https://www.goodreads.com/book/show/54279707
কিছুদিন পর-পরই নানা গ্রুপে পাঠকেরা একটা প্রশ্ন তোলেন— “হুমায়ূন আহমেদের মিশির আলি সিরিজ পড়ে আমি মুগ্ধ। এইরকম আরও লেখা পড়তে চাই। সন্ধান দিন।”
সত্যি বলছি, আমি নিজেও এইরকম লেখার সন্ধান করে চলেছিলাম দীর্ঘ-দীর্ঘদিন ধরে। অ্যাবনরমাল সাইকোলজি আর প্যারাসাইকোলজির অমন মিশ্রণ আর স্বাদু ভাষা যিনি পড়েছেন তিনিই ওইরকম লেখা আরও খুঁজবেন। সেটাই স্বাভাবিক।
পাইসি!
নবীন লেখক দেবব্রত বিশ্বাস-এর এই বইটি প্রায় ‘নীরবে দূরে’ প্রকাশিত হয়েছিল গতবছর। সুমিত রায়-এর করা প্রচ্ছদ দেখে ধারণা করাও অসম্ভব যে এই শীর্ণকায় বইটিতে এমন কিছু থাকতে পারে। তাই বইটা হাতে নিয়েও যদি কেউ রেখে দিয়ে থাকেন তাহলে তাতে কিছুমাত্র অস্বাভাবিকত্ব নেই।
ঠিক কী আছে এই বইয়ে?
পদার্থবিদ্যার শিক্ষক অরণ্য রায় নিভৃতচারী। ক্লাস নেওয়া, জটিল গণিতে ঠাসা বইয়ে ডুবে থাকা, আর বিকেলবেলা কৃষ্ণসায়রের চারপাশে দু’পাক হাঁটা— মোটামুটি এটাই তাঁর দিনলিপির বিষয়। একাকিত্বের সঙ্গে “তুমি একজনই শুধু বন্ধু আমার, শত্রুও তুমি একজন” সম্পর্কে আবদ্ধ অরণ্যের দুটি অদ্ভুত অভিজ্ঞতা নিয়ে এই বই।
প্রথম কাহিনি ‘বেলাশেষের গান’।
অরণ্য’র বৈকালী ভ্রমণের সময় তাঁর সঙ্গে আলাপ হয় একজনের। মানুষটি অসম্ভব ভালো গল্প বলেন। কিন্তু তাঁর আচরণ রহস্যময়। যে আখ্যানটি তিনি বলছেন সেও ভারি অবাক-করা। মানুষটি দাবি করেন, তাঁর লেখা গল্পরা নাকি সত্যি হয়ে যায়! এদিকে গল্প অসম্পূর্ণ থাকার মাঝেই অরণ্য’র সঙ্গে দেখা করতে আসে এক অপরূপা— যার কথা ও আচরণের অর্থ না বুঝলেও তাকে উপেক্ষা করতে পারে না। সব মিলিয়ে বোঝা আর না-বোঝার অদ্ভুত কুয়াশায় হারিয়ে যেতে থাকে অরণ্য।
কে এই লেখক, যাঁর নাম আগে কখনও শোনেনি অরণ্য? তাঁর বক্তব্য কি সত্যি? কী চান তিনি? আর… কে ওই মেয়েটি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা নিয়েই লেখা হয়েছে অত্যন্ত চমৎকার বড়োগল্পটি। এতে কিছু-কিছু বর্ণনার মেদুরতা, ন্যারেটিভের মাঝে নানা বৈজ্ঞানিক তথ্য, জীবনানন্দের কবিতা— সব পড়ে সত্যিই বড়ো বেশি করে মনে পড়ে মিশির আলি’র স্রষ্টাকে।
দ্বিতীয় কাহিনি ‘মরণের এপার হতে’।
কোয়ান্টাম থিওরি দিয়ে কি অবচেতনের রহস্য ভেদ করা যায়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে অরণ্য যখন বিভ্রান্ত, সেইসময় এক চিকিৎসক অরণ্যকে আহ্বান জানান তাঁর বাড়িতে ক’দিন থেকে যাওয়ার জন্য। সেখানে গিয়ে বোঝা যায়, চিকিৎসা করতে গিয়ে ডাক্তারটি এমন বেশ কিছু রোগীর সান্নিধ্যে এসেছিলেন, যারা মৃত্যুর খুব কাছে গিয়েও ফিরে এসেছে। তাদের সেইসব নিয়ার ডেথ এক্সপিরিয়েন্স তিনি রেকর্ড করে রেখেছেন। তাঁর অনুরোধে অরণ্য সেই রেকর্ড বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এমন একটি প্যাটার্ন পায় যার অর্থ অত্যন্ত মারাত্মক। এরই মধ্যে তার সঙ্গে ঘটে যায় এক ব্যাখ্যাতীত ঘটনা।
কী হয় এরপর? অরণ্য কি খুঁজে পায় এ-সবের অর্থ?
এই কাহিনিতে মায়াবি বর্ণনা কম, কিন্তু রহস্য সেই শূন্যস্থান পূর্ণ করেছে৷ একরাতে ঘুম ভেঙে অরণ্য’র যে অভিজ্ঞতা হয় তা পড়তে গিয়ে আমার রীতিমতো গা-ছমছম করছিল— এ-কথা অকপটে বলি। গল্পের শেষে সমাধানটিও চমকপ্রদ। হয়তো ‘বৃহন্নলা’-র উচ্চতায় উঠতে পারেননি লেখক। তবে তিনি সঠিক পথেই এগিয়েছেন।
আমার খুব-খুবই ভালো লেগেছে এই দু’টি লেখা। ভরসা রাখি, পাঠকের আনুকূল্য পেলে লেখক এই ধারায় আরও লেখা উপহার দিয়ে আমাদের ‘অরণ্যচারী’ করে রাখবেন।