মনস্তত্ত্ব // রূপঙ্কর সরকার

সুতপা দেখল, লোকটা তার একেবারে উলটোদিকে বসেছে। ঘরটার দেওয়াল জুড়েই বসার ব্যবস্থা করা আছে, টানা একটা গদি দেয়া, সোফার মতো। এমনকী ডান এবং বাঁদিকের দেয়ালের কোন ঘুরেও বসার জায়গাটা চলে গেছে অনেকটা। মাঝে মাঝে গোটা দুয়েক স্টিল আর কাঁচের সেন্টার টেবিল। তাতে কয়েকটা ম্যাগাজিন রাখা আছে। যদি অনেক পেশেন্ট এবং তাদের বাড়ির লোক একসঙ্গে আসেন, তবে পুরো জায়গাটা ভর্তি হওয়ার কথা। কিন্তু এটা সাধারণ ডাক্তারের চেম্বার নয়, তাই তেমন ভিড় রোজ হয় না। তবে আগের চেয়ে পেশেন্ট অনেক বেড়েছে। রোগী বাড়লে ডাক্তারের সুবিধে। ডাক্তারের সুবিধে হলে সুতপার সুবিধে। অতএব রোগী বাড়ুক।

একেবারে উলটোদিকে বসেছে লোকটা। লোকটা না বলে ছেলেটা বললেই হয়। হাঁ করে তাকিয়ে আছে সুতপার দিকে। হাঁ করে তাকিয়ে থাকার মতোই চেহারা ছিল সুতপার। কিন্তু – যাক সেসব কথায় কাজ নেই, ওসব হাঁ করা-টরা অভ্যাস হয়ে গেছে তার, নতুন কিছু নয়। সুতপার কাজ বিশেষ নেই আজকে। ওষুধ বেচার ছেলেগুলো এলে ওদের সঙ্গে কিছু রঙ্গ-রসিকতা করা যায়। ওরাও কেউ আসেনি আজ। অ্যাপয়েন্টমেন্ট রেজিস্টারের পাতা নাড়তে নাড়তে কয়েকবার সুতপা চোরা চাউনিতে দেখল ছেলেটাকে। নাঃ! ছেলেটা ওর দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকলেও ওকে দেখছে না আদপেই। তার দৃষ্টি সুতপাকে ছাড়িয়ে, পেছনের দেয়াল ছাড়িয়ে, চলে গেছে অনেক দূর। ছেলেটার এখানে বসে থাকার কোনও কারণই ছিল না। আজ ও ছাড়া পেশেন্ট কেউ নেই। কিন্তু ডাক্তার হঠাৎ ‘একটু আসছি’ বলে বেরিয়ে গেছেন। তিনি না আসা পর্যন্ত ছেলেটিকে বসতেই হবে।

কিছুক্ষণ পরে যেন সম্বিত ফিরল ছেলেটির। বলল, “ও দিদি, ডাক্তারবাবু কখন আসবেন?”
সুতপা সামান্য মুখ টিপে হেসে বলল, “বাবু নয়, বিবি।”
ছেলেটা ঠিক বুঝেছে বলে মনে হল না। সে বলল, “কী বললেন দিদি?”
সুতপার প্রথম প্রথম রাগ হত। বাবার বয়সি লোকও ‘দিদি’ বলত, এ তো তাও কাছাকাছি বয়সের। বড় বড় কায়দার হাসপাতালে রিসেপশনিস্টদের ‘ম্যাডাম’ বলে সম্বোধন করে লোকজন। সুতপাদের কপালে সেসব নেই। এখন এসব গা সওয়া হয়ে গেছে। সে বলল, “আপনি আগে এই ডাক্তারকে দেখাননি? এই প্রথম?”
ছেলেটি বলল, “হ্যাঁ। সে তো ফর্মে লিখেইছি।”
সুতপা ফর্মটায় একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলল, “ও, এখানকার ডাক্তার পুরুষ নন, মহিলা, ডকটর মিজ কর। তাঁকে দেখাতে আপত্তি নেই তো?”
ছেলেটি বলল, “ন-ন্না- মানে আপত্তি আর কী –”
সুতপা বলল, “পেশেন্ট কে?”
