ইফতার // সুব্রত রুজ

নারকেল দড়ি দিয়ে গাড়ির তলা থেকে ঘষে ঘষে কাদা তুলছিল বাবা, আর আমি মগে করে জল দিচ্ছিলাম। গরমের সময় রাস্তায় কাদা থাকে না, মোরামের লাল ধুলোটাই গাড়িতে লাগে, দু বালতি জল মারলেই ধুয়ে নেমে যায়। এখন বর্ষাকাল, রাস্তায় কাদা হবেই। কাল বৃষ্টি হয়েছে, আজকে গাড়ির তলায়, পাশে ছিট-ছিট কাদা। মাডগার্ড চারটে থেকে তো বোধ হয় চার কুইন্টাল কাদা বেরোল।
বাবা বলল, “পুকুরে নিয়ে গেলে ভালো হত, বল বেটু।”
মা একপাশে ঠাকুরের বাসন মাজছিল। বাসনের থেকে চোখ না তুলেই বলল, “মোটামুটি সাফ তো হয়েই গ্যাছে, এখন আর পুকুরে গিয়ে কাজ নেই। মুছে নাও, নিয়ে কাঁঠালগুলো বাঁধো। নিয়ে খেতে বসবে বাপ-ব্যাটায়। ভাত তরকারি সব হয়ে গ্যাছে।”
বাবা থলি থেকে শুকনো কাপড় বার করল, “নে বেটু, ওপরটা মোছ। আমি নীচটা দেখছি।”
আজ হাটবার। নসিমপুরের হাটে যাব আমরা। অন্যদিন আমাকে যেতে লাগে না, বাবা একাই যায়। আজ আমিও যাব। চারটে কাঁঠাল আবুখুড়োর আড়তে পৌঁছে দিতে হবে। কাঁঠালগুলো দড়ি দিয়ে বাঁধা থাকবে, তাও একজনকে ধরে বসতে হবে। গাড়ির ঝাঁকুনিতে যদি ফেটে যায়, আবুখুড়ো অমনি পঞ্চাশ টাকা কমিয়ে দেবে। গুরুদেব মাল। ওই জন্যেই বোধ হয় সবাই ওকে খুড়ো বলে। এরকম যন্তর পৃথিবীতে দু-চার পিসের বেশি আসে না, এটাই ভগবানের দয়া। বাবা থলি খুলে দড়ি বার করল। চটের বস্তার ওপর শুইয়ে তারপর বাঁধতে হবে কাঁঠালগুলো।
আমাদের বাড়িটা ফলের আড়ত। আম, জাম, কাঁঠাল, পেয়ারা, জামরুল কুল কিছু বাদ নেই। হাফ ডজন কলাগাছও আছে। সারা বছর ফল হয়। এই ফলবাগানের শুরু আমার ঠাকুরদার বাবা, বাবা যাকে শুদ্ধ করে বলে প্রপিতামহ, ওঁর হাত দিয়ে।
সেই কোন জম্মে, দেশ যখন ভাগ হয়ে ভারতের পুবদিকের একটা খাবলা রাতারাতি অন্য দেশ হয়ে গেল, সেই সময় তিনি আরও পাঁচজনের মতো বউ-বাচ্চা নিয়ে এক কাপড়ে ‘হিন্দুগো দ্যাশে’ উঠে আসেন। বইয়ে পড়েছি, কিছুটা এর-ওর মুখে শুনেছি বাংলার তখন ভয়াবহ অবস্থা। কাতারে কাতারে লোক এসে কলকাতা ভরিয়ে দিয়েছে। শতকরা নব্বই ভাগ লোকের আপনি আর কপনি সম্বল। তারা কলকাতার আশেপাশে কলোনি বানাচ্ছে, নয়তো শিয়ালদায় গুঁতোগুঁতি করছে।
