বুলন্দ-দর্শন // দেবাংশু সিনহা

বাসটা যখন নামিয়ে দিল, তখন বেধড়ক খিদে পেয়েছে। নেমেই সামনে দেখলাম একটা ‘জলেবি-সামোসা’-র দোকান। ডাইনে-বামে না তাকিয়ে সিধে ঢুকে পড়লাম দুই বন্ধুতে। সেই সক্কাল বেলা বেরিয়েছি আগ্রা থেকে। তাড়াতাড়ি পৌঁছবার জন্য জলখাবারের ব্যাপারটায় গুরুত্ব দিইনি। তখন ফতেপুর সিক্রি প্রথম দেখার উৎসাহে টগবগ করছি। আগ্রার ঈদগাহ বাসস্ট্যান্ডে এক গেলাস করে চা আর চারটে করে নানখাটাই বিস্কুট খেয়ে টুক করে উঠে পড়েছিলাম বাসে। চায়ের দোকানি বেশ একখানা টান দিয়ে বলেছিল, “না-আ-ন খাটা-আ-ই”। আমরাও তার ওই প্লুতস্বরে আপ্লুত হয়ে চারটে করে উড়িয়ে দিয়েছিলাম। তারপর এই এক ঘণ্টার উথালপাথাল বাস জার্নিতে সে নানখাটাই কোথায় মিলিয়ে গেছে, তার কোনও হদিস নেই।
আগ্রা থেকে ভরতপুর আর জয়পুরের বাস এই সিক্রি ছুয়ে যায়। আকবর বাদশার ফতেপুর সিক্রি হাইওয়ে থেকে এক কিলোমিটার ভিতরে। যারা বাসে করে আসে, তাদের এই হাইওয়ের ধারেই নামতে হয়। তাই দোকানপাটে জায়গাটা বেশ জমজমাট হয়ে রয়েছে। বেশিরভাগই খাবারের দোকান। ডিম-পাউরুটি, মিষ্টি, পুরি-সব্জি, চাউমিন মায় উত্তর ভারতের আদি অকৃত্রিম অখাদ্য ব্রেড পকোড়া।
পেটপুজো সমাধা করে যখন ইতিউতি চাইছি, একটা লোক দেখলাম ঘনিয়ে এল।
– গাইড চাহিয়ে স্যার? গাইড।
আমাদের গাইডের দরকার ছিল না। দুখানা বই, একটা লিফলেট আর একটা ম্যাপ সঙ্গে ছিল। তার জোরে আমরা নিজেরাই নিজেদের গাইড। দরকার ছিল একটা অটোর। কিন্তু কে শোনে কার কথা! সে লোক তো কী একখানা লাল কাগজ দেখিয়ে দেখিয়ে বলে চলেছে।
– সব দিখা দেঙ্গে স্যার। বুলন্দ দরওয়াজা, দিওয়ান-ই-আম, দিওয়ান-ই-খাস, আনারকলি কি সুড়ঙ্গ…
– নেহি চাহিয়ে।
– এ এস আই-কে গাইড হ্যায় স্যার হাম। হামে সব কুছ আচ্ছি তরিকে সে পতা হ্যায়…
বলে সেই লাল কাগজটা আরেকবার মুখের সামনে নেড়ে দিল।
– নেহি চাহিয়ে।
– আপকো আভি পৈসা নেহি দেনা পড়েগা। ওয়াপস আকে আচ্ছা লগা ত পৈসা দেনা। অটো কা ভি পৈসা নেহি দেনা পড়েগা। আপ ওয়াপস আকে দেনা।
আমরা ভ্রূক্ষেপ না করে একটা অটো ঠিক করলাম। লোকটা একটু চুপ করে গেল। ভাবলাম যাক, বাঁচা গেল। কিন্তু তখন ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারিনি যে এই শুরু। এর পরে কত লক্ষ বার যে এই প্রশ্নটা শুনতে হবে তার ইয়ত্তা নেই।
হাইওয়ের ধার থেকেই আগ্রা গেট দেখা যাচ্ছিল। আর তার সঙ্গে ফতেপুর সিক্রির দেওয়াল। মুঘলরা ভারতবর্ষে কেল্লা বানিয়েছে অনেক। আগ্রা কেল্লা, লাল কেল্লা, এলাহাবাদ-এর কেল্লা আর বৃহত্তর ভারত ধরলে লাহোর কেল্লা। কিন্তু ফতেপুর সিক্রির মতো গোটা একটা শহরের পরিকল্পনা বোধ হয় এই প্রথম আর এই শেষ। শহর যে এককালে ছিল জমজমাট, সেটা বেশ বোঝা যায়। আগ্রা গেট দিয়ে ঢুকেই ডানদিকে যে ধ্বংসাবশেষটা চোখে পড়ল, বইতে দেখলাম লেখা আছে, ওটা এককালে সরাইখানা বা সৈন্যদের ছাউনি ছিল। আমরা দেখে কিছুই বুঝতে পারলাম না। বাড়িখানা যাই থাক, এমনভাবে ভেঙেছে যে আসল আকারটা কেমন ছিল, তাই বোঝা যায় না, কী কাজে লাগত তা বোঝা তো দূর অস্ত। কিন্তু যাই হোক, এই ধ্বংসাবশেষটাই ফতেপুর সিক্রিতে আমাদের স্বাগত জানাল।
মাঝখানে ছোট্ট করে নহবতখানার বুড়ি ছুঁয়ে অটো আমাদের নামিয়ে দিল বুলন্দ দরওয়াজার সামনে। সামনে ঠিক নয়, বরং কাছে বলা উচিত হবে। আকবর বাদশা এই গোটা শহরটা তৈরি করেছিলেন একটা নিচু টিলার ওপরে। টিলায় ওঠবার রাস্তাটার সামনে অটো নামিয়ে দিল আমাদের। নেমে দেখলাম সামনে বিশাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বুলন্দ দরওয়াজা। লাল আর হলদে বেলেপাথরে তৈরি পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ দরজা। রাস্তাটা উঠেছে তার ডান দিক থেকে। সুতরাং প্রথম দেখাটা ঠিক মুখোমুখি হয়নি। কিন্তু সেই ‘সাইড ভিউ’ই মাথার মধ্যে যে ভাবনাটা জাগাল, সেটা হল — “বাপরে! মালটা কী বড় রে বাবা!”