ছেলেটি বলল, “আমি।”
সুতপা বলল, “সে কী! আপনি বাড়ির কাউকে সঙ্গে আনেননি? ম্যাম কি দেখবেন? জানি না।”
ছেলেটি উঠে এল কাউন্টারের সামনে, “ও দিদি, প্লিজ আমাকে একটু দেখার ব্যবস্থা করে দিন। আমার বড় বিপদ –”
সুতপা বলল, “দেখুন, এগুলো আমাদের হাতে নয়। ম্যাম এসব ব্যাপারে খুব স্ট্রিক্ট। অনেক কথাই পেশেন্টকে বলা যায় না, বাড়ির লোক বা সঙ্গের লোককে বলতে হয়। অনেক কথা জানতেও হয়। ওষুধ-বিষুধও তেনাদের বুঝিয়ে দিয়ে হয়। ম্যাম আসার আগে আপনি কাউকে ফোন করে আনিয়ে নিন না।”
“ফোন!” – শব্দটা শুনেই ছেলেটির মুখ চোখ কেমন অন্যরকম হয়ে গেল। কেমন পাঁশুটে মেরে গেল সে। সুতপাও ভয় পেয়ে গেল। বারবার ম্যাম বারণ করেছেন পেশেন্ট বা পেশেন্ট পার্টির সঙ্গে রেজিস্ট্রেশন ছাড়া অন্য কথা বলতে। উনি জানতে পারলে তুলকালাম হবে। কিন্তু সুতপা তো ভালোর জন্যই – সে তাড়াতাড়ি বলল, “ঠিক আছে, আপনি বসুন না। অত ভাবছেন কেন? ম্যামকে আসতে দিন, কিছু একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবেই।”
ছেলেটি আবার গিয়ে নিজের জায়গায় বসে পড়ল। এবার আর সুতপার দিকে তাকাচ্ছে না, বারবার বাইরের কাঁচের দরজার দিকে দেখছে। সম্ভবত ম্যাম কতক্ষণে আসেন, তারই প্রতীক্ষায় আছে।

হাতে কয়েকটা ফাইল আর একটা ঝোলানো ব্যাগ নিয়ে যৌবনের শেষপ্রান্তে পৌঁছনো একজন মহিলা ঢুকলেন। কড়া ইস্তিরি করা তাঁতের শাড়ি, সামান্য ভারীর দিকে চেহারা, ছোট করে কাটা একমাথা চুল, চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা। খুব আত্মবিশ্বাসী পদক্ষেপে ভেতরের দিকে যেতে যেতে তিনি বললেন, “কজন আছে সুতপা?” ভদ্রমহিলার গলাটা খুব মিষ্টি।
সুতপা বলল, “ইনিই শুধু আছেন ম্যাম –”
ম্যাম বললেন, “ইনি? একলা? বাড়ির লোক?”
ছেলেটি দুহাত জোড় করে এগিয়ে গেল, “আমাকে প্লিজ দেখুন স্যার, মানে, ম্যাডাম, আমার সঙ্গে আসার মতো কেউ নেই –”
ছেলেটির মুখের দিকে খুব ভালো করে দেখলেন ভদ্রমহিলা। খানিক চিন্তা করে তারপর বললেন, “কিন্তু – ঠিক আছে, আসুন।”
চেম্বারে ঢুকে ডাক্তারের সামনের চেয়ারে বসার আগেই ছেলেটির আপাদমস্তক খুব ভালো করে জরিপ করে নিলেন ডক্টর মিজ কর। সাইকায়াট্রিক পেশেন্ট হলে তার চুল আঁচড়ানো, হাতের নখ কাটা, জামার বোতাম লাগানো, কীরকম ভাবে জামাকাপড় পরেছে, সব খুঁটিয়ে দেখলে সেখান থেকেই অনেক তথ্য পাওয়া যায়, যেগুলো পরে কাজে আসে। সঙ্গে যখন বাড়ির নিকটাত্মীয় কেউ নেই, যাঁর কাছে রোগী সম্পর্কে কিছু জানা যেতে পারে।
ডক্টর মিজ কর ডাকলেন, “অখিলেশ?”
সুতপা দেয়ালের পাশ থেকে মুখ বাড়াল, “অখিলেশ আজ আসেনি ম্যাম।”
মিজ কর বললেন, “ও, তাহলে তুমিই একটু প্রেশারটা চেক করে দাও তো। যান ভাই, গিয়ে ওই বেডে শুয়ে পড়ুন।”
ছেলেটিকে ভালো করে পরখ করলেন মিজ কর। হাতের তেলো উলটে পালটে দেখলেন, চোখ টেনে দেখলেন, জিভ দেখলেন, স্টেথো দিয়ে বুক দেখলেন, তারপর সুতপাকে বললেন, “প্রেশার নরমাল তো?”
