ঝড় যে তোমার জয়ধ্বজা // সিদ্ধার্থ মজুমদার

অদ্ভুত এক খামখেয়ালি চরিত্রের লোক সে। তবে শুধু খামখেয়ালি আর অদ্ভুত বললে তাঁর সম্পর্কে কিছুই বলা হয় না। তাঁর অদ্ভুত সব কাণ্ডকারখানার কথা শুনলে অবাক হয়ে যেতে হয়। মনে হয় যেন এক ধরনের খ্যাপামি আর বিকারগ্রস্থতা তাঁকে আচ্ছন্ন করে রাখে। যখন জানতে পারি তিনি একজন অসাধারণ খ্যাতনামা প্রতিভাবান মানুষ, তখন আরও অবাক লাগে, এইরকম মাপের লোক এমন সব কাজ কারবার কী করেই বা করতে পারেন?
তাঁর খামখেয়ালিপনা জীবনের কথা নিয়ে রয়েছে বেশ কয়েকটি বইও। বিস্তর লেখালেখিও হয়েছে তাঁর জীবনের নানা দিক নিয়ে। তাঁকে ঠিক খ্যাপাটে চরিত্রের মানুষ হিসেবে না বলে, উচিত হবে একাধিক চারিত্রিক-স্তরসম্পন্ন মানুষ বলা। আত্মজীবনীমূলক বইয়েও তিনি লিখেছেন খোলাখুলি অনেক কথা। বলেছেন তাঁর জীবনে নারী এবং যৌনতা নিয়ে অনেক কথা। কোনও রাখঢাক না রেখেই বলেছেন।
যদিও তাঁর এইসব কথা শুনে মহিলাদের সম্পর্কে তাঁর ধারণা আর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। মারাত্মক অভিযোগ আর বদনামও করেছেন মানুষজন। কীসের অভিযোগ সেসব? তিনি নাকি ‘সেক্সুয়াল প্রিডেটর’। বাংলায় তর্জমা করলে যা হয় ‘যৌন-শিকারি’।
তবে তাঁর আত্মজীবনীমূলক বই দুটিতে শুধু নারী শরীর আর যৌনতার কথা আছে, এমন নয়। সেখানে ফুটে উঠেছে তাঁর জীবনদর্শন আর বিজ্ঞানদর্শনের অসাধারণ মনোগ্রাহী সব কথা। ফেইনম্যানের লেখা ‘Surely You’re joking, Mr. Feynman!’ এবং ‘What Do You Care What Other People Think?’ শীর্ষক বই দুটি অসাধারণ আত্মজীবনীর দলিল। প্রতিটি বিষয়কে তিনি এমন সরল আর জীবন্ত করে ফুটিয়ে তুলতে পারেন, এ বই পড়লে তা বোঝা যায়।
পদার্থবিজ্ঞানের ওপর তাঁর লেখা বইগুলি আজও অমূল্য হয়ে আছে ছাত্রছাত্রীদের কাছে। শুধু লেখাই নয়। তাঁর পদার্থবিজ্ঞানের বক্তৃতা আর ক্লাসগুলি আজও প্রবাদপ্রতিম হয়ে রয়েছে।
এতক্ষণ যাঁর কথা বললাম, সেই মানুষটি একজন বিশ্ববন্দিত পদার্থবিদ। কিংবদন্তী এই আমেরিকান তাত্ত্বিক পদার্থবিদের পুরো নাম রিচার্ড ফিলিপস ফেইনম্যান (১৯১৮ – ১৯৮৮)। ফেইনম্যান নামেই বিখ্যাত হয়ে আছেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম এই কৃতবিদ্য পদার্থবিদ।
কোয়ান্টাম ইলেক্ট্রোডাইনোমিক্সের কাজের জন্য ১৯৬৫ সালে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। আরও অনেক পুরস্কারের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য ‘অ্যালবার্ট আইনস্টাইন পুরস্কার’ এবং ‘ন্যাশান্যাল মেডেল অব সায়েন্স’ সম্মান। তিনি শুধু গবেষক ও শিক্ষকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন যথার্থ ভিসনারি। সময়ের থেকে অনেক এগিয়ে ভাবতে পারতেন। এই সময়ের যুগান্তকারী অগ্রগামী যে প্রযুক্তি ‘ন্যানোটেকনোলজি’, এই ন্যানো প্রযুক্তির সম্ভাবনা-ইঙ্গিতটি প্রথম স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন তিনিই। পরবর্তীকালে প্রায় দু দশক পরে বাস্তবায়িত হয়েছে ন্যানো সায়েন্সের জগৎ।