হাঁ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম বস্তুটার দিকে। প্রথম দেখাতেই এতখানি অভিভূত তাজমহল ছাড়া অন্য কোথাও হয়েছি বলে তো মনে পড়ছে না। সম্বিত ফিরতেই দেখলাম লোকজন ঘিরে ধরেছে। রীতিমতো ভিড় যাকে বলে। কমসে কম ১০-১৫ জন তো হবেই। সব্বার মুখে সেই পুরোনো প্রশ্ন, “গাইড চাহিয়ে স্যার? গাইড?”
কিছুক্ষণ মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। অভিজ্ঞতাটা তো নতুন। ফতেপুর সিক্রি যথেষ্ট জনপ্রিয় ট্যুরিস্ট স্পট। লোকজনের ভিড় এখানে লেগেই আছে। যেহেতু দেখবার জিনিস মূলত স্থাপত্য, তাই অফ সিজন বলে কিছু নেই বলেই আন্দাজ। সারা বছরই ভিড় লেগে থাকবার কথা। তাহলে গাইড হবার জন্য এদের এত মারামারি কেন?
– ৫০ রুপেয়া স্যার। ৫০ রুপেয়া মে পুরা দিওয়ান-ই-আম, দিওয়ান…
– ৪০ রুপেয়া স্যার। সেলিম চিস্তি, জামা মসজিদ, ইবাদতখানা, আনারকলি কে সুড়ঙ্গ…
– ম্যায় ৩৫ লুঙ্গা স্যার। হিরণ মিনার, কারোয়াঁ সরাই, দিওয়ান-ই-খাস…
– ২৫ স্যার… অনলি টোয়েন্টি ফাইভ রুপিস। জোধাবাই মহল, বীরবল কি হাভেলি, মরিয়াম কি কোঠি…
সে এক কেলেঙ্কারি ব্যাপার। আমরা দুই বাঙালির পুত কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে আছি আর চারপাশে গাইডদের নিলাম ডাকাডাকি চলছে। আর কী বাহার সে নিলামের! ৫০ টাকা থেকে ১০ সেকেন্ডের মধ্যে আদ্ধেক। বেশ মোলায়েম করে বললাম, “নেহি চাহিয়ে ভাই। হামে গাইড নেহি চাহিয়ে।”
– স্যার, বহুত বড়ি জগাহ হ্যায়…
– আয়ে হো তো আচ্ছে সে দেখ লো…
– স্যার… পন্দরহ রুপাইয়া… ওনলি ফিফটিন…
কী মুশকিল! স্বগতোক্তি বেরিয়ে গেল একটা — “আচ্ছা জ্বালা হল দেখছি!”