সবার মতো আমাদের সেই ‘প্রপিতামহ’ প্রথমটা কিছুদিন শেয়ালদা স্টেশনে আস্তানা গেড়েছিলেন। সে আমলের লেখাপড়া জানা লোক, ভদ্রলোকের খোপড়িতে কিছু ‘গ্রে ম্যাটার’ ছিল। পরিস্থিতিটা ভালো করে মাপজোখ করে বুঝলেন তাঁর মতো দুবলা মানুষের একটু তফাতে থাকাই ভালো। সবাই যখন কলকাতার আশপাশে মাথা গুঁজতে ব্যস্ত, উনি সেই দলে না ভিড়ে খোঁজপাত করতে লাগলেন অন্য কোথাও ঠেক নেওয়া যায় কিনা। ভগবানও সাথ দিলেন। নারানগঞ্জে ওঁর কোনও যজমান, তার ভাইয়ের বন্ধুর মায়ের কোনও ফুফেরা ভাই তাঁর মায়ের কোনও বকুলফুলের গঙ্গাজলের ননদের ভাসুরপোর সন্ধান দিল। নাম গিরিশ সাহা, পতা – গ্রাম তলতাডাঙা, পোস্ট বক্তিয়ারপুর, জেলা বীরভূম। গিরিশ সাহা কেউকেটা। গাঁয়ের একজন মাতব্বর। মালদার পার্টিও বটে। মদের ব্যবসা, সুদের ব্যবসা, একগাদা জমিজমা। মালকড়ি বেশ বুক বাজিয়ে বলার মতো। নির্ঝঞ্ঝাট জায়গা, গ্রামের বেশিরভাগ লোক তিলি এবং ভূমিজ। গ্রামে বামুন নেই, কাজকম্মে পাশের গ্রাম থেকে ধরে আনতে হয়। বামুন পেলে মাথায় করে রাখবে।
‘জয় রাধামাধব’ বলে তাঁর যজমানের সেই ভাইয়ের বন্ধুর মায়ের ইত্যাদি ইত্যাদির সামনে এসে হাতজোড় করে দাঁড়ালেন একদিন। আগেকার লোকগুলো একটু কম হারামি ছিল, সহজেই বাড় খেয়ে যেত। আমাদের ‘প্রপিতামহ’ যখন সামনে এসে হাতজোড় করে দাঁড়ালেন, গিরিশ সাহা নাকি দাঁত-টাঁত কেলিয়ে ভুঁয়ে গড়াগড়ি, “আরে আরে করো কী, করো কী ভায়া, তুমি সম্পক্কে ভাই হচ্চ, তাপ্পর হলে গিয়ে বাউন, আমায় নমোসকার কচ্চ, আমার পাপ লাগবে না?”
তা বাপের ব্যাটা ছিল বটে গিরিশ সাহা। গাদাখানেক জমিজমা পেছন উলটে পড়ে ছিল, তার একটায় দিল আমাদের সেই প্রপিতামহকে বসিয়ে। জমির পরিমাণ কম ছিল না, দু বিঘের ওপর। ঝোপ-জঙ্গল ভর্তি ছিল। সেসব কাটিয়ে কুটিয়ে দিল, দুটো মেটে ঘরও তুলে দিল নিজের খরচায়। পাঁজিপুথি দেখে ঠাকুরদার বাবা একদিন ‘জয় গৌর’, ‘জয় রাধামাধব’ বলে গৃহপ্রবেশ করলেন।
প্রপিতামহ মশায় তলতাডাঙায় কেবল বউ-বাচ্চাই আনেননি, গৃহদেবতা রাধামাধবকেও সঙ্গে এনেছিলেন। বামুনের ঘরে রাধামাধবের পুজোর লাফড়া আছে। রোজ অন্নভোগ, নিদেন একটু পায়েস, সন্ধের শীতলে দু-চার কুচো ফল দিতেই হয়।
ভেবেচিন্তে ঠাকুরদার বাবা কটা ফলের গাছ লাগিয়ে দিলেন। ঠাকুরের ভোগের জন্য তাহলে ভাবনা থাকে না। ছেলেপুলেগুলোও একটু-আধটু খাবে। পরের দু পুরুষে আস্তে আস্তে পুরো জায়গাটায় ছোটোমতো একটা ফলবাগান দাঁড়িয়ে গেল। ফলও তেমনই হয়। খেয়ে বিলিয়েও বছরে হাজার পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন টাকার মাল বেচি আমরা। সার-ওষুধ বাদ দিলেও তিরিশ-বত্রিশ হাজার হাতে থাকে।
