ইয়ামন // সৈকত মুখোপাধ্যায়

নিঃসঙ্গ ইয়ামন, সারা দুপুর একা। আমার শ্যামল সন্তান খেলা করে বাগানের পথে।
সারা দুপুরের তাপ সে একটা আতশকাচের নীচে কেন্দ্রীভূত করে  বাগানের পথে অপেক্ষা করে। একাগ্রতায় তার শিরদাঁড়া কঞ্চির ছিপের মতন বেঁকে যায়।
একটু পরেই একটা ডেঁয়োপিঁপড়ে, কী জানি কেন, তার যূথ পরিত্যাগ করে চলে আসে ইয়ামনের পায়ের কাছে। ইয়ামনের ঠোঁটে দুর্বোধ্য এক হাসি ফুটে ওঠে। সে যেন জানত, পিঁপড়েটা আসবেই। সে আরও অকম্প্র করে তোলে তার আতশকাচ ধরা হাতের মুঠি।
তারপর সেই পঙক্তিচ্যুত নিঃসঙ্গ প্রাণ সোজা হেঁটে যায় আতশকাচের ছায়া প্রচ্ছায়ার ভিতর, এবং হঠাৎই সে উলটে পড়ে, তার ছটা পা-ই কুঁকড়ে যায়। তার ত্বকের তিমিরে ধূসরতার ঊষা জাগে। মাংসপোড়ার গন্ধে নাক কোঁচকায় ইয়ামন।
বাইরের রাস্তা থেকে একটা হইহই আওয়াজ ভেসে আসে। সান-স্ট্রোক হয়েছে এক রিকশাচালকের। হাত-পা দাপাচ্ছে। ডাক্তারখানায় নিয়ে যেতে যেতেই সব শেষ।
ইয়ামন, নিঃসঙ্গ বালক, স্নানঘরের আবছায়ায় সম্রাটের মতন চলাফেরা করে। চৌবাচ্চার কালো জলের মধ্যে চোখ খোলা রেখে মাথা ডোবায়। হড়হড়ে সবুজ জলের মধ্যে মরচে রঙের কীসব যেন ভাসে। ওই জগত খুব চেনা লাগে ইয়ামনের। ঘুলঘুলি থেকে হেমন্তের হলুদ রোদের একটা ফলা জলের উপরিতল ভেদ করে, ঈষৎ তেরছা হয়ে নীচে গিয়ে পড়ে। ইয়ামনের জলমগ্ন চোখ দেখে, সেই হলুদ জল থেকে জেগে উঠছে বিশাল নীরোম দুই ঊরু ও ঊরুসন্ধির অতল শূন্যতা। ইয়ামন একটু ইতস্তত করে। তারপর হাত বাড়ায় সেই জলজ যোনির দিকে। তার মা দরজা ধাক্কায়, “ইয়ামন, ইয়ামন কী করছ তুমি? সারাদিন কি বাথরুমে কাটবে?”