সুতপা বলল, “হ্যাঁ ম্যাম, ওয়ান টোয়েন্টি বাই এইট্টি।”
– ঠিক আছে, তুমি কাজে যাও। হ্যাঁ ভাই, বলুন আপনার কী সমস্যা। নামটা কী ভাই?
ছেলেটি বলল, “বিশ্বরূপ বাগচি।”
ডাক্তার প্রেস্ক্রিপশনের ওপর দিকে নামটা লিখতে লিখতে বললেন, “আচ্ছা, আপনাদের বংশে কারও কোনও মেন্টাল প্রবলেম ছিল?”
– আমি যতদূর জানি, ছিল না ম্যাডাম।
ডাক্তার বললেন, “কোনও বড় অসুখে ভুগেছেন হাল আমলে?”
ছেলেটি বলল, “না ম্যাডাম।”
– আগে? ছোটবেলায়?
– তেমন সিরিয়াস কিছু না।
– আমার কাছে কিচ্ছু লুকোবেন না। কোনও নেশা করেন? এনিথিং?
ছেলেটি বলল, “না ম্যাডাম, কিচ্ছু করি না, বিশ্বাস করুন –”
– বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ব্যাপার নয়। আপনার ট্রিটমেন্টের জন্য সব রকম তথ্য দরকার আমাদের। আসুন তো, নেমে আসুন। ওই চেয়ারটায় বসুন।
– সে আমাদের অফিসের পিকনিকে মাঝে মাঝে দলে পড়ে ড্রিঙ্ক করেছি, তাও বছরে একদিন করেই।
– অফিসের পিকনিক? হ্যাঁ, কী কাজ করেন আপনি?
– একটা অডিট ফার্মে ক্লার্কের কাজ করি।
– খুব চাপ কাজের?
– ইয়ার এন্ডে মাঝে মাঝে খুব চাপ থাকে, ওই এপ্রিল-মে মাসগুলোয়। তা ছাড়া এমন কিছু না।
– আচ্ছা ভাই বিশ্বরূপ, আপনি বিয়ে করেছেন?
কিছুক্ষণ চুপ থেকে বিশ্বরূপ বলল, “না।”
– কোনও লাভ অ্যাফেয়ার? কিচ্ছু লুকোবেন না, তাহলে চিকিৎসা করতে পারব না। আমাকে তো জিনিসটার রূটে পৌঁছতে হবে। এখনও কিন্তু আপনি আপনার সমস্যার কথাই বলেননি।
বিশ্বরূপ খপ করে মিজ করের হাত চেপে ধরল, “আমাকে বাঁচান ম্যাডাম, আমাকে বাঁচান। আমি রোজ ফোন পাচ্ছি, অনেক বার করে পাচ্ছি। আমি পাগল হয়ে যাব ম্যাডাম, আপনার পায়ে ধরি– হাত ছেড়ে সে এবার টেবিলের তলা দিয়ে পায়ের দিকে হাত বাড়ায়।”

এরকম পরিস্থিতি অনেক দেখা আছে মনের ডাক্তারদের। অনুপমা কর নিজের চাকা লাগানো চেয়ারটাকে একটু পেছনে নিয়ে গেলেন। পেশেন্ট ভায়োলেন্ট হয়ে যেতে পারে হঠাৎই। অখিলেশের এখনই প্রয়োজন। তবে সে যখন নেই, তখন আর সে কথা ভেবেও কাজ নেই। তিনি বললেন, “দেখুন, আপনি শান্ত হয়ে বসুন। এমন করলে আমি কিন্তু বের করে দেব চেম্বার থেকে। যে চিকিৎসার জন্য এসেছেন, সেটাই হবে না। এই জন্যই বাড়ির লোক আনতে বলা হয়। কী, শান্ত হয়ে কথার উত্তর দেবেন? আমি কিন্তু সময় নষ্ট করব না।”
বিশ্বরূপ বিড়বিড় করে বলল, “বসছি, কিন্তু আমি পাগল হয়ে যাব।” বলে রুমাল দিয়ে চোখ মুছতে শুরু করল।
অনুপমা বললেন, “আরে আমাকে খুলে বলবেন তো কী সমস্যা? এমন করবেন যদি তো আমার কাছে এলেন কেন?”