“কই রে, অইল তগো? গাড়ি ঘইস্যাই তো বেহানবেলা পার কইরা দিলি। হাটে যাবা, কহন ফিরবা তার ঠিক নাই, দু-গা চাল-জল প্যাটে দিতে অইব তো, না কি? ভাত তো জুড়াইয়া পান্তা অইল।”
দুজনেই আঁতকে উঠেছি। কেস পুরো জন্ডিস। ঠাকুমা ময়দানে নেমেছে। বাবা চোখ মারল, “বেজা বামনি খেপেচে, শিগগির চ, আগে ডিজেলটা নিয়ে নিই, তাপ্পর কাঁঠাল বাঁধব অ’ন। নইলে কাঁঠালের বদলে পটল তুলতে হবে।”
দুজনেই ল্যাজ তুলে দৌড়। বেজা বামনির গলা শুনে যার পেছন হলদে হয়ে যায় না, সে এখনও মায়ের গর্ভে।

নসিমপুর যেতে হলে আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়েই যেতে হবে। মোরামের রাস্তা চলে গেছে ট্যাংরাশোল মোড় অবধি। ওখান থেকে পাকা রাস্তা ধরে বারো-তেরো কিলোমিটার গেলেই নসিমপুর। আজ হাটবার। মাঝে মাঝেই ভ্যানোর ফটফট আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। সবজি-চাল-কাপড়-বাঁশ কী বেতের জিনিস নিয়ে নসিমপুর যাচ্ছে। আমরাও যাব। অন্যদিন লোকের মাল যায়, আজ নিজেদের মাল যাবে বলে বাবা অন্য ভাড়া নেয়নি।
হাত ধুয়ে বসে গেলাম দুজনে। আলু, ঝিঙে আর কুচোচিংড়ি দিয়ে একটা তরকারি, আর লাল-চালের ফেনাভাত। মা ব্যাপক নামিয়েছে তরকারিটা। ফেনাভাত দিয়ে যা লাগছে না, মনে হচ্ছে পুরো হাঁড়িটা একাই মেরে দি।
থালার ভাতটা সাপটে মেরে আর একটু নেব কিনা ভাবছি, এমন সময় একটা ভ্যানো আমাদের বাড়ির সামনেই এসে থামল, তার সঙ্গে মেয়েছেলের হাঁউমাউ চিৎকার। এঁটো হাতেই দৌড়ে বেরিয়ে এসেছি, নির্ঘাত কারও মাল পড়ে গেল। পেছন পেছন বাবা-মা-ঠাকুমা-বুনি সবাই বেরিয়ে এসেছে।
বাইরে এসে ** রগে উঠে যাবার জোগাড়। বক্তিয়ারপুরের ছোটু শেখ ভ্যানো নিয়ে দাঁড়িয়ে। ভ্যানোর ওপর কাপড় মোড়া একটা মেয়েছেলে। চোখ বোজা, দুটো হাত দিয়ে পেট খামচে ধরে আছে। তাকে ধরে বসে আছে ওদের পাড়ার গোলাপি পিসি। সামনে আবুলদা দাঁড়িয়ে। যে হাঁউমাউ চিৎকার শুনে বেরিয়ে এসেছি, সেটা গোলাপি পিসির।
ক সেকেন্ড সবাই থ। কাণ্ড দেখে অমন জাঁদরেল যে বেজা বামনি, সে সুদ্ধু ব্যোমকে গেছে।
বাবাই সবার আগে নিজেকে কবজা করল, “অ্যাই আবুল, কী হয়েচে?”