রিচার্ড ফেইনম্যান

এ তো গেল তাঁর বিজ্ঞানে গগনচুম্বী সাফল্যের দু-একটি কথা। এবার আসি তাঁর জীবনের কথায়। জীবনের প্রথম দিকে গভীর সংকটময় সময়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে।
হাই-স্কুলের এক সহপাঠী, নাম আরলিন, তাঁর সঙ্গে গভীর ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে ফেইনম্যানের। তাঁরা ঠিক করলেন বিয়ে করবেন। ঠিক হল যে, ফেইনম্যানের ডক্টরেল থিসিস জমা দেওয়ার পরেই তাঁদের বিয়ে হবে। বিয়ের আগেই ধরা পড়ল আরলিনের শরীরে টিবি রোগের জীবাণু বাসা বেঁধে রয়েছে। ব্যস, ফেইনম্যানের বাড়ির সকলে এই বিয়েতে তীব্র আপত্তি জানাল। কিন্তু আরলিনকেই বিয়ে করবেন ফেইনম্যান।
কিছুদিনের মধ্যে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে থিসিস জমা দিলেন ফেইনম্যান। যেমন ভেবেছিলেন, বিয়ে হয়ে গেল আরলিনের সঙ্গে তাঁর। যদিও তাদের বিয়ের এই অনুষ্ঠানে বাড়ির কোনও লোকজন এল না।
বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই ফেইনম্যানকে অ্যাটম বোমা তৈরি করার কাজে (ম্যানহাটন প্রোজেক্টে) যোগ দিতে হয়। আরলিন তখন স্যানেটরিয়ামে ভর্তি আছে। ফেইনম্যান কাজে বেরিয়ে যান, আর ফেরেন উইক-এন্ডের ছুটিতে। এদিকে গণিতে ফেইনম্যানের অসাধারণ ব্যুৎপত্তি দেখে তাঁকে ম্যানহাটন প্রোজেক্টের কম্পিউটেশনেল গ্রুপের ডিরেক্টর করা হয়েছে। ফেইনম্যানের বয়স তখন মাত্র চব্বিশ। এইভাবে চলতে থাকে সপ্তাহের পর সপ্তাহ, ১৯৪৫-এর জুলাইয়ে আরলিন মারা যাওয়ার আগে পর্যন্ত। মাত্র তিন বছরের বিবাহিত জীবন শেষ হল এভাবেই।