সেদিনই বিকেলের দিকে, ভদ্রকালীর ঘাটে একটা বস্তায় মোড়া শবদেহ ভেসে আসে। পড়ন্ত সূর্যের আলোয় পুরনো আইভরির মতো ঝলমল করে বস্তা থেকে উপচে পড়া দুই পুষ্ট ঊরু এবং তাদের সন্ধিস্থলে নকুলপিঙ্গল যোনিকেশ। ভিড়ের মধ্যে থেকে নিজেকে আলগা করে নিয়ে উলটোদিকে হেঁটে যায় ইয়ামন। তার ঠোঁটে যথারীতি দুর্বোধ্য সেই হাসি।
দুর্বোধ্যই বা বলব কেন, ওই হাসির মধ্যে দিয়েই কিছুটা যেন আমি বুঝতে পারি ইয়ামনের মন। যে মনে অল্পদিন আগে ছেড়ে আসা এক অন্যদেশের আলোছায়া ঝিলমিল করে। বাতাসহীন সন্ধ্যায়, ইয়ামন ছাদের আলসে থেকে ঝুঁকে দেখে, রাস্তা থেকে হরিধ্বনি তুলে এক শবযাত্রা চলেছে। আর তার পাশে দাঁড়িয়ে আমি অবাক হয়ে দেখি, বাড়ি নয়, সেই শবদেহই যেন এক সাদা বালুর তটরেখার মতন স্থির দাঁড়িয়ে রয়েছে, আর প্রবাস অভিমুখী এক জাহাজের মতন সেই তটরেখা ছেড়ে চলে যাচ্ছে আমাদের বাড়ি। ডেকের রেলিং ধরে, বিলীয়মান বন্দরের দিকে চেয়ে আছে ইয়ামন। সে এখন আর একা নয়, তার পাশে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে আরও কিছু কুয়াশাময় বালক। ওই তো উদ্দালকপুত্র নচিকেতা, যে পাতালে গেছিল মৃত্যুর রহস্য জানতে। তার পাশে নীরক্ত ছেলেটি, ডাকঘরের অমল ছাড়া আর কে-ই বা হবে? অমন দূরগামী দৃষ্টি আর কার? তার পাশে অভিমন্যু, তার পাশে লিটল প্রিন্স, সেই বিরহী ভিনগ্রহী, যাকে তার ফেলে আসা প্রিয়তমা ফুলগাছটির কাছে ফিরিয়ে দিয়েছিল এক বিষাক্ত সাপ।
সেইসব মৃত্যুমুগ্ধ বন্ধুদের ইয়ামন দেখতে পায় কিনা জানি না, শুধু জানি পরদিন দুপুরে সে একটা কুকুরছানাকে সারা দুপুর নারকোলপাতা দিয়ে বাগানের ভাঙা টিউবওয়েলের সঙ্গে বেঁধে রেখেছিল। তারপর বিকেলের দিকে মালির ঘরের পিছনে, একটা অ্যালুমিনিয়ামের বাটিতে জল ভরে, তেষ্টায় ঝিমিয়ে পড়া কুকুরছানাটার গলার বাঁধন খুলে, ইয়ামন ডাক দিয়েছিল ‘তু’। কুকুরছানাটা দৌড়ে গিয়ে জলে মুখ ডোবায়। মুখ ডোবানো মাত্র তার গোটা শরীর কেঁপে উঠেছিল। কাঁপতে কাঁপতে একসময় কাঠের মতন শরীরটা কাত হয়ে পড়ে গিয়েছিল। কান দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল দুটো ধোঁয়ার সুতো। ইয়ামন হাঁটুর ওপর থুতনি রেখে, একটু দূরে বসে সবটাই দেখেছিল। এরপর সে জলে ডুবিয়ে রাখা ইলেকট্রিকের তার খুলে সযত্নে মালির ঘরে রেখে এসেছিল। কোদাল দিয়ে বাগানের কোণে একটা গর্ত খুঁড়ে, পুঁতে ফেলেছিল কুকুরছানাটাকে। পুরো সময়টাতেই তার চোখে আনন্দ নয়, শোকও নয় — এক গভীর ক্লান্তি জড়িয়েছিল।