আর যায় কোথা! কেমন একটা হর্ষোচ্ছ্বাস উঠল যেন।
– আরে বাঙালিবাবু… হামি বালো আচি…
– হামি বাংলা পারবে…
– নোমোস্কার… আসুন… আসুন…
স্রেফ বাঙালি বলে এতখানি আদরযত্ন পেয়ে আমাদের খুশি হবার কথা। কিন্তু আমাদের ধৈর্য কমে আসছে দ্রুত। ছোট্ট করে একটা ‘নেহি চাহিয়ে’ বলে ভিড় কাটিয়ে এগিয়ে গেলাম। ততক্ষণে আমাদের পুরো মনোযোগ টেনে নিয়েছে বুলন্দ দরওয়াজা।
স্থাপত্যকলায় আমি নিরক্ষর। তার সমালোচনা করতে যাওয়া আমার পক্ষে রীতিমতো ধৃষ্টতা। কিন্তু বুলন্দের দার্ঢ্যের সামনে দাঁড়িয়ে সেই সময়ে মনে হওয়া কথাগুলো যদি না বলি অন্যায় হবে। এত সার্থক নামকরণ বোধ হয় তাজমহলেরও নয়। ঘাড় ব্যথা করে দেখতে দেখতে আপনার মনেই হবে না যে, ৬২ মিটার উঁচু ও দরজার নাম ‘বুলন্দ’ ছাড়া আর কিছু হতে পারে। এই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তার ‘বুলন্দি’ সম্বন্ধে মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ জাগবে এমন লোক মেলা ভার। ওখানে দাঁড়িয়ে আমার বারবার করে মনে হয়েছিল, এ দরজা আকবর বাদশাহের প্রতিমূর্তি। দরজার মাথায় ওই উঁচুতে যে একসারি ‘কঞ্জুর’ বা ব্যাটলমেন্ট প্যারাপেট আর তার পিছনে তিনটে ছত্রী দেখা যাচ্ছে, ওইটা হল বাদশাহি তাজ। সিঁড়িগুলো যেন প্রজার দল। নিঃশর্ত প্রণতি জানাচ্ছে তাদের ইমান-ইনসাফের মালিকের কাছে। আর ওই ‘পিশ্তাক’ বা দরজার সম্মুখভাগের দুপাশে দুটো ‘গুলদস্তা’, যেগুলোর ডগায় পদ্মকুঁড়ির বাহার, সেগুলো শাহেনশাহের হাতের বর্শা বা তলোয়ার। সলতনত-এ-মুঘলিয়ার হর্তাকর্তাবিধাতার আকাশ্চুম্বী ব্যক্তিত্ব এই দরজার মধ্যে দিয়ে যেন ফুটে বেরোচ্ছে। শ্যামবাজারের মোড়ে জেনারেল আউট্রামের অন্ধ অনুকরণে তৈরি অশ্বারোহী নেতাজীর মূর্তির সঙ্গে নেতাজীর যা মিল, বুলন্দ দরওয়াজার সঙ্গে আকবরের মিল তার থেকে হাজার গুণে বেশি।
এবার গুটি গুটি সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থাকি। একা নই। সঙ্গে দল বেঁধে উঠছে গাইডের দল! মুখে সেই বাঙালি ভোলানো বুলি। কিন্তু বজর বজর করে কী বলছে, মাথায় ঢুকছে না আর। চোখে শুধু বুলন্দ দরওয়াজা। যতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম নীচে, ততক্ষণ শাহেনশাহের দৃপ্ত ভঙ্গিমাটাই চোখে পড়ছিল। সিঁড়ি চড়বার সঙ্গে সঙ্গে এইবারে তাঁর প্রজাপালক রূপটি ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে শুরু করল যেন। আমাদের মতো তুচ্ছ প্রাণীদুটিকে ‘বুলন্দ’ যেন গ্রাস করতে শুরু করল আস্তে আস্তে। বিয়াল্লিশটা সিঁড়ি পেরিয়ে যখন প্রকাণ্ড ইবানটার নীচে এসে দাঁড়ালাম, তখন আমরা সম্পূর্ণভাবে সম্রাটের শরণাগত। আশেপাশ বুলন্দের থেকে উঁচু কোনও কিছু না থাকার ফলে হু হু একটা ঠান্ডা হাওয়ায় প্রাণ জুড়িয়ে গেল। নীচের ঠা ঠা রোদ্দুরের থেকে আরাম পাওয়া গেল যেন। দেখলাম সামনে অত বিশাল একটা খিলান থাকলেও ভেতরে ঢোকার আসল দরজাটা কিন্তু প্রমাণ আকারের। ছিমছাম, পরিপাটি, মাপে মাপে। এ দরজায় দার্ঢ্য নেই, আহ্বান আছে।
“পৈসা নেহি দেনা পড়েগা দাদা… উধার দেখো… ভিউ দেখো।”
আড়চোখে একবার দেখে নিলাম বটে। সিক্রি গ্রামটা এই বুলন্দ দরওয়াজার নীচে থেকে দারুণ দেখাচ্ছে। কিন্তু ভালো করে দেখতে সাহস হল না। তাহলেই হয়তো ওই গুঁফো গাইড ব্যাটা আবার পেয়ে বসবে। রাগ হচ্ছিল বেজায়। বাকিরা ছেড়ে গেলেও এ লোকটা নাছোড়বান্দার মতন কেন যে আমাদেরই টার্গেট করেছে কে জানে! আশেপাশে ট্যুরিস্টদের তো কমতি নেই। তাহলে আমাদের সঙ্গেই এত প্রেম কিসের?
