ট্যাকের মাঠে মাধবী অপেরা // নীহারুল ইসলাম

ট্যাকের মাঠে পঞ্চরসের আসর বসেছে। উদ্যোক্তা গ্রামের ছেলেছোকরারা। তাদের একটা ক্লাব আছে। নাম অগ্রণী সেবা সংঘ। সেবা না ছাই। যতসব পাপের কাজ। তাস খেলা, নাটক করা, যাত্রা করা, তারপর এ বছর আবার পঞ্চরস। গ্রামের মুরুব্বিদের মাথায় হাত।
রাঢ় অঞ্চলের একফসলি মাঠ। সবে ধান কাটা শেষ হয়েছে। যদিও সব ধান বাড়িতে ওঠেনি। খামারেই পড়ে আছে। আর ওদিকের মাঠের মধ্যে খেমটার নাচ। গ্রামের মুরুব্বিদের তাই স্বস্তি নেই। একদিকে বাড়ির ছেলেমেয়েদের বেলেল্লা হবার ভয়। অন্যদিকে মাঠ-ঘাটে কাজের লোকের অভাব। সারারাত পঞ্চরস শুনে দিনের বেলা ঘুম। কাজ হবে কী করে? ধান সব খামারে। আর ধানকাটা জমির নরম বুকে ফালের আঁচর তো স্বপ্ন মাত্র। মহা মুশকিলে পড়েছে মুরুব্বিরা। মুখ ফুটে কিছু বলতে পারছে না কেউ। বলবে কী করে? ছেলেছোকরারা তো সব তাদেরই কারও না কারোর বাড়ির। কিছুক্ষণ আগে এই গ্রামের এক ছোঁড়া, নাম বোধ হয় আজিজ, সাইকেলে মাইক বেঁধে পঞ্চরসের প্রচার করতে করতে ওসমান মিঞার বাড়ির সামনেকার ডহর দিয়ে চলে গেল। ওসমান মিঞা বাড়ি থেকে বের হচ্ছিল তখন। আজিজকে দেখে তার হাতে ধরা হেলা লাঠিটা সাপের মতো কিলবিলিয়ে উঠেছিল। অবশ্য ক্ষণিকের জন্য। তারপর সে বুঝতে পারল কাজটা ঠিক হবে না। তাছাড়া তার বাড়ির কেউ যখন ওসবের মধ্যে নেই তখন কী দরকার অনর্থক ঝঞ্ঝাটে জড়িয়ে।
তবু গ্রামের মাঠে পঞ্চরসের আগমন ওসমান মিঞাকে পীড়া দিচ্ছে। তার ছেলে নেই ঠিকই। তবে আজ বাদে কাল তার ছোট মেয়ে হাবিবার সঙ্গে যার বিয়ে, সেই এক্রাম, সুরত মিঞার পুত এক্রামের উদ্যোগেই নাকি ট্যাকের মাঠে মাধবী অপেরার আগমন। কোথা থেকে দল এসেছে যেন? নিজের বাড়ির সামনে রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে ওসমান মিঞা মনে করতে চেষ্টা করে। ঠিক তখনই মাইকে আজিজের কণ্ঠ শোনা যায় — “চব্বিশ পরগনা জেলার সুবিখ্যাত মাধবী অপেরা আপনাদের দুয়ারে। আজ দ্বিতীয় রজনীতে তারা অভিনয় করবে লায়লি মজনু পালাখানি। হাসি কান্নায় ভরপুর সম্পূর্ণ সামাজিক পালা লায়লি মজনু —” এই পর্যন্ত বলে আজিজ গলায় সুর এনে গাইতে শুরু করল —
“বাড়ির কাণ্টায় সরষের ফুল
আর গেল রে মোর জাতি কুল…”