তার পরদিন কাগজের পঞ্চম পাতায় একটা খবর বেরোল। মতিঝিল বস্তির একটা বাচ্চা মেয়ে, স্কুল থেকে ফেরার সময় তেষ্টা মেটাবার জন্য, কর্পোরেশনের কলের জলের ধারায় মুখ ঠেকিয়েছিল। আগের দিনের ঝড়ে, বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে জড়িয়েছিল সেই লোহার কলের গায়ে। তারপর… মুখ তুলে ইয়ামনের দিকে তাকালাম। সেও চেয়েছিল আমার দিকে। তার কাজলকালো চোখে তীব্র ঘৃণা, ও আমাকে হত্যা করতে চায়।
ইয়ামনকেও কেউ কেউ চায়। চেয়েছিল। যেমন আমার প্রতিবেশী প্রদীপ। খুব একা হয়ে গিয়েছিল প্রদীপ, ছেলে বিদেশে চলে যাবার পর, স্ত্রীর মৃত্যুর পর। শুধু ওর দীর্ঘদিনের লালিত ফুলগাছগুলো ছিল ওর সঙ্গে।
হঠাৎই একদিন দেখলাম, ইয়ামন একটা দুটো করে ফুলের টব বুকে জড়িয়ে নিয়ে আসছে প্রদীপের বাড়ি থেকে। প্রদীপই ওকে দিচ্ছে। নিজে থেকেই ইয়ামনের হাতে তুলে দিচ্ছে কতদিনের পুরনো সব ক্যাকটাস, নলিনাস, কলিয়াস, ডিফানবাকিয়ার সমারোহ, অর্কিড আর বনসাই। প্রদীপের ছাদের বাগান যেদিন সমস্ত টব হারিয়ে শূন্য হয়ে গেল, সেদিনই প্রদীপ গলা দিল রেললাইনে। তাই ভাবি, ওকে কি ইয়ামন কথা দিয়েছিল, “যাও, তোমার গাছগুলোর আমি যত্ন নেব, মায়ায় জড়িও না, যাও।”
জ্যোতির্বিদের সূক্ষ্মতায় ইয়ামন মৃত্যুর পরিমাপ করত। কাঠপিঁপড়ের বাসার মুখ থেকে একটা একটা করে চিনির দানা সাজিয়ে পথ বানাত সেই দরজা অব্দি, যার পাল্লার খাঁজে পা চিমটে আটকে আছে বুড়ো টিকটিকিটা। প্রথম পিঁপড়েটা দৃষ্টিসীমায় আসা মাত্রই সে কী তড়বড়ানি টিকটিকিটার। সে কী বাঁচার চেষ্টা। বৃথা, বৃথা — ইয়ামনের জ্যামিতিতে ভুল থাকে না। ক্লান্ত চোখে ইয়ামন দেখে, পিঁপড়েরা মাংসের টুকরো নিয়ে বাসায় ফিরে যাচ্ছে। একই সময়ে ছেলেধরা সন্দেহে এক বুড়োকে দাশনগরে এক ক্লাবের ছেলেরা পিটিয়ে মারে।
ক্রোটনগাছের একটামাত্র ডাল মোক্ষম সময়ে মুচড়ে ভেঙে দেয় ইয়ামন। উন্মুক্ত হয়ে যায় বুলবুলির পাখির লুকোনো বাসা, বাসার মধ্যে লাল লাল হাঁ মেলে শুয়ে থাকা তিনটে বাচ্চা। আর কার্নিশে বসে থাকা কাকটা অপেক্ষা করে ইয়ামনের ক্রোটনগাছের সামনে থেকে সরে যাওয়া অব্দি। তারপর আর এক মুহূর্তও নয়।
স্কুলের সিঁড়ি দিয়ে নামবার সময়, ওপরের দিকে দৌড়নো উঁচু ক্লাসের ছেলেমেয়েদের পায়ের নীচে পিষে মারা গেল তিনটে ক্লাস-টু-এর বাচ্চা। পরীক্ষা একতলায় না হয়ে দোতলায় হবে, শুরু হয়েই গেছে, এমন গুজবটা মোক্ষম সময়ে কে যে রটিয়েছিল তা আর বোঝাই গেল না।