বুলন্দ দরওয়াজার ভেতরে ঢোকবার সময় আপনার কিন্তু খেয়ালই হবে না, আপনার মাথার উপর ওই অত বড় এক জিনিস দাঁড়িয়ে আছে। আপনার দৃষ্টি তখন শুধুই সামনের দিকে। মুক্তোর মতো দেখা যাচ্ছে সেলিম চিস্তির সমাধি আর তার সামনের ছোট্ট জলাশয়ে সে মুক্তোর ছায়া। বাঁদিকে জাম-ই-মসজিদ। সামনে বিশাল চত্বর। অন্তত ৪০০-৫০০ লোকের ইবাদতের স্থান। একবার ভেবে দেখুন, সম্রাটের সম্রাটত্বের এই মূর্ত প্রতীকটি কিন্তু আকবর দিওয়ান-ই-আমের সামনে বানাননি। দিওয়ান-ই-আম, যেখানে প্রতিদিন জড়ো হত প্রজার দল সম্রাটের সামনে, যেখানে প্রতি মুহূর্তে প্রয়োজন সাম্রাজ্যের উপর নিজের কর্তৃত্ব প্রকাশের, প্রতি মুহূর্তে প্রয়োজন শত্রুর বুকে ভয় ধরানোর আর প্রজাদের মনে শ্রদ্ধা জাগানোর, সেখানে বানানো হয়নি বুলন্দ দরওয়াজা। স্থাপত্যের এই অপূর্ব অর্ঘ্য আকবর দিয়েছেন সত্যিকারের শাহ-এন-শাহ-এর পায়ে। যেন বলতে চেয়েছেন, “তোমাদের সম্রাট হলেও, আমিও তো আসলে এই খুদা কে বান্দা।” তাই সিঁড়ির নীচে দাঁড়িয়ে এ স্থাপত্যের যে দার্ঢ্য আপনার মনে অনুরণন জাগাবে, তার চিহ্নমাত্র আপনি খুঁজে পাবেন না যদি একবার আপনি বুলন্দকে পেরিয়ে ভিতরে ঢুকে আসেন। বেশ কিছুক্ষণ পরে আপনি ধরতে পারবেন, “আরে তাই তো, অত বড় বস্তুটার তলা দিয়ে যে ঢুকে এলাম, কিছু বুঝলাম না তো।” জবাব নেই। ওয়াখেহি লা-জবাব।
সবে চত্বরটায় পা দিয়েছি কি দিইনি, একটা প্যাংলা লোক উদয় হল, “ইধর সে স্যার… ইধরসে দেখিয়ে… গাইড চাহিয়ে?”
বারুদে দেশলাই কাঠি পড়ল যেন। হঠাৎ খুব রেগে গেলাম — “দিমাগ খারাব করকে রখ দিয়া ইয়ার…”
প্যাংলা দেখি গরম খেয়ে বলল, “পুছনা পড়তা হ্যায় সাব। বিজনেস হ্যায়… হামে পতা হ্যায় কি…”
– চুপ করো… তুমহে কুছ নেহি পতা…
বলে হাতখানা একবার তার মুখের সামনে দিয়ে নেড়ে দিলাম। পেটের ভিতর থেকে আকবর বাদশাহ যেন বলে উঠলেন, “তকলিয়া।” মোকদ্দমা ডিসমিস। লোকজন ঘুরে ঘুরে দেখছিল বোধ হয় আমাকে। কিন্তু আমার তখন বাদশাহি মেজাজ। কারোর পরোয়া না করে গ্যাটম্যাট করে সিধে এগিয়ে গেলাম ডানদিকে। জাম-ই-মসজিদ, সেলিম চিস্তি আর ইসলাম খানের মকবারাটা নিয়ে ভালো ছবি পাওয়া যাবে ডানদিক থেকে।
ডানদিকের বারান্দাটাও দেখার মতন জিনিস। সাদাসিধে একদম। কিন্তু দৃঢ়তার ভাবটা এমন ভাবে পরিস্ফুট যে, সেটাই সৌন্দর্যের পরিপূরক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছাদের ভার রক্ষা করবার জন্য আর্চও আছে আবার কড়ি বরগাও আছে। এ দুটোই হিন্দু আর মুসলিম স্থাপত্যের আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য। কিন্তু এখানে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে সুন্দর করে। আকবরশাহী আমলের প্রায় সমস্ত স্থাপত্যেই বোধ হয় এই হিন্দু আর মুসলিম স্থাপত্যের মেলবন্ধন ব্যাপারটা লক্ষ করা যায়। এ অবশ্য আমার ব্যক্তিগত ধারণা। সুধী পাঠকবৃন্দ, রেফারেন্স চেয়ে বসবেন না যেন। দিতে পারব না।

সাদাসিধে থামগুলোকেই মন দিয়ে দেখছিলাম। হঠাৎ বগলের নীচে থেকে মিহি গলায় প্রশ্ন এল, “গাইড চাহিয়ে স্যার? গাইড…” তাকিয়ে দেখি ছ-সাত বছরের একটা পুঁচকে ছেলে প্রায় মুখে রক্ত তুলে বলে যাচ্ছে, “সব দিখা দেঙ্গে স্যার… সেলিম চিস্তি, যোধাবাঈ মহল, সুনহরা মকান, দিওয়ান-ই-আম, দিওয়ান-ই-খাস, অনুপ তালাও, বীরবল কি হাভেলি, খোয়াবগাহ, আনারকলি কি সুড়ঙ্গ…”