প্রচার শুনে ওসমান মিঞা বিপাকে পড়ে যায়। লায়লি মজনু তো প্রেমের পালা। ওটা আবার সামাজিক পালা হবে কেন? নিজের যৌবন কালে এই কাহিনির ভক্ত ছিল সে। আজিজ যে গানটা গাইছে সেটাই বা ওই পালায় এল কোত্থেকে? লায়লি মজনু আরব দেশের কাহিনি। আরব দেশ মরুভূমির দেশ। সেখানে চাষবাস হয় না। ধু ধু, খাঁ-খাঁ-র জাহান। তবে সেখানে সরষের ফুল ফুটল কবে? হাজীদের মুখে শোনা খেজুর গাছ ছাড়া কোনও গাছ হয় না সেখানে। ওসমান মিঞার মনে হল, আজিজকে এখন সামনে পেলে জিজ্ঞাসা করত, “আরব দেশে সরষের ফুল ফুটল কবে” সেকথা। কিন্তু আজিজ এখন তো তার নাগালের বাইরে। ক্যাচার হাতে এখন সে মনের সুখে গাইছে — “ও বন্ধু রসিয়া…”
আর এদিকে ওসমান মিঞার বাড়ির রাখাল চাঁদু, ভুসির ঘরে গোরুর খড় কাটতে কাটতে আজিজের কণ্ঠে কণ্ঠ মেলাচ্ছে। সেটাও ওসমান মিঞা শুনতে পেল। তখন তার মনে পড়ল হাদিসের, কোরানের কথা। ওইসব কেতাবে আছে আখেরি জমানায় মানুষ আল্লা রসুলের কথা ভুলে যাবে। মেতে থাকবে মিথ্যা দুনিয়াদারি আর রঙ তামাসায়। সত্যি, কেতাবের কথা কি আর মিথ্যা হয়? ওসমান মিঞা শুনেছে গাঁ ঘরের বহু বিটিরা পর্যন্ত রাতের আঁধারে পঞ্চরস শুনতে যাচ্ছে ট্যাকের মাঠে। তৌবা তৌবা। কী শরমের কথা। হাকিম সাহেবের গাঁয়ের ইজ্জত সব মাটিতে মিলিয়ে দিল না-লায়েকরা।
ওসমান মিঞার নানা ছিলেন হাকিম সাহেব। অবিভক্ত বাংলার রাজশাহী ডিভিশনের হাকিম। দীঘল গড়নের ছিপছিপে লোকটার কী দাপট ছিল। পাঁচ গাঁয়ের মানুষের চোখে তাঁর যেমন ইজ্জত ছিল, তাঁর গাঁয়েরও তেমনই। থানার দারোগা, বিডিও সাহেব যে-সে আসত তাঁর কাছে। তাঁর দুয়ারে। ওসমান মিঞা দেখেছে এসব। সে তখন ছোট ছিল। তবু স্পষ্ট মনে আছে। গাঁয়ে কেউ সিগারেট বিড়ি পর্যন্ত টানত না। তাই বোধ হয় আজকের ব্যাপার স্যাপারগুলি কিছুতেই মেনে নিতে পারে না। সবসময় তার কেমন অস্বস্তি হয়। যেমন এখন হচ্ছে। কদিন আগেও এমন অস্বস্তিতে পড়ে ছিল ওসমান মিঞা।
বাসস্ট্যান্ডে জাহিরের চায়ের দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল সকালবেলা। জঙ্গিপুর যাওয়ার কাউকে পেলে একটি ওষুধ আনতে দেবে বলে। তার বিবি নাসিরার পেটের ব্যারাম। জঙ্গিপুরের ফাত্তা ডাক্তার চিকিৎসা করছে। দশদিন আগে বিবিকে নিয়ে গিয়ে দেখিয়ে এনেছে। আরও দশদিন পর আবার নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু এরই মধ্যে একটি ওষুধ শেষ।