বিশ্বযুদ্ধের পরে ১৯৪৫-এ কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের থিওরিটিকেল ফিজিক্স বিভাগে প্রফেসর পদে যোগ দিলেন ফেইনম্যান। ১৯৫২-তে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। তবে কয়েকমাসের মধ্যেই ভেঙে যায় এ বিয়ে। ডিভোর্সে তাঁর স্ত্রীর অভিযোগটি শুনলে নড়েচড়ে বসতে হয়। কেমন ছিল তাঁর স্ত্রীর অভিযোগটি শুনুন।
তাঁর স্বামী সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই ক্যালকুলাসের অঙ্ক করতে বসেন। শুধু কি ঘুম থেকে উঠে? গাড়ি চালানোর সময়, লিভিংরুমে বসে। এমনকী রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়েও ক্যালকুলাসের অঙ্ক করে যান তাঁর স্বামী।
সত্যিই তো এরকম খ্যাপা মানুষের সঙ্গে কি আর ঘর করা যায়?
তাঁর জীবনে অনেক নারী এসেছে। তবে সেখানে ভালোবাসার সম্পর্ক সম্ভবত ছিল না। সুদর্শন তরুণ ফেইনম্যান কর্নেলে যখন অধ্যাপক হয়ে আসেন, সেই সময় যে তিনি অনেক নারীসঙ্গ করেছেন, সে কথা নিজেই বলেছেন তিনি। মজার ব্যাপার হল, এই সময় ফেইনম্যান নিজেকে স্নাতক পড়ছেন বলে কমবয়সি মেয়েদের সঙ্গে ভাব জমাতেন। এইভাবে একাধিক স্নাতক পড়া সুন্দরী মেয়েদের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেছে ফেইনম্যান। বিশেষ করে তাঁর নিশানা ছিল গ্রাজুয়েট ছাত্রদের তরুণী স্ত্রীদের প্রতি।
তিনি এমন বারে মদ খেতে পছন্দ করতেন, যেখানে টপলেস মেয়েরা ড্রিঙ্ক পরিবেশন করত। প্রথমেই তিনি তাঁদের জিজ্ঞাসা করে নিতেন, তাঁর সঙ্গে বিছানায় যাবে কিনা সে? সুরাপান আর যৌন সম্পর্ক। এভাবেই চলেছে। তবে গবেষণা আর ক্লাস নেওয়ার ক্ষেত্রে ফেইনম্যান যদিও সম্পূর্ণ অন্য মানুষ।
তাঁর জীবনীকাররা লিখেছেন ফেইনম্যান বারে বসে অনেক জটিল অনুসন্ধানের সমাধান করেছেন। হয়তো বা গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে জটিল আর রহস্যময় প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেন তিনি নেশাছন্ন অবস্থায়। বস্তুত এক অদ্ভুত পরমানন্দে আবিষ্ট হয়ে থাকতেন তিনি তাঁর অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার সময়ে।
আসলে তাঁর প্রিয়তম বন্ধু ও প্রথম স্ত্রী আরলিনের মৃত্যু তাঁর মধ্যে জন্ম দিয়েছিল এক গভীর শূন্যতার। আর সম্ভবত এখান থেকেই তাঁর আচরণের এমন অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটে। এমনও হতে পারে, হয়তো সমস্ত নারীর মধ্যে তিনি খুঁজে পেতে চাইতেন তাঁর হারিয়ে যাওয়া স্ত্রী আরলিনকে। আরও একটা কথা মনে হয়। তাঁর মতন মানুষ কেবলমাত্র যৌনতা বোধ থেকে নারীসঙ্গ করতেন বলে মনে হয় না, হয়তো নারী শরীরে তিনি খুঁজে পেতেন সৌন্দর্য। যেরকম শিল্পকলা আর সঙ্গীতের মধ্যে তিনি খুঁজেছেন সৌন্দর্যের ভাষা!
তাঁর প্রথম স্ত্রী আরলিনের প্রতি যে গভীর ভালোবাসা জাগরূক ছিল সে কথা জানা যায় ফেইনম্যানের মৃত্যুর পর পাওয়া একটি মুখবন্ধ খামের মধ্যে না পাঠানো একটি চিঠি থেকে।
এই চিঠি আরলিনের মৃত্যুর ষোলো মাস পরে লিখছেন ফেইনম্যান। এই চিঠি তাঁর প্রয়াত স্ত্রীর উদ্দেশ্যে লেখা। সে চিঠি কোনওদিন আর আরলিনের হাতে পৌঁছাবে না, একথা জেনেও লিখছেন ফেইনম্যান। তবে ফেইনম্যানের নির্দেশ ছিল এই চিঠিটি যেন তাঁর মৃত্যুর আগে কেউ না খোলে। চিঠিতে তারিখ লেখা অক্টোবর ১৭, ১৯৪৬। পঁচিশ লাইনের অসাধারণ এই চিঠির শব্দের ভাঁজে ভাঁজে এঁকে রাখা আকুতি আর হৃদয় বিদারক গভীর ভালোবাসার কথা। এই চিঠি পড়া শেষ হলে দু চোখ ভিজে যায়।
ফেইনম্যানের তৃতীয় বিয়ে হয় একজন ব্রিটিশ তরুণীর সঙ্গে। এতদিন পরে সুখী বিবাহিত জীবন পেলেন ফেইনম্যান। প্রথম সঙ্গীর মৃত্যুর পর থেকে যা তাঁর জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছিল। এক ছেলে এবং পরে দত্তক নেওয়া একটি মেয়ে নিয়ে সংসার। ফেইনম্যান প্রকৃত অর্থে এরপর সংসারী হয়ে উঠলেন। নিঃসঙ্গ আর উদ্দেশ্যহীন বাউন্ডুলে জীবন ঘুচে গিয়ে হয়ে উঠলেন স্বামী এবং বাবা।