তাকিয়ে রইলাম খানিক্ষণ হাঁ করে। কিং‘রিয়াকশন’বিমূঢ় অবস্থা। এইটুকু পুঁচকে ছেলেও বলে গাইড হবে। আর ফিরিস্তি যা দিচ্ছে, তাতে তো মনে হয় এসব জিনিস এর কাছে আক্ষরিক অর্থেই ছেলেখেলা। ছেলেটার মুখে গাইড হবার কথাটা শুনে এতটাই হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম যে, প্রথমটা মুখ দিয়ে কোনও কথা বেরোল না। তারপর প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে বললাম, “নেহি চাহিয়ে ভাই… হামে গাইড নেহি চাহিয়ে।”
চিরকালই বাচ্চারা বড়দের থেকে বেশি বুদ্ধিমান হয়। ছেলেটা একটা মিষ্টি হেসে ‘ঠিক হ্যায়’ বলে তুড়ুক করে পালিয়ে গেল। বাচ্চাটার কথায় হঠাৎ মাথায় একটা ব্যাপার ধাক্কা মারল। কথাটা প্রথম থেকেই শুনছিলাম, কিন্তু আগে খেয়াল হয়নি। ‘আনারকলি কে সুড়ঙ্গ’! বলে কী?! সে কিসসা তো জানি লাহোরের। এখানে, এই ফতেপুর সিক্রিতে হঠাৎ আনারকলি উদয় হলেন কী করে? আশেপাশে গাইডদের খদ্দের শিকার তখনও চলছে। একটু কান খাড়া রাখলাম। তাজ্জব ব্যাপার! ‘আনারকলি কে সুড়ঙ্গ’ যেন শেষ পাতের প্রাণহরাটি। আবশ্যিক আইটেম। থাকবেই থাকবে। সমস্ত মার্কেটিং কলই দেখি শুরু হচ্ছে ‘দিওয়ান-ই-আম, দিওয়ান-ই-খাস’ দিয়ে আর শেষ হচ্ছে ওই ‘আনারকলি কে সুড়ঙ্গ’ দিয়ে!
কনফিউশনের একশেষ। আনারকলি ফতেপুর সিক্রিতে এলেন কোত্থেকে? অঙ্ক তো মিলছে না। ১৫৬৯ সালে সেলিম চিস্তির কৃপায় জন্মালেন সেলিম। আকবর আদর করে তাঁর প্রথম পুত্রের নাম রাখলেন ‘শেখুবাবা’ আর সেই সঙ্গে আদেশ দিলেন শেখ সেলিম চিস্তির বাসস্থানের কাছে সিক্রি গ্রামে নতুন রাজধানী বানানোর। ১৫৭১ থেকে মোটামুটি থাকতে আরম্ভ করলেন আকবর সিক্রিতে। জমজমাট হয়ে উঠল শহর। আকবরের নবরত্ন সভা, দীন-ই-ইলাহী ধর্ম প্রবর্তন, মনসবদারী প্রথা — এক কথায় যা কিছুর জন্য আকবর ‘আকবর দ্য গ্রেট’ হয়েছেন, সব এই সিক্রিতে। গুজরাত জয় করবার পর আকবর নতুন করে শহরের নাম রাখলেন ফতেপুর সিক্রি আর হুকুম দিলেন, “বানাও বুলন্দ এক দরওয়াজা।” কিন্তু সিক্রির এই সৌভাগ্য বেশিদিনের জন্য স্থায়ী হয়নি। জলের অভাবের জন্য ১৫৮৫ সালে পাকাপাকি ভাবে পরিত্যক্ত হয় সিক্রি। তল্পিতল্পা গুটিয়ে আকবর যান লাহোরে।
এইবারে সুধী পাঠক, হিসেবটা কষে দেখুন। সিক্রি যখন পরিত্যক্ত হয়, অর্থাৎ ১৫৮৫ সালে আকবরের আদরের ‘শেখুবাবা’র বয়েস মাত্র ১৬। মুঘল শাহজাদা হিসেবে পেকে ঝানু হবার বয়েস তো বটেই। উপরন্তু সেলিম ছোটবেলা থেকেই ছিলেন পাঁড় মাতাল এবং ওই বয়সে যতদূর হওয়া সম্ভব, ততদূর লম্পট। সুতরাং সেলিমের ফষ্টিনষ্টির দু-তিনখানা কিস্‌সা সিক্রিতে হতেই পারে। কিন্তু আনারকলি? প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে বাপের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ? তাও ১৬ বছর বয়সে? তার উপর আবার সে বাপের নাম আকবর বাদশাহ। আধখানা হিন্দুস্থানের হর্তা-কর্তা-বিধাতা। কার ঘাড়ে কটা মাথা ছিল সে সময়ে যে, চ্যাংড়া ছোঁড়ার মহব্বতে আপ্লুত হয়ে জিল্লেলাহীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহে ১৬ বছরের সেলিমকে সৈন্য-টৈন্য দিয়ে সাহায্য করবে। নাকি সেলিমের নিজেরই এত সমরপ্রতিভা ছিল যে, ওই ১৬ বছর বয়সেই নিজের সেনাবাহিনী গঠন করবার হিম্মত তিনি একাই দেখাতে পারতেন? তর্কের খাতিরে তাই যদি মেনে নিই, তাহলেও যে খটকা। তাহলে তো পাপী মন আরও প্রশ্ন করে যে, ১৬ বছর বয়সে যে লোক এত কেরামতি দেখায়, সে লোক নিজে বাদশাহ বনে আফিম, মদ আর নূরজাহানে বুঁদ হয় কেন? কেন যুদ্ধ-টুদ্ধ জিততে তার একটা খুররম (পরবর্তীকালের শাহজাহান) আর একটা মহব্বত খাঁ লাগে?