ওষুধটি আনতে ওসমান মিঞা নিজেই যেতে পারত। কিন্তু জঙ্গিপুর অনেক দূর। সেখানে যেতে আসতে পুরো একটা দিন বরবাদ হয়ে যাবে। তখন মাঠে তার কাটা ধান পাড়ন দেওয়া ছিল। সেসব না সামলে বাইরে যাওয়ার উপায় ছিল না তাই দাঁড়িয়ে ছিল জঙ্গিপুর যাওয়ার কাউকে যদি পায়।
বাসস্ট্যান্ডে জাহিরের চায়ের দোকানে অনেক মানুষ ভিড় করে। কাজ থাক বা না থাক সবাই ভিড় করে চা খাওয়ার জন্য। ওসমান মিঞা তাদের মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছিল। তবে তার কাজ ছিল। হবু বিহাই সুরত মিঞা ছিল সঙ্গে।
একসময় ওসমান মিঞা তার ভাগ্নে সামাদকে আসতে দেখল বাসস্ট্যান্ডমুখী। হাতে একটা চামড়ার ব্যাগ। সঙ্গে বউ। বউয়ের হাতে ভ্যানিটি ব্যাগ ঝুলছে। বউকে একটু দূরে নিমতলায় দাঁড় করিয়ে রেখে সামাদ একা এগিয়ে এল জাহিরের চায়ের দোকানের সামনে। ওসমান মিঞা তাকে জিজ্ঞাসা করল, “কতি যাবি সামাদ?”
“জঙ্গিপুর, ডাক্তারের কাছে। আপনার বহুকে নি যেতি হছে।”
“কুন ডাক্তারের কাছে?”
“ফাত্তা ডাক্তারের কাছে।”
ওসমান মিঞা খুব খুশি হয়। ভাবে কাজের মতো কাজ হয়েছে। এমন লোককেই খুঁজছিল সে। ভুলে যাবে না আবার কাজটাও ঠিক হবে। ওসমান মিঞার দিল খুশ হয়ে ওঠে এমনই যে সে বলে ওঠে, “ফাত্তা ডাক্তার খুব ভালো ডাক্তার। তা ওই ডাক্তারের কাছে আমারও একটো কাম ছিল। একটু খানি তদবির করি তু কামটো যদি করি দিতিস তাহলে আমাকে কষ্ট করি জঙ্গিপুর যেতি হয় না।”
সামাদ জিজ্ঞাসা করে, “বুলেন কী কাম?”
“এই তোর মামানীর একটো ওষুধ শ্যাষ হুন গেলছে। সেটো ডাক্তারকে পুছি যদি আর খেতি বলে তবে ওষুধটো কিনি আনতে হবে।”
একথা শুনে সামাদ ওসমান মিঞার কাছে প্রেসক্রিপসনটা চেয়ে নেয়।
সেদিন ওসমান মিঞা জানতে পারেনি সামাদ কখন জঙ্গিপুর থেকে ফিরেছিল। তবে পরের দিন খোঁজ পেয়েছিল। সামাদ তাকে জানিয়েছিল, “মামু, ডাক্তার ছিল না।”
প্রথমে সামাদের কথা সে বিশ্বাস করে। কিন্তু তার হবু বিহাই সুরত মিঞা তাকে পরে বলেছিল, “অরা ডাক্তারের কাছে গেছিল না হাতি। বহুকে নি সামাদ টকি দেখতে গেলছিল।”
সেদিন প্রথম ওসমান মিঞা বুঝতে পারে ‘দ্যাস দুনিয়া’র হাল। ডাক্তার দেখানোর নাম করে গাঁয়ের বহু বিটিরা টাউনে টকি দেখতে যায়। এ আখেরি জমানা না তো কী?