ছোটু, আবুলদা আর গোলাপি-পিসির কথায় যা বুঝলাম কাপড়ে মোড়া মেয়েটা হাসনু বউদি, আবুলদার বউ। এমন করে মুড়ে এনেছে, চিনতেই পারিনি। একটু আগে ঘরের কাজকম্ম করতে করতে হঠাৎ পেট চেপে ধরে লটকে পড়ে যায়। পেটের ব্যথায় একবারে কাটা ছাগলের মতো ছটফট করছিল। ছোটুর গাড়ি করে বউদিকে ওরা সাজিডাঙার হেলথ সেন্টারে নিয়ে গেছিল, ওখানে একটা কী ইনজেকশন দিয়ে বলেছে নসিমপুরের হাসপাতালে নিয়ে যেতে। ওরা নসিমপুর যাচ্ছিল, হঠাৎ দেখে আমাদের গাড়িটা খালি দাঁড়িয়ে আছে। সেজন্য ওরাও দাঁড়িয়ে পড়েছে। যদি খালি পায়, তাহলে আমাদের গাড়িতেই নিয়ে যাবে। ভ্যানোয় হাসপাতালে যেতে লাগে কম করেও দেড় ঘণ্টা। আমাদের ছোটো হাতি করে গেলে চল্লিশ মিনিট, জোর পৌনে ঘণ্টা। মাঝেমধ্যে এরকম সিরিয়াস পেশেন্ট নিয়ে বাবা নসিমপুরে যায়। টপ করে পেছনের ডালা খুলে দিল, “ওঠা, নিয়ে এক সাইডে শুইয়ে দে।”
আমরা তিনজন ধরাধরি করে বউদিকে তুললাম। বউদির এমনিই পাতলা চেহারা। বেশি কষ্ট হল না। আমি মাথার দিকে ধরেছিলাম। বউদি ওই ব্যথার মধ্যেও একবার চোখ খুলে আমার দিকে তাকিয়ে ফিকে হাসল।
মনটা খারাপ হয়ে গেল। আবুলদাদের বাড়ির সঙ্গে আমাদের আজকের সম্পর্ক নয়। হাসনু বউদিকে বিয়ে হয়ে আসতে দেখেছি আমি। আমাদের এই অঞ্চলটা আগে বাঁশবনে ভর্তি ছিল। ফলে এই এলাকায় বক্তিয়ারপুর, নসিমপুর, সাজিডাঙা, টোকাইডাঙার অধিকাংশ লোক এককালে বাঁশের কাজ করে ডালরুটি কামাত। আশপাশের গ্রামের নামগুলো খেয়াল করলেই ব্যাপারটা বোঝা যায়। আমাদের গ্রামটা যেমন তলতাডাঙা। তলতা বাঁশ দিয়ে বাঁশি হয়। এছাড়া সাজিডাঙা, টোকাইডাঙা আছে। মানে এককালে এইসব গ্রামের সাজি বা টোকাই বিখ্যাত ছিল। এখন সে বাঁশও নেই, বাঁশিও নেই। তবুও কিছু লোক এখনও বাপঠাকুরদার পেশা আঁকড়ে পড়ে আছে। ওরা বাঁশের ঝুড়ি, টোকা, টোকাই, ঘুনি, মোড়া এইসব বানায়। কৃষিপ্রধান এলাকা, তাই এগুলোর চাহিদাও আছে।
আবুলদারা এই দলের। ওর বাবা সুলতানকাকার আমল থেকে বাবা ওদের পাড়ার মাল নিয়ে যায়। তাদের বাবারা নিজেরাই বাঁকে করে মাল নিয়ে যেত, তারপর এল সাইকেল ভ্যান। বাবা গাড়ি কেনার পরে বাবার গাড়িতে মাল নেওয়া শুরু হল। বাবার সঙ্গে অনেকবার ওদের পাড়ায় গেছি, এখনও যাই। বসিরকাকা, আবুলদা, মানোকাকারা খুব খাতির করে। আবুলদাদের বাড়িতে যতবার গেছি, হাসনু বউদি আর জাপানি কাকিমা সেই ছোটোবেলার মতো দাঁড়িয়ে থেকে চিঁড়ের মোয়া, মুড়ি, নকুলদানা খাওয়াবে। আপত্তি করলে মিটিমিটি হাসে, “কাকার বাড়ি থিকা কিছু মুখে না দিয়া যাইতে আছে ভাই?”