তার উপর আমি যতদূর জানি, লাহোরে আনারকলির দস্তুরমতো মকবারা আছে। উইলিয়াম ডালরিম্পল তাঁর ‘দ্য লাস্ট মুঘল’ বইতে সে মকবারার উল্লেখও করেছেন। একটা বাজারও আছে আনারকলির নামে। সুতরাং সেলিম-আনারকলির মহব্বতের কিসসা যে লাহোরের প্রোডাক্ট, সে সম্বন্ধে সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু ফতেপুর সিক্রিতে আনারকলি উদয় হলেন কী করে? তাঁর সুড়ঙ্গটাই বা এল কি করে এ তল্লাটে?
খানিক ভেবেচিন্তে মনে হল এ কামাল আসলে কে আসিফ, পৃথ্বীরাজ কাপুর, দিলীপ কুমার আর মধুবালার। অহো বলিউড! কী জাদুই ছড়িয়েছ ভারতীয় দর্শকমানসে। গোটা ইতিহাস পালটে দিলে বাবা। আমার আন্দাজ মতো, ‘মুঘল-ই-আজম’ মুক্তি পাওয়ার আগে পর্যন্ত ফতেপুর সিক্রিতে ‘আনারকলি কে সুড়ঙ্গ’-এর অস্তিত্ব ছিল না। ছবিটা মুক্তি পাওয়ার পরে কোনও উর্বরমস্তিষ্ক গাইড এটির আমদানি করে। সিক্রিতে কোন জায়গাগুলো কী জন্য ব্যবহার হত তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যেই প্রভূত বাকবিতণ্ডা আছে। সুতরাং বেওয়ারিশ যে কোনও একটা সুড়ঙ্গের বা নিদেনপক্ষে গর্তের মালিকানা চট করে আনারকলির হাতে ধরিয়ে দেওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। সিক্রিতে পর্যটকরা আসেন মুগ্ধ হতে। ইতিহাস পড়তে নয়। সুতরাং তাঁদের আরও মুগ্ধ করবার হাতিয়ার যদি পাওয়া যায়, মন্দ কী। কিন্তু ভয় হয় যে, এই ট্র্যাডিশন ‘সমানে চলিতে’ থাকলে কোনওদিন হয়তো দেখব বাচ্চারা স্কুলের পাঠ্য বইতে পড়ছে, পাণিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ নয়, রাজস্থানের মেড়তার কাছে আকবর নিজের ভগ্নিপতি আর আজমীরের সুবাদার সরিফুদ্দিন হুসেনের যে বিদ্রোহ দমন করেছিলেন, সেটাই ভারতবর্ষে মুঘল শাসনের ভিত্তি সুদৃঢ় করেছিল।
এই প্রথম গাইড না নেবার জন্য একটা আফসোস হল। এ এস আই-এর গাইড বইতে আর যাই থাকুক, এই ‘আনারকলি কে সুড়ঙ্গ’-এর কথা যে লেখা নেই। কিন্তু কোন জায়গাটির ফোকট মালিকানা আনারকলিকে দেওয়া হয়েছে, সে সম্বন্ধে কৌতূহল একটা থেকেই গেল।

চত্বরটায় দাঁড়ালে সবার আগে যে জিনিসটা নজর কেড়ে নেয়, সেটা হল সেলিম চিস্তির মকবারা। আকবর লাল পাথর ভয়ানক পছন্দ করতেন। আগ্রা কেল্লাই বলুন আর এই ফতেপুর সিক্রিই বলুন, সর্বত্র লাল পাথরের ছড়াছড়ি করে দিয়েছিলেন। তাঁর নাতির আবার পছন্দ ছিল মার্বেল। ওই এক মার্বেল দিয়েই আকবরের নাতিজান আগ্রায় যমুনার তীরে কী একখানা ইমারত খাড়া করে দিয়ে গেছেন, গোটা দুনিয়া তাঁর বর্ণনা দিতে গিয়ে নালেঝোলে একশা। আগ্রা কেল্লায় দেখবেন যা লাল পাথরের কীর্তি, সব আকবরের তৈরি আর মার্বেল পাথরে যা আছে তা তাঁর নাতিজান অর্থাৎ শাহজাহানের কীর্তি। ফতেপুর সিক্রিতে এই একটি ইমারত, সেলিম চিস্তির মকবারাটি, বানাবার জন্যই বোধ হয় এই প্রথমবার আর এই শেষবার আকবর মার্বেল পাথর ব্যবহার করেন।