সকাল বেলাকার মিষ্টি রোদে ওসমান মিঞা দাঁড়িয়ে আছে। কদিন ধরে শীত পড়ছে খুব। এত বেলাতেও শরীরের কাঁপুনি মরছে না। হাড় কনকন করছে। ওসমান মিঞার মনে হয়, সে বয়স্ক মানুষ বলেই তার অমন লাগছে। কিন্তু তার মুনিষেরা। তারা এখনও কামে আসছে না কেন? বেলা তো কম হয়নি। ওদিকে খোলানে সব ধান পড়ে আছে। ঝেড়ে তুলতে হবে। অথচ মুনিষদের কারো পাত্তা নেই। নিশ্চয় তারা সারা রাত পঞ্চরস শুনে এখনও ঘুমোচ্ছে।
ওসমান মিঞা ভাবল নানা হাকিম সাহেবের মতো যদি তারও দাপট থাকত, একদিনেই এসব বন্ধ করে দিত। এ তো শুধু দিন দরিয়ার ক্ষতি নয়, ক্ষতি পরকালেরও। কেতাবে আছে— এ দুনিয়ার মায়ায় ভুলে থাকলে চলবে না। যারা ভুলে থাকবে, তারা জান্নাতের চির সুখ থেকে বঞ্চিত হবে। তবু মানুষ কেতাবের কথায় আমল দেয় না। কেতাবে আছে — আল্লা জান্নাতে এক একজন উন্মত্তের জন্য সত্তরটি করে হুরের ব্যবস্থা করবেন। অথচ ট্যাকের মাঠে খেমটার নাচ নিয়ে ব্যস্ত সবাই।
অনেকক্ষণ ধরে চাঁদু ভুসির ঘরে গুনগুন করে গান গাইছিল। ওসমান মিঞার আর সহ্য হল না। ধমক দিয়ে উঠল, “এই হারামজাদা তখুন থেকে অত গান কীসের রে? চুপ করি কাম করতে পারিস না?”
চাঁদু একমনে গোরুর খড় কাটছিল। ওসমান মিঞা যে বাইরে ডহরের উপর দাঁড়িয়ে আছে তা সে লক্ষ করেনি। আচমকা ধমকে তার গান থেমে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে হাজারো চিন্তা এসে ভিড় করল মাথায়। মেলা কাজ এখন তার মাথার উপর। খড় কাটা শেষ হলে হালের বলদের জন্য নাদে পানি তুলবে। তারপর মাঠে গোরু ছাগল চরাতে নিয়ে যাবে। সেই সঙ্গে ইদ্রিশ ভাইয়ের জন্য লাহারী নিয়ে যাবে। ইদ্রিশ ভাই মাঠে হাল বাইতে গেছে।
ওসমান মিঞার মাহিন্দারের নাম ইদ্রিশ। খুব করিৎকর্মা ছেলে। চাঁদুর বয়সে সে রাখাল হয়ে এসেছিল ওসমান মিঞার বাড়িতে। এখনও ছেড়ে যায়নি। অথচ গ্রামের আর সব গেরস্তের বাড়িতে কত ছেলে রাখাল হয়ে এল, গেল — তার ইয়ত্তা নেই। ভেবে সুখ পায় ওসমান মিঞা। কিন্তু পাড়া পড়শিরা বলে অন্য কথা। “ওসমান মিঞার বিটিদের জন্য নাকি তার বাড়িতে অত মধু।” এটা হিংসা — ওসমান মিঞা তা বুঝতে পারে। দেশে-ঘরে রাখাল-মাহিন্দারের আকাল খুব। আর তার বাড়িতে ছাড়ান নেই। জ্বলন থেকেই পড়শিরা অমন কথা বলে। কিন্তু এই চাঁদুকে নিয়ে তার যত মুশকিল হয়েছে। ছোঁড়া ইদ্রিশের মতো হবে না। কাজ কামে দিল লাগায় না। খালি উড়ু উড়ু স্বভাব। এই আছে তো, এই নেই। গেল রাতে তো বাড়ি খেতেই ঢোকেনি। কোথায় ছিল কে জানে। হয়তো পঞ্চরস শুনতে গেছিল। পঞ্চরস। মাথাটা আবার গরম হয়ে উঠল ওসমান মিঞার। তখনই সে হাঁক মেরে চাঁদুকে ডাকল, “ও রে চাঁদু, হেরায় তো।” চাঁদু ভুসির ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। জিজ্ঞেস করে, “কী বুলছেন?”