বাবা তাড়া মারল, “কাঁঠাল চারটে ফটাফট তোল, নিয়ে প্যান্ট পরে আয়।” বাবা কাঁঠাল তুলতে বলায় প্রথমটা একটু হড়কে গেছিলাম, তারপরেই ব্যবস্থাটা মাথায় সেঁধিয়ে গেল। এখন রমজান চলছে। ফলের এখন চড়া বাজার। বাজারে চারটে কাঁঠালের দাম কম করে বারোশ টাকা। আবুখুড়োর কাছে মাল নামিয়ে বাবা টাকা নিয়ে নেবে। আবুখুড়ো পার পিস একশ করে রাখবে। তাহলেও কমসম আটশ টাকা তো পাওয়া যাবেই। সঙ্গে রোগি থাকবে। আবুলদা সাথে কত কী এনেছে না এনেছে, হাতে কিছু নগদা থাকা ভালো।
হাতাপাই করে আমি আর আবুলদা কাঁঠাল চারটে বউদির পায়ের তলায় শুইয়ে দিলাম। তারপর ওরা গাড়িতে উঠল, আমি ছুটলাম প্যান্ট পরতে।
পাঁচ মিনিটের মধ্যে গাড়ি ছেড়ে দিল। ঠাকুমা আর মা জোড়হাত করে কপালে ঠেকাচ্ছে ‘দুগ্গা, দুগ্গা’।

হাটবারে রাস্তায় ভিড় আছে। হাটে পৌঁছতেই চল্লিশ মিনিটের ওপর লেগে গেল। হাটটা বসে রাস্তা থেকে শ-দুই মিটার ভিতরে কালীতলার মাঠে। আবুখুড়োর আড়ত রাস্তার ওপরেই না হলে আরও দেরি হত।
কাঁঠাল চারটে নামিয়ে দিয়ে বাবা বলল, “চাচা, হাজার খানেক দাও না, পরে হিসাব করে নিও।” আবুখুড়ো বাবার পা থেকে মাথা অবধি একবার মেপে নিল। মনে মনে ভাবছি খিস্তি দিয়ে না গোপাল বাঁড়ুজ্জের গুষ্টি উদ্ধার করে। কিন্তু মুখে কিছু না বলে বাক্স থেকে একটা পাঁচশ আর দুটো একশর নোট বাবার দিকে বাড়িয়ে দিল। আমরা বাপ-ব্যাটা একবার মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। খুড়োর হলটা কী? ও যা যন্তর অন্য সময় হলে পাঁচশর বেশি একটা আধলা ঠেকাত না। এতদিন ধরে ওর সঙ্গে কারবার করছি, আজতক পুরো পয়সা একবারে দেয়নি। আজ একবারে সাতশ টাকা দিয়ে দিল!
পরের গন্তব্য হাসপাতাল। লোকে বলে নসিমপুর হাসপাতাল, আসলে হাসপাতালটা আরও তিন কিলোমিটার গিয়ে ভগবানের হাটে। পাঁই পাঁই গাড়ি ছোটাল বাবা। হাসপাতালে কবার এসেছি, তবে ছোটোবেলায়। এমনিতে টুকটাক কিছু হলে সাজিডাঙার হেলথ সেন্টারেই চলে যায়। এটা ব্লক হাসপাতাল। ডাক্তার-টাক্তার মোটামুটি আছে। এখানে না হলে রামনগরের এস ডি হাসপাতাল। আরও তিরিশ-বত্রিশ কিলোমিটার। মানে আরও এক ঘণ্টা সোয়া ঘণ্টার রাস্তা।
বাবা পেশেন্ট নিয়ে আসে বলে ঘাঁতঘোত জানে। এমারজেন্সি গেট দিয়ে গাড়ি সোজা ভিতরে ঢুকিয়ে দিল। তারপর ভিতরে ছুটল।
পাঁচ মিনিট পরেই দেখি একটা ট্রলি টানতে টানতে নিয়ে আসছে বাবা, সঙ্গে লাল ছোপ ছোপ সাদা ইউনিফর্ম পরা এক দাড়িবাবা। বাবার সঙ্গে ভালোই পটরি আছে মনে হচ্ছে। একবারে থারটি-টু অল-আউট করে বাবাকে ‘দাদা দাদা’ করছে, বাবাও তাকে ‘মানকে মানকে, ভাই ভাই’ করে যাচ্ছে।
মানকে নামটা শুনে মনে পড়ল বাবার কাছে নামটা এক-দু বার শুনেছি। নসিমপুর হাসপাতালে মানকেই নাকি সব। ঠিকঠাক দর্শনি পেলে ও নাকি ডাক্তার থেকে বেড সব ব্যবস্থা এক চুটকিতে করে ফেলতে পারে। যেরকম দাঁত ক্যালাচ্ছে, মনে হচ্ছে একটা গোটা পাত্তি ঝেড়েছে।
