাই জ্যেঠুর ছেলেটা গলায় দড়ি দিয়েছে দু-দিন আগে। কাল বডি পেয়ে শ্মশান থেকে অনেক রাত্রে ফিরেছি আমরা। আর তাছাড়া কাকু, নিতাইজ্যেঠুর লিভারে ক্যান্সার ধরা পড়েছে দিন পনেরো আগে। কিছু মনে করবেন না। নিতাই জ্যেঠু কিন্তু এমন মানুষ নয়।” চলে এলাম বাড়িতে। মনটা খারাপই হয়ে থাকল।
কাল রাতে বাড়ি ফিরছি ক্লাব থেকে দেখি নিতাইদা ফিরছেন। আজ একটু বেশি খেয়েছেন মনে হয়। পেছনে কুকুরের দল নিয়ে নিতাইদা বাড়ি ফিরছেন। আমি পাশ কাটিয়ে চলে আসব, আমার দিকে চোখ পড়ল নিতাইদার। হাত তুলে একগাল হেসে বললেন, “কী ব্রাদার, দেখতেই পাচ্ছো না যে গরিব দাদাকে। অনেকদিন দেখি না। শরীর ভালো আছে তো?”
ভাবছিলাম কতদিনই বা বাঁচবেন আর নিতাইদা। কিন্তু নিতাইদা চলে গেলে বড় ফাঁকা ফাঁকা লাগবে বাসস্ট্যান্ডের মন্দিরটা। ফাঁকা ফাঁকা লাগবে রাতের পাড়াটা। চলে তো যাবেনই নিতাইদা। নোটিশ তো পেয়েই গেছেন হাতে। যেতে হবেই ঘর খালি করে।
আজ না হয় কাল…

বুদ্ধদেব গুহ
]]>