আমি সমস্তই বুঝতে পারি এখন, বাধা দেবার চেষ্টা করি। কখনও কখনও সফলতাও যে পাই না তা নয়। তাতেই কেমন হিংস্র হয়ে ওঠে ইয়ামন। তবু বাধা দিই বলেই খাদের ধারে সামনের চাকা ঝুলিয়ে টলমল করে ট্যুরিস্ট জিপ। আস্তাকুঁড়ে নবজাতককে কুড়িয়ে পায় রিকশাওয়ালার বৌ। ইয়ামনের হাত থেকে তুঁতের শিশি কেড়ে নিই বলে বেঁচে যায় বেড়ালছানাগুলি এবং বিষমদে আক্রান্ত কিছু মানুষ। ইয়ামনের চোখের তারায় ছুরি ঝলসায়।
ইয়ামন হত্যা করতে চায় আমাকে। সে রাতের ছাদে আলোকিত কাচঘর বানিয়ে রাখে, যেখানে মাথা ঠুকে মরে রাতচরা পাখিরা আর আমি দাঁতে দাঁত চিপে প্রতিরোধ করি আত্মহত্যার বিপুল বাসনা। ইয়ামন অ্যাকোরিয়ামের জলে অ্যাসিডের বোতল উপুড় করে দিয়ে দেখে, মাছেদের মিহিন কঙ্কাল কাটা ঘুড়ির মতন দুলতে দুলতে তলিয়ে যাচ্ছে, আর আমার সারা শরীরে ক্যানসারের জ্বালা ছড়িয়ে পড়ে। আমার স্বপ্নের মধ্যে বারবার ফিরে আসে মহিষবাহন ইয়ামন — যমন। আমার দণ্ডদাতা — যমন।
তবু সে যাত্রা ইয়ামন আমাকে ছুঁতে পারে না। তার কারণ এক নারী। ভুল বললাম, ‘এক নারী’ নয়, সে-ই সমস্ত নারীর সারাৎসার। সেই নারী বয়ঃসন্ধির এক রাত্রে কিশোর ইয়ামনের বিছানার পায়ের কাছে এসে দাঁড়ায়। সেই নারীর মুখ ভালো করে দেখা যায় না, তার এলোচুলে একমুঠো জোনাক পোকা ধ্বক ধ্বক করে জ্বলে আর নেভে, তার ত্রিবলীর ভাঁজ থেকে ছাতিমফুলের কটুমাদক গন্ধ ভেসে আসে।
তার শরীর বাস্তবের নারীশরীরের মতন নয়। তার স্তন জটাজটিল, তার স্ত্রী-অঙ্গ নিভাঁজ সরল। বুঝতে পারি, ইয়ামনের বুকের মধ্যে জমে থাকা জন্মান্তরের নারীর ছবি থেকে জন্ম নিচ্ছে ওই তমস্বিনী। তার নাম তারা। যমনের সাথে তারা সারারাত বিহার করে। ভোরের দিকে ইয়ামন অপ্রতিভ মুখে জেগে ওঠে। তার মরণের স্মৃতিকে ঢেকে দিয়ে জেগে উঠেছে রমণের স্মৃতি। এরপর বাকি জীবন সে মৃত্যুকে অস্বীকার করে কাটাবে।
এবং বৃদ্ধ বয়সে যখন আমি এক স্বাভাবিক তথা বিবর্ণ মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়ব, স্মৃতিভ্রষ্ট যুবক ইয়ামন সেদিন চোখের জলে পিতৃতর্পণ করবে।

 


 

তেঁতুলপাতার গল্প
সৈকত মুখোপাধ্যায়
গল্প সংকলন
সৃষ্টিসুখ প্রকাশন
মূল্য – ৯৯ টাকা
প্রচ্ছদ – রোহণ কুদ্দুস
অনলাইন অর্ডার – সৃষ্টিসুখ, আমাজন
ই-বুক – গুগল প্লে স্টোর, সৃষ্টিসুখ অ্যানড্রয়েড অ্যাপ
সৃষ্টিসুখ আউটলেট – সৃষ্টিসুখ, ৩০এ সীতারাম ঘোষ স্ট্রিট, কলকাতা – ৯, যোগাযোগ – ৯০৫১২ ০০৪৩৭