ট্রলি এনে গাড়ির সঙ্গে সাঁটিয়ে দিল বাবা। ধরাধরি করে বউদিকে ট্রলিতে তুলে ডক্টরস রুমে ঢোকানো হল। ঘরে এক ছোকরা আর এক দিদিমণি গলায় স্টেথো ঝুলিয়ে বসে আছে। এককোণে একটা টুলে বসে মোটা মতো এক সিস্টার ইয়া মোটা একটা খাতা খুলে মন দিয়ে কী পড়ছে। একপাশে সবুজ পর্দা দিয়ে একটু ঘেরা করা আছে। হাসপাতালে যে রকম হয়, ওষুধের উগ্র গন্ধে মুখেভাতের ডালভাতও বাপ-বাপ বলে উলটির সাথে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
আমরা ঘরে ঢুকতেই সিস্টার-দিদি খেঁকিয়ে উঠল, “অ্যাই, অ্যাই, আ্যাতোজন নয়, অ্যাতোজন নয়, বাইরে, বাইরে।”
হতভম্ব হয়ে গোলাপি পিসি বাদে সবাই বাইরে বেরিয়ে গেছি। মানকে বাইরেই ছিল। আমাকে বলল, “দৌড়ে টিকিটটা করিয়ে আনো, আমি ততক্ষণে স্যরকে দেখিয়ে দিচ্ছি।”
টিকিটের লাইন ভালোই ছিল। মোটে দশটা বাজে। টিকিট করিয়ে যতক্ষণে ফেরত এলাম, বউদির চেক-আপ শেষ। সিস্টার দিদির হাতে টিকিটটা দিতে উনি সেই চিত্রগুপ্তের খাতাটা খুলে নামটাম লিখে নিলেন।
আবার গাড়িতে ফেরত। এবারে বাবার পাশে বসেছি। বাবার মুখ শুকনো। বলল, “ভালো লাফড়ায় ফেলল রে। এখন বলছে বিশ্বাস স্ক্যান সেন্টারে গিয়ে পেটের ফটো করিয়ে আনতে। তারপর ডাক্তার চ্যাটার্জি দেখবে, তারপর ওষুধপাতি লিখবে। মনে হচ্ছে আজ সারাদিনের খেয়া। ফিরতি হাটের ট্রিপটা আজ গেল।”
হাটবারে কিছু না হোক হাজার টাকার ট্রিপ মারে বাবা। কিন্তু আজ উপায় কী? আবুলদার মুখ চেয়ে ক্ষতিটা মেনে নিতে হবে।
বিশ্বাস স্ক্যান সেন্টার বেশি দূরে নয়, গাড়িতে মিনিট পাঁচেক লাগল। এই এলাকার ছবিছাবা করানোর এই একটাই জায়গা। সবসময় ঠাসা ভিড় লেগেই আছে। এই জায়গাটা ছোটো একটা বাজারের মতো। নানারকম দোকানপাট আছে। মধ্যিখানে পাশাপাশি দুটো বটগাছ আছে। সেই বটতলায় অনেকে শুয়ে বসে আছে। আমরাও গাড়ি থেকে চট-ফট, কাঁথাকাপড় বের করে একটুখানি বসার মতো করে নিলাম। বউদি এখন অনেকটা সামলেছে। তাও একপাশে শুইয়ে দিলাম।
হাসপাতালের কাগজটা কাউন্টারের একটা ছেলের হাতে দিলাম। ছেলেটা একনজর দেখল, নিয়ে শুধল, “খেয়েচে কখন?”
আবুলদা বলল, “এজ্ঞে ভোর সাড়ে চারটে হবে।”
“অ। রোজা। সেহরি খেয়েচে?”
আবুলদা ঘাড় নাড়ল।
“দশঘন্টা না খেয়ে থাকতে হবে। পেট একবারে খালি চাই। আজ যদি করাও, দুটোর পর ছবি হবে। কী করবে?”
আবুলদা বাবার দিকে চাইল। বাবা ঘাড় নাড়ল, “আজই করাব। চারটের মধ্যে হয়ে যাবে তো ভাই? নইলে ডাক্তারবাবু চলে যাবে।”
“সাড়ে তিনটের মধ্যে রেডি করে দোবো। দাও ছশ টাকা দাও, টোকেনটা নিয়ে বাইরে বোসো। নম্বর ডাকলে পেশেন্ট নিয়ে আসবে।”
টাকা মিটিয়ে টোকেন নেওয়া হলে আবুলদা বটতলায় গিয়ে বসল। বাবা আমাকে একপাশে ডেকে বলল, “তুই থাক, আমি ঝপ করে একটা ট্রিপ মেরে আসি, গৌরবাবু তিন-চারবার ফোন করল। গাড়ি সব বেরিয়ে গেছে, আমাকে ডাকছে। আর খিদে পেলে হোটেলে ভাত খেয়ে নিস। টাকা আছে, না দোবো?”