“গেল রাতে কতি ছিলি তু?”
“বাড়ি গেলছিলাম।” চাঁদু বলল।
“বাড়ি!” খুব তাজ্জব লাগে ওসমান মিঞার। এই তো সেদিন ছোঁড়া বাড়ি ঘুরে এল। আবার বাড়ি? হবেও বা। লাগালাগি গাঁয়ে বাড়ি হলে যা হয়। এজন্য আগের কালে মুরুব্বিরা আশপাশের রাখাল বাড়িতে রাখতে চাইত না। হাগতে-মুততে যখন তখন বাড়ি ছুটবে। আর গেরস্তের কামের ক্ষতি হবে। তার উপর এখন যা যুগ, কামের ক্ষতি হলেও রাখালদের বকাঝকা করা যাবে না। এমনিতেই রাখাল পাওয়া যায় না। বকাঝকা করলে রাখাল পালিয়ে যায় যদি। এই তো সেবার মুসলেম মিস্ত্রির রাখাল হারেজ না কী নাম ছিল ছোঁড়ার, মাঠে গোরু চরাতে গিয়ে খেলার ঝোঁকে গোরু ধরে রাখতে পারেনি, আব্দুল সেখের ফসলের ক্ষতি হয়েছিল। আব্দুল সেখ তা দেখতে পেয়ে মুসলেম মিস্ত্রির সব গোরু খোঁয়াড়ে দিয়ে দিয়েছিল। যার জন্য ছোঁড়া মুসলেম মিস্ত্রির কাছে পিটুনি খেয়েছিল খুব। সেই শেষ। ছোঁড়া আর মুসলেম মিস্ত্রির বাড়িতে থাকেনি। মার খেয়ে পালিয়ে গেছিল নিজের বাড়ি। পরের দিন মুসলেম মিস্ত্রি ফিরিয়ে আনতে গেছিল তাকে। কিন্তু ছোঁড়া তো আসতে চায়নি, তার বাপ মা পর্যন্ত তাকে পাঠাতে রাজি হয়নি। তারা মুসলেম মিস্ত্রিকে বলেছিল, “ছেল্যা হামাদের রাজমিস্ত্রির কামে যাবে। আর কারোর বাড়িতে রাখালি খাটবে না।”
ওসমান মিঞা ভাবতে থাকে, এখন যদি চাঁদু গেল রাতে বাড়ি না গিয়ে পঞ্চরস শুনে থাকে তবু তাকে কিছু বলা যাবে না। বললে হারেজের মতো সেও যদি পালিয়ে যায়। তাহলে মুসলেম মিস্ত্রির মতো ওসমান মিঞা নিজে মাঠে গোরু ছাগল চরাতে যাবে নাকি? মিঞা বংশের ইজ্জত তাহলে থাকবে কোথায়? ওসমান মিঞার হঠাৎ মনে পড়ে গেল, সকালে চা খাওয়ার পর তার আজ পান খাওয়া হয়নি। এদিকে সে চাঁদুকে দু-চার চড়-চাপ্পড় মারার জন্য ডেকেছিল। অথচ সেটা পারল না যখন তখন চাঁদুকে বলল, “তোর চাচির কাছ থেকে একটো পান নি আয় গা তো।”
চাঁদু ওসমান মিঞার হাতে পান এনে দেয়। ওসমান মিঞা সেটা মুখে পুরল। তারপর চাঁদুকে বলল, “গোরুর নাদে পানি তুলে রাখিস। ইদ্রিশ হাল বেহি এসি বলদ দুটাকে খেতি দিবে।” বলেই সে ডহর ধরে হাঁটতে শুরু করল। মুনিষদের খোঁজ নিয়ে সে একবার হবু বিহাই সুরত মিঞার বাড়ি যাবে। এই বিহান বেলা সুরত মিঞা বাড়িতে থাকবে ইনশাল্লাহ। সামনের আঘুনের পঁচিশ তারিখ বিহার দিন-ক্ষণ। হাতে আর তেমন সময়ও নেই। হাট বাজার কিছুই করা হয়নি। সেই সব নিয়ে সুরত মিঞার সঙ্গে কথাবার্তা।