ফতেপুর সিক্রির অন্যান্য সমস্ত স্থাপত্যে আকবরশাহী চালের ঠমক আলুথালুভাবে ছড়িয়ে রয়েছে। একমাত্র ব্যাতিক্রম এই সেলিম চিস্তির মকবারা। এর শান্ত স্নিগ্ধ ভাবটি যেন সেলিম চিস্তির প্রতি আকবরের শ্রদ্ধাকেই প্রকাশ করেছে। দেখুন দিকি ছাদের প্যারাপেটগুলো। কতখানি চওড়া বানানো হয়েছে যাতে সিক্রির কড়া রোদ্দুর মকবারার ভিতরে না যায়। ভেতরে আসুক শুধু আলো, তাপ নয়। ঠিক সেলিম চিস্তির চরিত্রের মতো। পাবে শুধু জ্ঞান, অহঙ্কার নয়। আর গোটা মকবারাটার গা জুড়ে যে জালির কাজ, সে নিয়ে তো নতুন কিছু বলার নেই। যদি নিজে চর্মচক্ষে দেখে থাকেন, তাহলে বুঝবেন জন্ম সার্থক। আর যদি না দেখে থাকেন সময় করে জন্মের শোধ একবার দেখে আসবেন। ও জিনিস কাউকে বর্ণনা করে বোঝানো যায় না। আমি শুধু একটাই জিনিস লক্ষ করতে বলব। জালিগুলোকে যখন বাইরে থেকে দেখবেন, তখন ভিতরের কিছুই দেখতে পাবেন না। কিন্তু ভিতর থেকে বাইরের দিকে দেখলে মনে হবে ওগুলো পাথরের জালি নয়, সামান্য চটের কাজকরা পর্দা। বাইরের সমস্ত কিছু দেখতে পাবেন ছবির মতন পরিষ্কার। আকবর বোধ হয় বলতে চেয়েছেন যে, “তুমি নিজে বুঝতে না পারো সেলিম চিস্তিকে, কিন্তু ইনি তোমার সবটুকু বোঝেন। তাই দেখ না, বাইরের থেকে তুমে দেখতে পাও না কিছুই, কিন্তু ইনি ভেতরে থেকেও দেখেন তোমার সবটুকু।” এ মকবারায় আরও একটা জিনিস লক্ষ করতে হয়। চওড়া প্যারাপেটের ভার বইবার জন্য প্রতিটি কোণে ওই যে সাপের মতো প্যাঁচালো স্ট্রাকচার, আর কোথাও দেখেছেন কি ওরকম? দেখে কেমন ফকির দরবেশদের লাঠির কথা মনে হয় না? সেলিম চিস্তি কি ওই রকমই একটা…
সেলিম চিস্তির মকবারার বাঁ দিকে জামি মসজিদ আর ডানদিকে ইসলাম খানের মকবারা। ফতেপুর সিক্রির জামি মসজিদ দিল্লির ‘নেমসেক’-এর মতো বড় না হতে পারে, কিন্তু এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব তার থেকে বেশি। এই মসজিদের শেহানে দাড়িয়েই আকবর প্রথম খুতবা পড়িয়েছিলেন দীন-ই-ইলাহির। নিজেকে ঘোষণা করেছিলেন ইনসান-ই-কামিল অর্থাৎ সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুষ হিসাবে। শুনেছি এ মসজিদকে নিজে হাতে ঝাঁটপাট দিয়ে পরিষ্কার করতেন আকবর। লাল পাথরে তৈরি এ মসজিদে দুইদিকে দুটো গম্বুজ আছে। ওই গম্বুজ দুটোর নীচের ঘরগুলোতে গেলে দেখতে পাবেন কী দুর্দান্ত ভাবে চারকোনা ঘরকে আটকোনা করে নিয়ে তার মাথায় বসানো হয়েছে গোলাকৃতি গম্বুজ।
আমরা যখন গিয়েছিলাম, তখন মসজিদের সারাইয়ের কাজ চলছিল। মূল মিহরাবের সামনে একটা বদখত লোহার খাঁচা পুরো ভিউটা বরবাদ করে দিয়েছিল। না হলে একটা আন্দাজ দিতে পারতাম যে, মূল প্রার্থনাগৃহটা ঠিক কতটা বড়। আকবরশাহী স্থাপত্যে এই ‘বড়’ ব্যাপারটা বেশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। জাঁকজমকের দিকে জালালউদ্দিন বোধ হয় ততটা গুরুত্ব দেননি, যেমনটা দিয়েছেন শাহজাহান। লাল কেল্লার দিওয়ান-ই-খাস বা আগ্রা কেল্লার মুসম্মন বুর্জ, যেগুলো শাহজাহানের সময়ে তৈরি অথবা সারাই করে নতুন তৈরি, তাতে সূক্ষ্ম নকশা বা পিয়েত্রা-দুরার (ইংরেজিতে গ্লাস ইনলে ওয়ার্ক) আধিক্য বেশি। আকবরশাহী স্থাপত্যে সামগ্রিক আবেদনের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। চেষ্টা করা হয়েছে যেন সম্রাটের দার্ঢ্যটা তাঁর তৈরি প্রত্যেককটা স্থাপত্যের মধ্যে দিয়ে ফুটে বের হয়। সেই জন্যেই বোধ হয় আকবরের তৈরি যত স্থাপত্য আছে, তার সামনে দাঁড়ালেই প্রথম চোটে ওই একটা কথাই মনে হয় — “বাপরে! মালটা কী বড় রে বাবা!”