এবার আসব ফেইনম্যানের শিল্পচেতনা ও শিল্পচর্চার কথায়। শিল্পকলার ভুবনে ফেইনম্যানের প্রবেশ হয়েছে অনেক পরে। ছোটবেলায় শিল্পকলার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল না কোনও। তা নিয়ে আক্ষেপও করেছেন তিনি পরবর্তীকালে।
তাঁর বয়স যখন চুয়াল্লিশ, তখন তাঁর সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে জেরি জোরথিয়ান নামের খ্যাতনামা একজন শিল্পীর সঙ্গে। ছবি আঁকা শেখার কথা বললেন শিল্পীবন্ধুকে। তবে শুধু শুধু কি আর কেউ শেখাতে চায়? তাই রফা হল। জোরথিয়ানের ছিল বিজ্ঞান শেখার খুব আগ্রহ। তাই ঠিক হল যে, এক রবিবারে ফেইনম্যান ছবি আঁকা শিখবেন, আর তার পরের রবিবারে ফেইনম্যান জোরথিয়ানকে শেখাবেন ফিজিক্স।
এভাবেই চিত্রশিল্পীকে ফিজিক্স শেখানো চলতে থাকে। আর অন্যদিকে ফেইনম্যান ছবি আঁকা শিখছেন চিত্রশিল্পীবন্ধুর কাছে। বিজ্ঞানের পাশাপাশি শুরু হল ছবি আঁকা। শিল্পীবন্ধুর স্টুডিওতে বসে ফেইনম্যান পোট্রেট এঁকেছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। চিত্রায়ণ করেছেন অনেক ন্যুড মডেলের শরীরী বিভঙ্গিমা।
তারপর আজীবন ছবি আঁকেন ফেইনম্যান বিজ্ঞান সাধনার পাশাপাশি। ছবি আঁকা শুরু হয়েছিল ১৯৬২-তে, তারপর একটানা তা চলেছে মৃত্যুর আগের বছর পর্যন্ত, ১৯৮৭ অবধি। বিখ্যাত চিত্রশিল্পের সমগোত্রীয় তাঁর শতাধিক চিত্রশিল্প আর ড্রয়িংগুলি দেখলে আশ্চর্য হতে হয়।