টাকা পকেটে কিছু আছে। বাবাকে বলতে বাবা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল।

বসে আছি, বসে আছি, সময় যেন কাটতে চায় না। এগারোটা বাজে, এখনও তিনঘণ্টা। মোবাইলে গেম খেললাম কহাত, এর ওর সঙ্গে গল্প করলাম, দেড়টার সময় দোকানে গিয়ে পাঁউরুটি ঘুগনি খেলাম। ফিরে এসে দেখি ডাক পড়ে গেছে।
সাড়ে তিনটে বলেছিল, তার আগেই রিপোর্ট দিয়ে দিল। বাবা ফিরল পৌনে চারটে নাগাদ। তারপর হাসপাতাল, তারপর ডাক্তারের কাছে। আউটডোর শেষ হয়ে গেছিল, কিন্তু মানকের হাতযশ। জামাই-আদর করে আমাদের ডক্টরস রুমে ঢুকিয়ে দিল। একজন বয়স্ক ডাক্তারবাবু বসে আছেন, আর সকালের দিদিমণি। কমবয়সি ডাক্তারবাবু নেই, সেই মোটা সিস্টার দিদিকেও দেখতে পেলাম না, অন্য একজন সিস্টার আছেন। বাবা ইশারায় বয়স্ক জনকে দেখিয়ে দিল, মানে উনিই ডাক্তার চ্যাটার্জি।
ম্যাডাম ডাক্তার চ্যাটার্জিকে কীসব বললেন। উনি রিপোর্টটা চেয়ে নিয়ে মন দিয়ে দেখলেন। তারপর প্রেসক্রিপসন লিখে দিলেন। অনেকদিন ধরে সময় মতো না খেয়ে খেয়ে গ্যাসট্রিক পেন উঠেছে। ভালো করে কী করতে হবে না হবে সব বুঝিয়ে দিলেন।
পাশের দোকান থেকে ওষুধ-টষুধ কিনতে কিনতে পাঁচটা বেজে গেল। এবার বাড়ি ফেরা। ফেরার সময় বাবার পাশে কেবিনে বসেছি। বাবার মেজাজটা ভালো আছে। মাল নিয়ে কাদাখোলা গেছিল, ছশ টাকার ট্রিপ। ফেরার সময় কোনও বিয়েবাড়ির প্যাসেঞ্জার পেয়েছে, তেলের দাম বলে শ-দেড়েক ঝেপেছে। ক্ষতিটা মোটামুটি পুষিয়ে গেছে।
গল্প করতে করতে বাড়ি এসে গেছি। দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি ঠাকুমা রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। গাড়িটা দাঁড় করাল বাবা। আমি নেমে পড়লাম। আমি আর যাব না। বাবা ওদের ফেরত দিয়ে বাড়ি আসবে।
ঠাকুমা পেছনে উঁকি দিয়ে একগাল হেসে বলল, “এহন সামলাইয়া গেচ দেহি। আসো, নাইমা আসো সব। বউরে একটু ধইরা দে মনি।”
আবুলদা একটু অবাক হল, “এখন নামবো কেনি? এগবারে গর যাই। সাঁঝ লাগছে, গর যাইয়া রোজা খুলুম অ’নে।”
আর যায় কোথা, ব্রজসুন্দরী নিজের ফর্মে। দাঁত তো একটাও নেই, মাড়িটাই খিঁচিয়ে উঠল, “আ-হা-হা, কী কথাখান কইলা ধন, হুনা পেরানডা জুড়াইয়া গেল এক্কারে। লক্ষীবার, সাঁজ বেলা, গিরস্তের ঘর থিকা সুধা মুহে ওতিত পিরত যাবা, আর বেজা বামনি হেয়া চায়া চায়া দেখবা। আগে বেজা বামনি মরুক, তাপ্পর ওই অসইরন কামগুলা করবা, কেমন? এহন আইয়া বেজা বামনিরে উদ্যার করো দেহি।”
বেজা বামনির দাপটে পাঁচখানা গাঁয়ের লোক থরহরি কম্পমান, আবুলদা তো কোন ছার। হেসেই ফেলল, “ইনসাল্লা। আজ এহানেই ইফতার নসিব আছে তা’লি। আসেন গো ফুপু।”