বিশ্বরূপ হঠাৎ সোজা তাকাল অনুপমার দিকে, “আমি রোজ ফোন পাচ্ছি ম্যাডাম, রোজ। ওর ফোন। কোনও কথা হয় না জানেন, ফোন ধরলেই ওপাশ থেকে শুধু নিশ্বাসের আওয়াজ। কিচ্ছু বলে না জানেন – কিচ্ছু না।” আবার ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল বিশ্বরূপ, “আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি ম্যাডাম, আমাকে বাঁচান প্লিজ।”
অনুপমা বললেন, কার ফোন পাচ্ছেন আপনি?
– তৃষার।
– তৃষা? কে তিনি, আপনার বান্ধবী?
– হ্যাঁ ম্যাডাম।
– তিনি কোনও কথা বলছেন না? তো আপনি ঘুরিয়ে ফোন করছেন না কেন?
বিশ্বরূপ চুপ করে থাকে।
– কিংবা দেখা করে জিজ্ঞেস করছেন না কেন এমন ব্যবহারের অর্থ?
– আজ এক বছর হল তৃষা মারা গেছে ম্যাডাম।

অনুপমা প্রেসক্রিপশনটা টেনে নিয়ে পেশেন্টের নাম, বয়স, বিপি, ইত্যাদি লিখতে শুরু করেছেন। এমন গল্প তিনি নতুন শুনছেন না। অ্যাংক্সাইটি ডিসর্ডার, অডিটরি হ্যালুসিনেশন, কিংবা দুটোর মিশ্রণ। অনেক কমপ্লিকেটেড সিম্পটম নিয়ে রোগী আসে, এটা তো কিছুই নয় তেমন। আপাতদৃষ্টিতে স্কিটসোফ্রেনিয়ার দিকে যাচ্ছে মনে হতে পারে, তবে তেমন কিছু নয় বলেই ধারণা। সেরে যাবে চিকিৎসা করলেই।
অনুপমা বললেন, “কবে থেকে আপনার মনে হচ্ছে যে আপনি তাঁর ফোন পাচ্ছেন?”
বিশ্বরূপ বলল, “তৃষা মারা যাওয়ার দিন পনেরো পর থেকে।”
– প্রথম যেদিন ফোন আসে, তখন কি তাঁর কথাই ভাবছিলেন?
বিশ্বরূপ মাথা নীচু করে চুপ করে থাকে।
– আচ্ছা বিশ্বরূপ, আপনার খিদে কেমন পায়? কিছুক্ষণ না খেয়ে থাকলে খিদে হয়?
– হ্যাঁ ম্যাডাম। মানে, ঠিক জানি না। আসলে তেমন করে ভেবে দেখিনি।
– ঘুম? রাত্তিরে ভালো ঘুম হয়?
বিশ্বরূপ মাথা নাড়তে থাকে মুখ নীচু করে।
– এই এক বছর ধরেই রাত্তিরে ঘুমোচ্ছেন না? কাজ করছেন কী করে?
বিশ্বরূপ চুপ করে থাকে। কিছুক্ষণ পরে বলে, “রাত্তিরেও ফোন আসে তো। তখনই বেশি আসে। সকালের দিকে একটু দেরি করে উঠি।”
অনুপমা বললেন, “আচ্ছা বিশ্বরূপ, আপনি এসব কথা বাড়িতে কাউকে বলেছেন?”
বিশ্বরূপ মাথা নাড়ে, “কোনও বন্ধু, কোলিগ, কাউকে?”