রিচার্ড ফেইনম্যানের আঁকা ছবি

একই সঙ্গে সঙ্গীতের প্রতিও ছিল তাঁর তীব্র অনুরাগ। একদিকে তাল-লয়-ছন্দ-সুর, অন্যদিকে রং-তুলি-ক্যানভাস। এভাবেই বিজ্ঞানের ভুবনের সঙ্গে চিত্রশিল্প আর সঙ্গীত নিবিড়ভাবে জড়িয়ে গেছে ফেইনম্যানের জীবনে। এভাবেই তিনি একজন দুর্দান্ত বংগো-বাদক হয়ে উঠেছিলেন।
বস্তুত ফেইনম্যানের সবচেয়ে বড়ো পরিচয় তিনি একজন সত্যসন্ধানী এবং সুন্দরের পূজারী। আসলে বিজ্ঞান মননের সঙ্গে গণিতের ভাষাতে ছিল তাঁর দারুণ দখল। তাই তাঁর পক্ষে প্রকৃতির ভাষা বোঝা আর প্রকৃতির সঙ্গে সংলাপ চালানোর কাজটি সহজ হয়েছিল।
ছবি আঁকার ক্ষেত্রে তাঁর গভীর আগ্রহের কারণটি ফেইনম্যানের নিজের কাছে খুব স্পষ্ট ও পরিষ্কার ছিল। আবেগের প্রকাশকে তিনি রং আর রেখার মাধ্যমে ছবিতে ফুটিয়ে তুলবেন, এই কারণেই তাঁর ছবি আঁকতে শেখা। বিশ্বপ্রকৃতির যে সৌন্দর্য, তা ব্যাখ্যা করা নিতান্তই কঠিন কাজ। ফেইনম্যান মনে করতেন এর কারণ এই যে সৌন্দর্য বৈভব, তা তো আসলে এক ‘আবেগ’ই। প্রকৃতির যে গাণিতিক সৌন্দর্য, যে নিখুঁত নিয়ম-শৃঙ্খলা, ছন্দ, তাল, লয় আর সময়জ্ঞান — তা এক বিপুল সৌন্দর্য। একটি পরমাণু বা একটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোষের মধ্যে অভাবনীয় অথচ নিয়মানুগ কাণ্ডকারখানা নিরবছিন্নভাবে ঘটে চলেছে। এই জটিলতার মধ্যে যে অপার সৌন্দর্য রয়েছে, তা অনুভব করা কি চাট্টিখানি কাজ! এই অপরূপ অনুভব ও আবেগকে তিনি বুঝতে চেয়েছেন। ছুঁতে চেয়েছেন। ছবিতে ধরতে চেয়েছেন।