বাগানের একপাশে একটা বাঁশের তক্তাপোশ মতো করা আছে, শোয়া বসা হয়। ওর ওপরে বসানো হল ওদের। আমি আর বাবা বসলাম উঠোনের মেঝেয় চট পেতে। কুয়োর জলে হাতমুখ ধুলাম সবাই, তারপর ঠাকুমা খাবার আনল।
আমাদের মতো ঘরে আর কী-ই বা আছে, গুড় আদা কুচো দিয়ে মাখা ছোলা, বাতাসা ভেজানো সরবত, আর বাগানের ফল। তাও বাগানে ফলটা আছে বলে রক্ষে, কেউ এসে গেলে অতিথিসেবাটা করা যায়।
ওরা তিনজন বিড়বিড় করে কী একটা বলল, তারপর বিসমিল্লা বলে ছোলা গুড় মুখে তুলল। আমরাও খেতে শুরু করলাম।
সরবতে চুমুক দিয়ে গোলাপি পিসি বলল, “আহা-হা, কী সন্দর সেতল পানি আফনাগো ইন্দারার। পরানটা জুড়াইয়া গেল এক্কানে।”
আবুলদারা দিনভর রোজায় আছে, আমাদেরও পেটে দানাপানি তেমন একটা পড়েনি। স্যাটাস্যাট সব উড়ে গেল। ইতিমধ্যে বুনি মুড়ির টোকুই আর একটা বড়ো বাটি নিয়ে এসেছে। আমাদের পাতে পাতে মুড়ি ঢেলে দিল।
বাটিতে দেখলাম বেগুনি আছে। ঠাকুমা বেগুনি দিতে দিতে হেসে বলল, “খাও, ভালো কইরা খাও দেহি সব।”
খাওয়া হলে হাতমুখ ধুয়ে বাবা আর আবুলদা আরাম করে বিড়ি ধরিয়ে বসল। আমি জামাপ্যান্ট ছেড়ে এলাম। স্নান করব। বাবা থাকবে না, আমাকেই রাধামাধবের শীতল দিতে হবে। সময়ও প্রায় হয়ে এসেছে।
গোলাপি পিসি আকাশের দিকে মাঝে মাঝেই তাকাচ্ছিল, এবার একটু চঞ্চল হয়ে উঠল, তারপর আবুলদার কানে কানে কী একটা বলল।
আবুলদাও একটু চঞ্চল হয়ে উঠল। তারপর বাবাকে নীচু গলায় কী একটা বলল। বাবা আঙুল দিয়ে বাগানের দিকটা দেখিয়ে দিল। আবুলদা হেসে ঘাড় নাড়ল। তারপর আমাকে বলল, “বাচ্চু, একটু পানি দেও না ভাই, ওজু করতে লাগব। বক্ত আচে, মাগরিবের নেমাজটা আদায় কইরা লই।”
ওরা কুয়োতলায় এলে আমি জল ঢেলে দিলাম। ওরা হাতমুখ ধুয়ে বাগানের ভিতর একটু তফাতে গেল, তারপর ঘাসের ওপর গামছা পেতে পশ্চিমমুখো হয়ে নামাজ পড়তে বসল।
চট করে স্নান সেরে ধুতি পরে নিলাম। মা ঠাকুর ঘর থেকে ডাক দিল, “কইরে হল তোর? ঠাকুরের জোগাড় হয়ে গেছে।”
আসন পেতে বসে পড়লাম। আশেপাশের বাড়িতে সন্ধের শাঁখ বেজে উঠল।
ওঁ বিষ্ণু, ওঁ বিষ্ণু, ওঁ বিষ্ণু।

কৃতজ্ঞতাঃ নুরুল হক, তপন ভট্টাচার্য্য।

 


 

লাল মাটির সরাণে
সুব্রত রুজ
গল্প সংকলন
সৃষ্টিসুখ প্রকাশন
মূল্য – ৮৯ টাকা
প্রচ্ছদ – পার্থপ্রতিম দাস
অনলাইন অর্ডার – সৃষ্টিসুখ, আমাজন
ই-বুক – গুগল প্লে স্টোর, সৃষ্টিসুখ অ্যানড্রয়েড অ্যাপ
সৃষ্টিসুখ আউটলেট – সৃষ্টিসুখ, ৩০এ সীতারাম ঘোষ স্ট্রিট, কলকাতা – ৯, যোগাযোগ – ৯০৫১২ ০০৪৩৭