বিশ্বরূপ তাও মাথা নাড়ে।
অনুপমা বললেন, “আমি খুব দুঃখিত আপনার বান্ধবীর কথা শুনে। তবে তিনি আপনাকে ফোন করছেন এটা ভাববেন না। ওটা আসলে আপনি চিন্তা করছেন। এমনটা হতেই পারে। আমি কিছু ওষুধ দিয়ে দিচ্ছি, তবে এগুলো আমাশার ওষুধ না, তাই সিম্পটম কমে গেলেও নিজে নিজে বন্ধ করবেন না কোনও মতেই। একটা রেগুলার ইন্টারভ্যালে ডাক্তারের কাছে কাউন্সেলিং-এর জন্য যেতে হবে। আমি আমার জুনিয়রের ফোন নাম্বার দিয়ে দিচ্ছি, ওকেই দেখাবেন। আমার কাছে নিয়মিত আসাটা একটু এক্সপেনসিভ হয়ে যাবে আপনার পক্ষে।”
বিশ্বরূপ আবার অনুপমার হাত চেপে ধরতে গেল, তিনি সতর্ক ছিলেন, ঠিক মুহূর্তে সরিয়ে নিলেন।
বিশ্বরূপ কাতর গলায় বলল, “ম্যাডাম, আমি আর কারও কাছে যাব না। আপনার অনেক নাম শুনে এসেছি। ‘ডক্টর কর’ শুনে আমি তো ডাক্তারবাবুই ভেবেছিলাম। সে যাই হোক, যত এক্সপেনসিভ হোক, আপনি আমায় ভালো করে দিন। আমি ধীরে ধীরে পাগল হয়ে যাব পরিষ্কার বুঝতে পারছি। আপনি বাঁচান আমাকে।”
অনুপমা বললেন, “দেখুন, আমি তো আপনাকে সারিয়ে তোলার চেষ্টাই করছি। এবার আপনি যতখানি কোঅপারেট করবেন, আমার কাজটা তত সহজ হবে। আচ্ছা আপনি যে বললেন, ফোন পান, কখন আসে ফোনগুলো?”
বিশ্বরূপ বলল, “সারাদিনই আসে, বিশেষ করে আমি যখন একলা থাকি।”
অনুপমা বললেন, “কী করে বোঝেন ফোনটা তাঁর? স্ক্রিনে তাঁর সেভ করা নম্বর ওঠে?”
বিশ্বরূপ উত্তেজিত হয়ে বলে, “হ্যাঁ ম্যাডাম, হ্যাঁ। আমি কি না দেখে  বলছি?”
অনুপমা নিজের মনে বিড়বিড় করেন, “ভিসুয়াল, অডিটরি, দু রকম হ্যালুসিনেশন একসঙ্গে?” তারপর বলেন, “কই আপনার লগটা দেখান তো আমাকে, কোথায় ইনকামিং কলের লিস্ট?”
বিশ্বরূপ বলে, “সেটাই তো আশ্চর্য, কল লিস্টে সে নম্বর থাকে না, আমি অনেক সার্চ করে দেখেছি।”
অনুপমা গলা তুলে বললেন, “সুতপা, রেজিস্টারে আজ আর কারও নাম আছে?”
সুতপা ওপাশ থেকে উত্তর দেয়, “না ম্যাম।”
অনুপমা বলেন, “কাল? কাল কটা নাম? দেখি রেজিস্টারটা আনো তো।” তারপরই বলেন, “আচ্ছা থাক, আমিই যাচ্ছি। বলে উঠে যান রিসেপশনের দিকে। একটু পরে ফিরে আসেন তিনি। এসে বলেন, আচ্ছা বিশ্বজিত –”
বিশ্বরূপ বলে, “বিশ্ব-রূপ ম্যাডাম।”
অনুপমা বলেন, “হ্যাঁ জানি। আমি রেসপন্সটা দেখছিলাম। আচ্ছা আপনি বললেন, যখন একা থাকেন, তখন ফোন আসে। আজ তো এখানে রিসেপশনে অনেকক্ষণ একা বসেছিলেন, ফোন এসেছিল?”
বিশ্বরূপ বলল, “না ম্যাডাম, আজ, এখানে কোনও ফোন আসেনি।”
অনুপমা বললেন, “প্রায় ঘণ্টাখানেকের ওপর অপেক্ষা করেছেন না আপনি?”
তাঁর কথা শেষ হতে না হতেই বিশ্বরূপের ফোন বাজতে আরম্ভ করল, তার মুখচোখে একটা লক্ষণীয় পরিবর্তন হল, জোরে জোরে নিশ্বাস পড়তে শুরু করল। অনুপমা দেখলেন, বিশ্বরূপের হাত ফোন রিসিভ করার সময়েও কাঁপছে।
তিনি বললেন, “কী হল? ফোন ধরুন –”
বিশ্বরূপ বলল, “এই যে, সেই ফোন ম্যাডাম, এই দেখুন – আপনি বিশ্বাস করছিলেন না।”
অনুপমা বললেন, “আপনি রিসিভ করেছেন?”