বঙ্গো বাদনরত ফেইনম্যান

১৯৮১-তে ফেইনম্যান বিবিসি-তে একটি সাক্ষাৎকারে সৌন্দর্য প্রসঙ্গে চমৎকার কয়েকটি কথা বলেন।
তাঁর একজন শিল্পীবন্ধু ফেইনম্যানকে একটি ফুল দেখিয়ে একবার বলেন, তিনি যেহেতু আর্টিস্ট, তাই ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করার ক্ষমতা বিজ্ঞানীবন্ধুর থেকে তাঁর বেশি। বিষয়টি নিয়ে তাঁর বন্ধুটির ভাবনাটি যে নেহাতই ভ্রান্ত, ফেইনম্যান একথা বিলক্ষণ বুঝতে পারে। যাই হোক, তাঁর শিল্পীবন্ধুকে ফেইনম্যান উত্তরে বললেন, শিল্পীর সৌন্দর্য উপভোগ্যতা বিজ্ঞানীর থেকে বেশি, এমন কথা তিনি মানতে পারেন না। এখানেই থামলেন না, ফেইনম্যান, আরও বললেন, একটি ফুলের মধ্যে রয়েছে অসংখ্য কোষ এবং সেই সব কোষের অভ্যন্তরে চলে অসংখ্য অপরূপ সব জটিল ক্রিয়া-প্রক্রিয়া। তিনি একজন বিজ্ঞান গবেষক হিসেবে এসব বিষয় নিয়ে অনেক দূর ভাবতে পারেন। ফেইনম্যান বললেন, তিনি যে সৌন্দর্য দেখতে পান, তা তো শুধু ফুলের বাইরের নয়। তা নয় শুধু রং, গন্ধ আর বিন্যাস।
একটি ফুলের অন্দরমহলের যে গভীরতর সৌন্দর্য, বিজ্ঞানী হিসেবে তিনি তা ভাবতে পারেন। ফুলের যে রং, তা কেন সৃষ্টি হয়েছে? তা নিয়েও তিনি ভাবতে পারেন। কিংবা এই যে ফুলের রং — তা কি কেবল পতঙ্গদের আকৃষ্ট করার জন্যে সৃষ্টি হয়েছে, যাতে করে পরাগ সংযোগ ঘটতে পারে? তাঁর বিজ্ঞানের পাঠ নেওয়া আছে বলেই এমন সব প্রশ্ন, জিজ্ঞাসা আর কৌতূহল সম্ভব হয়েছে। এভাবেই একজন বিজ্ঞান জিজ্ঞাসুর মনে জেগে ওঠে প্রশ্নের পর প্রশ্ন। যেমন এর পরে সে ভাববে, তার মানে কি পতঙ্গরা রং দেখতে পায়? তার মানে কি, এই ধরনের প্রাণীদের সৌন্দর্য বোধ রয়েছে? ইতাদি… ইত্যাদি। এই যে এতসব চিত্তাকর্ষক প্রশ্ন জেগে উঠল, তা সম্ভব হয়েছে কেবলমাত্র বিজ্ঞান মননের জন্যেই। বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, এই বিজ্ঞান মননের জন্যেই আলাদা একধরনের রোমাঞ্চ যুক্ত হয় ভাবনায়। যুক্ত হয় অন্যতর মাত্রার সৌন্দর্য ভাবনা। কোনও সন্দেহ নেই যে, বিজ্ঞানভাবনা আসলে আরও অনেক বেশি রোমাঞ্চ যুক্ত করে। তাই একজন বিজ্ঞান পড়ুয়ার ক্ষেত্রে কোনওভাবেই সৌন্দর্যবোধ কমায় না।

ফেইনম্যানের মতন এমন বর্ণময় চরিত্রের মানুষের সম্পর্কে এত কথা ও কাহিনি আছে যে রাতভোর হয়ে যাবে বলতে বলতে। তার চেয়ে আমার লেখাটি শেষ করব ফেইনম্যানের লেখা একটি অসাধারণ কবিতার কয়েকটি পঙক্তি উদ্ধৃত করে। এই কবিতাটি ‘ন্যাশানাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস’-এ বক্তৃতা দেওয়ার সময় বলেছিলেন ফেইনম্যান।

There are the rushing waves… mountains of molecules, each stupidly minding its own business… trillions apart… yet forming white surf in unison.

Deep in the sea, all molecules repeat the patterns of one another till complex new ones are formed. They make others like themselves… and a new dance starts.

Out of the cradle onto the dry land… here it is standing… atoms with consciousness… matter with curiosity.

Stands at the sea… wonders at wondering… I… a universe of atoms… an atom in the universe.

সমুদ্রের ধারে একাকী বসে ফেইনম্যানের কবি মন কী ভাবছে সে কথাই ফুটে উঠেছে এই অপরূপ উচ্চারণে। এভাবেই বিজ্ঞানীর ভুবনের সঙ্গে কবিতার ভুবন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

 


 

দুই ভুবনের পারে 
সিদ্ধার্থ মজুমদার 
প্রবন্ধ সংকলন
সৃষ্টিসুখ প্রকাশন
মূল্য – ১২৫ টাকা
প্রচ্ছদ – রোহণ কুদ্দুস
অনলাইন অর্ডার – সৃষ্টিসুখ, আমাজন
সৃষ্টিসুখ আউটলেট – সৃষ্টিসুখ, ৩০এ সীতারাম ঘোষ স্ট্রিট, কলকাতা – ৯, যোগাযোগ – ৯০৫১২ ০০৪৩৭