চা খেতে খেতে ওসমান মিঞা ভাবনাটা ভেবেছিল। কিন্তু আজিজের কণ্ঠে মাধবী অপেরার প্রচার শুনে আর তার ধান ঝাড়া মুনিষদের গরহাজির দেখে সব ভুলে গেছিল। পানের খিলিটা চাঁদুর হাত থেকে পেয়ে সে সব আবার মনে পড়ল।
ডহর ধরে কিছুটা এগোতেই তাসলিম আলির বাড়ির দুয়ারের সামনে ওসমান মিঞা তার মুনিষদের সঙ্গে দেখা। নবাব পুত্তুররা আসছে এতক্ষণে, থমকে দাঁড়ায় ওসমান মিঞা। ওদের কিছু বলবে ভাবল। কিন্তু বলতে পারল না। শুধু দাঁড়িয়ে দেখল আব্দুল, রুবু, ইনসানের হেঁটে আসা। ওরা তাকে পাশ কাটিয়ে চলেও গেল। আর ওসমান মিঞা স্বস্তির নিশ্বাস ছেড়ে আবার হাঁটতে শুরু করল যেদিকে যাচ্ছিল সে দিকেই।
সুরত মিঞা বাড়ি ছিল না। রাগ করে নিজেই নাকি হাল বলদ নিয়ে মাঠে জমি চষতে গেছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে রাখাল, মাহিন্দার কারও পাত্তা পায়নি। ওদিকে বেলা হয়ে যাচ্ছিল। অগত্যা রেগে মেগে নিজেই জমি চষতে গেছে। হবু বিহানের মুখে ওসমান মিঞা এ খবর শুনল, বিহাই নাকি বাড়িতে খুব গালমন্দ করে বেরিয়ে গেছে রাখাল মাহিন্দার আর ছেলে এক্রামের উদ্দেশ্যে। “শালা বাঞ্চোতরা পঞ্চরস মারিয়ে খাক। এ বাড়িতে তারা যেন খেতে না পায়। খবরদার।” এমন হুকুম দিয়ে বাড়ি থেকে মাঠে বারিয়ে গেছে নাকি সুরত মিঞা।
খুব স্বাভাবিক। সব শুনে ওসমান মিঞার মনে হয়। এমন যদি তার বাড়িতে হত, সেও সহ্য করত না। সহ্য কেউ করবে না। সুরত মিঞাও করেনি। ঠিকই করেছে। কিন্তু বিহাইয়ের সঙ্গে তার যে একবার দেখা হওয়ার দরকার। ওসমান মিঞা হবু বিহানকে জিজ্ঞেস করে, “কুন মাঠে ভুঁই চষতে গেলছে বিহাই?” বিহান বলল, “ট্যাকের মাঠে।”
ওসমান আর দাঁড়াল না সেখানে। হাঁটতে শুরু করল আবার।
ট্যাকের মাঠ বেশি দূরে নয়। একেবারে গ্রামের পশ্চিম মাথায়। ওই মাঠে পঞ্চরসের আসর বসেছে। ওসমান মিঞা ওমুখো হয়নি। যাওয়ার ইচ্ছাও ছিল না। কিন্তু আজ কোনও উপায় নেই। বিহাইয়ের সঙ্গে বিহার ব্যাপারে কিছু জরুরি কথাবার্তা আছে। সেসব না সেরে ফেললেই নয়।