শাহজাহানী স্থাপত্যে এই দার্ঢ্যের ব্যাপারটা যেন একটু কম। জাঁকজমকের ভাগটা যেন বেশি। মসজিদ চত্বরের ডানদিকে বাদশাহি দরওয়াজা। আকবরের নিজস্ব ব্যক্তিগত প্রবেশপথ। সাদাসিধে, ছিমছাম, প্রমাণ মাপের। এই বাদশাহি দরওয়াজার সামনে দাঁড়িয়ে বুলন্দের দিকে তাকালে দেখতে পাবেন আকবর বাদশাহের অন্য রূপ। বাইরের ওই অত বিশাল খিলানের বদলে পিছনদিক থেকে দেখা যাচ্ছে তিনটে ছোট ছোট খিলান। সম্রাট নন, এখানে আকবর কারও পুত্র, পতি বা পিতা। তাঁর হাজার হাজার প্রজার মতোই তিনিও এখানে নিজস্ব পরিবারের কর্তা শুধু। বাইরের তিনটি বিশাল ছত্রী যেমন তাঁর বাদশাহি তাজ, পিছনের তিনটি খিলানের উপরে ওই ছোট ছত্রীগুলো যেন শাহজাদাদের প্রতীক। পিতা আকবর নিজের সন্তানদের বাইরের সমস্ত আঘাত, দুঃখ থেকে রক্ষা করবার চেষ্টা করছেন। ঠিক যেমনটা করত তাঁরই কোনও প্রজা, ঠিক যেমনটা করে আজকেও কোনও আম আদমি।
বাদশাহি দরওয়াজা দিয়ে বেরিয়ে সামনেই একটা প্রায় শুকিয়ে যাওয়া গাছ চোখে পড়ল। বেশ বড় গাছ। যেভাবে শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে দাঁড়িয়ে আছে, তাতে মনে হয় এককালে ভালোই ছায়া দিয়েছে। আজ খালি। তবুও এখনও লক্ষ করলে কিছু কিছু সবুজ পাতা দেখা যায়। এদিকে ওদিকে দিব্বি গজিয়ে উঠেছে। কিন্তু গাছটার সৌন্দর্য ওই বিক্ষিপ্ত পাতাগুলোর জন্য নয়। শুকনো ছড়িয়ে থাকা ডালপালাগুলোর জন্য। গাছটার বর্তমানের জন্য নয়, তার অতীতের জন্য। এই সিক্রি গ্রামের ভাগ্যও যেন অনেকটা তাই। এখন কেমন আছে সিক্রি, তার খোঁজ রাখে না কেউ। সেকালে কেমন ছিল, তার গল্প শুনতে ছুটে ছুটে আসে দূর-দূরান্ত থেকে। সিক্রির বর্তমান বাসিন্দারাও তাই প্রাণপণে আঁকড়ে পড়ে আছে তাদের অতীত। সে অতীতের গল্প শোনাবার জন্যে তাই এত কাড়াকাড়ি। ছ-সাত বছরের বাচ্চা ছেলেও গাইড হবার জন্য ঝোলাঝুলি করে। দশ টাকার জন্য গুঁফো গাইড আধ ঘণ্টা ধরে ঘ্যান ঘ্যান করে। বিজনেসের দোহাই দেয় প্যাংলা। বর্তমান নয়, সিক্রির অতীতটাই তাদের প্রাণভোমরা। বেঁচে থাকার রসদ। সে রসদের এক খাবলা পাওয়ার জন্য লেগে পড়ে সবাই নিলামে। ৫০ রুপিয়া, ৪০ রুপিয়া থেকে ধাপে ধাপে নেমে ১০ রুপিয়া। এই বুলন্দ দরওয়াজার ওপরেই যে দাঁড়িয়ে আছে সিক্রি গ্রামের অর্থনীতি। এখনও।

 


 

দস্তরখানের নেশাড়ু
দেবাংশু সিনহা
গল্প সংকলন
সৃষ্টিসুখ প্রকাশন
মূল্য – ৯৯ টাকা
প্রচ্ছদ ও অলংকরণ – সুমিত রায়
অনলাইন অর্ডার – সৃষ্টিসুখ, আমাজন
ই-বুক – গুগল প্লে স্টোর, সৃষ্টিসুখ অ্যানড্রয়েড অ্যাপ
সৃষ্টিসুখ আউটলেট – সৃষ্টিসুখ, ৩০এ সীতারাম ঘোষ স্ট্রিট, কলকাতা – ৯, যোগাযোগ – ৯০৫১২ ০০৪৩৭