আমরুল্লা হাজীর পুকুরপাড় ধরে একেবার চামাপাড়ায় গিয়ে উঠল ওসমান মিঞা। পাড়াটা পেরোলেই ট্যাকের মাঠের সীমানা। ওসমান মিঞা চামাপাড়ার মধ্যকার রাস্তা ধরে হাঁটছে। রাস্তার উপর মানুষজন রোদ পোহাচ্ছে এখানে-ওখানে। ওসমান মিঞাকে হেঁটে আসতে দেখে তাদের অনেকেই উঠে দাঁড়াচ্ছে। এই পাড়াটি ওসমান মিঞার নানা হাকিম সাহেবের মাটিতেই গড়ে উঠেছিল। সেই কৃতজ্ঞতা থেকেই ওরা উঠে দাঁড়াচ্ছে বোধ হয়।
কিন্তু ওসমান মিঞা এই বিহান বেলা তাদের পাড়ায় কেন? ওরা কেউ বুঝতে পারছে না। বুঝতে পারছে না কারণ, এই পাড়ায় কাউকে ওসমান মিঞার প্রয়োজন পড়লে সাধারণত সে ডেকে পাঠায়। তাছাড়া ট্যাকের মাঠে তার এক ছটাক জমি নেই যে তা দেখতে যাবে। তবে পঞ্চরসের প্যান্ডেলে যাবে নাকি? কারও কারও এমন সন্দেহ দেখা দিল। কিন্তু কারও সাহস হল না ওসমান মিঞার কাছে জানবার।
ওসমান মিঞা এক মনে হেঁটে যাচ্ছে। রাস্তার বাঁ পাশে একটা বিশাল পুষ্করিণী। নাম শিবতলা পুষ্করিণী। পুকুরটার উত্তরপাড়ে একটা শিবের মন্দির আছে। মন্দির বলতে একটা বহুদিনের গুমটি ঘর। তার ভিতর একটা তেল সিঁদুর লেপা পাথর। ওটাই নাকি শিবঠাকুর। শিবরাত্রিতে চামাপাড়ার বাসিন্দারা শিব পুষ্করিণীর পানি তুলে সেটার উপর ঢালে। ওসমান মিঞা ছেলেবেলায় এসে একবার দেখেছিল। তারপর আর এমুখো হয়নি। পাপের ভয়ে। আজকেই এল। আর কী জানি কেন, পুকুরটা দেখে মন্দিরটার কথা তার মনে পড়ল। সে তাকাল তখন। আর দেখল মন্দিরটার জীর্ণ অবস্থা। পাড় ক্ষয়ে মন্দিরটা হেলে আছে পুকুরের দিকে। যে কোনও সময় ধ্বসে পড়তে পারে।
মন্দিরটা দেখে ওসমান মিঞার কেমন যেন মায়া হল আজ। অথচ সেদিন, তার ছেলেবেলায় এই মন্দিরে শিবপুজো দেখে যাওয়ার পর বাড়িতে জানাজানি হয়ে যাওয়ার পর, তার নানী তাকে বলেছিল “কাফেরদের মন্দিরে যাওয়া পাপ।” নানীর মুখে সেদিন একথা শুনে ‘মন্দিরটা ধ্বংস হয়ে যাক’ এই প্রার্থনাই করেছিল সে। আর আজ। আজ তার মায়া হচ্ছে। যখন মন্দিরটা ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
নিজের মনের ভাব গতিক ঠাহর করতে পারল না ওসমান মিঞা। ঠাহর করবার মতো মনের অবস্থাও নেই এখন। না হলে দু-দণ্ড দাঁড়িয়ে যেত।
চামাপাড়া পেরিয়ে পশ্চিমের মাঠে পা রাখল ওসমান মিঞা। তারপর বিহাইকে খুঁজতে এদিক-ওদিক চাইল। প্রথমেই তার চোখে পড়ল লিহর ভেজা পঞ্চরসের প্যান্ডেলটা। প্যান্ডেলের পাশে পুকুরপাড়ের ন্যাড়া তাল গাছটাও। কিন্তু মাঠের মধ্যে হাল বাইতে কাউকে দেখতে পেল না। বিহাই সুরত মিঞা কোন দাগে হাল জুতেছে কে জানে।
বিহাইকে খুঁজতে ওসমান মিঞা ধানকাটা জমির বুক চিরে আড়াআড়ি হাঁটতে শুরু করল আবার। মাটির সঙ্গে ধান গাছের গোড়া লেগে আছে প্রায় জমিতে। ওসমান মিঞার চলমান পায়ের আঘাতে সেগুলি থেকে সারারাতের জমে থাকা লিহর ছিটকে ছিটকে পড়ছে জমির বুকেই। বিহাইয়ের কাছে কতক্ষণে পৌঁছোবে সে কথাই ভাবছে।
সুরত মিঞা কোন দাগে হাল জুতেছে দেখতে ওসমান মিঞা পুকুরপাড়ে গিয়ে উঠল। জুতোর কাদা মুছল পুকুরপাড়ের পিছল ঘাসে। তার পরে পরেই আবার তার চোখ পড়ল প্যান্ডেলটার উপর। করোগেট টিনের বেড়া দেওয়া বেশ খানিকটা জমি। উপরে চটের ছাউনি। সেই ছাউনি ভেদ করে ওঠা একটা লম্বা বাঁশ। তার মাথায় বাঁধা মাইকের চোঙ।
ওসমান মিঞার মনটা আবার বিষিয়ে উঠল। তৎক্ষণাৎ দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল বিহাইকে খুঁজবে বলে। ট্যাকের মাঠ বিরাট মাঠ। গোটা মাঠেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সুরত মিঞার জমি। কোনও না কোনও জমিতে তাকে পাওয়া যাবেই।
হঠাৎ পুকুরের পানিতে শব্দ শুনল ওসমান মিঞা। পানি আন্দোলনের শব্দ। সে চমকে গেল। মাঠের মধ্যে পুকুরে এই জাড়ের সকালে কে আবার কী করছে? যদিও তার মনে হয় গুগলি কুরানো কেউ বোধ হয়। তবু সে কৌতূহল নিয়ে এগিয়ে গেল পুকুরের কাঁধায়। আর পুকুরের পানিতে দেখল জান্নাতের এক হুরকে আধ ন্যাংটো হয়ে গোসল করতে। শরমে ওসমান মিঞা নিজেকে আড়াল করতে চাইল। কিন্তু পারল না। তার বুক ঢিব ঢিব করতে আরম্ভ করেছে। এমন পরিস্থিতিতে কী করা দরকার বুঝতেও পারছে না। আবার দৃষ্টিকেও বাগে রাখতে পারছে না। ভেজা শাড়ির আড়ালে হুরের বুকে ফুটে থাকা দুটি শালুক ফুল তাকে ক্রমশ টানছে যেন। ওসমান মিঞা কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। ঠিক তখনই তাকে আবার চমকে দিয়ে পঞ্চরসের প্যান্ডেলের বাঁশে বাঁধা মাইকে সুর উঠল—
“বাড়ির কাণ্টায় সরষের ফুল
আর গেল রে মোর জাতি কুল…”

 


 

ট্যাকের মাঠে মাধবী অপেরা
নীহারুল ইসলাম 
গল্প সংকলন
সৃষ্টিসুখ প্রকাশন
মূল্য – ১৪৯ টাকা
প্রচ্ছদ – পার্থপ্রতিম দাস
অনলাইন অর্ডার – সৃষ্টিসুখ, আমাজন
ই-বুক – গুগল প্লে স্টোর, সৃষ্টিসুখ অ্যানড্রয়েড অ্যাপ
সৃষ্টিসুখ আউটলেট – সৃষ্টিসুখ, ৩০এ সীতারাম ঘোষ স্ট্রিট, কলকাতা – ৯, যোগাযোগ – ৯০৫১২ ০০৪৩৭