বিশ্বরূপ বলল, “হ্যাঁ, করেছি তো – কোনও কথা নেই ওপাশে। শুধু নিশ্বাসের শব্দ।”
অনুপমা বললেন, “কথা তো থাকার কথা নয়। ফোনের ওপাশে সুতপা আছে। নম্বরটা ভালো করে দেখুন, আমাদের এখানকার ল্যান্ডলাইনের নম্বর। সুতপাকে বলে এসেছিলাম ফোন করে চুপ করে থাকতে। আসলে যিনিই আপনাকে ফোন করুন না কেন, আপনি ভাবছেন সেটা সেই বান্ধবীর ফোন। নিজেই কথা না বলে রেখে দিচ্ছেন। এটা অবশ্য একলা থাকলে। কাজেকর্মে এনগেজড থাকলে অন্যদের ফোন যেমন পান, তেমনই পাচ্ছিলেন। পরিষ্কার হল?”
বিশ্বরূপ খানিক চুপ করে থেকে বলল, “না, হল না।”
অনুপমা বললেন, “সুতপা আর একবার প্রেশারটা নাও তো –”
বিশ্বরূপ আবার গিয়ে বেডে শুয়ে পড়ল। সুতপা ঝুঁকে পড়ে প্রেশার মাপছে, তার শরীরের গন্ধ আসছে নাকে। তৃষার মতো নয়, এ গন্ধ আলাদা, কিন্তু এতেও প্রচণ্ড আকর্ষণ বোধ করছিল বিশ্বরূপ। বেডটা নিতান্তই সরু। ডাক্তারদের চেম্বারের বেড যেমন হয়। সুতপার পেট, কোমরের আলতো ছোঁয়া লাগছিল বিশ্বরূপের গায়ে। বেশ ভালো লাগছিল তার, বেশ ভালো। ট্রেনে বা বাসে অন্য যুবতীদের শরীরে গা ঠেকে গেলে এমন লাগে না তো!
প্রেশার মাপা হয়ে গেছে। সুতপা বলল, “ম্যাম, হাই আছে।”
বিশ্বরূপ বলল, “কত হয়েছে এখন?”
সুতপা বলল, “সেটা আপনার জানার ব্যাপার নয়। ম্যামকে লিখে দিচ্ছি।”
অনুপমা আবার বিড়বিড় করে বললেন, “এক্সপেকটেড। যাক একটা ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হওয়া গেল, হ্যালিউসিনেশনটা অডিটরি নয়, শুধুই ভিসুয়াল। তাই তো ভাবছি, এমন তো হবার কথা নয়।”
বিশ্বরূপ বলল, “ম্যাডাম, আপনি কী ভাবছেন জানি না, কিন্তু আমি যা বললাম, তা সত্যি। আমি কী করে আপনাকে কনভিন্স করব বুঝতে পারছি না।”
অনুপমা বললেন, “আচ্ছা আমি দেখছি। আমার কাছে এসেছেন যখন, আমার কথা আপনাকে শুনতেই হবে। একটা কথা বলি আপনাকে, সমস্ত মানসিক বিকারের পেছনেই আছে যা সত্যি নয়, তাকে সত্যি বলে ভাবা। সেই ভাবনাটাকে সাপোর্ট করার জন্য যত পারা যায় প্রমাণ যোগাড় করতে রোগীরা তৎপর হয়ে ওঠে।”
বিশ্বরূপ বলল, “আমি আর কী বলব, আমি পরিষ্কার দেখতে পাই নম্বরটা –”
অনুপমা বললেন, “যেমন আমাদের ল্যান্ড লাইনের নম্বরটা দেখলেন। আচ্ছা আর একটা কথা হঠাৎ মনে এল, আপনার সেই বান্ধবী কীভাবে মারা গেছিলেন? অসুখে?”
বিশ্বরূপ বলল, “না, ট্রেনে কাটা পড়েছিল। বেলানগর লেভেল ক্রসিং পেরোচ্ছিল, এমন সময়ে –”
অনুপমা বললেন, “নিশ্চয় কানে ফোন বা আইপডে গান ছিল?”
বিশ্বরূপ বলল, “ফোনে কথা বলছিল। ফোনটা আমিই করেছিলাম, ও হো হো হো – ম্যাডাম আমি খুন করেছি ওকে। আমি কল না করলে ও বেঁচে থাকত –” বলে সে ডুকরে কেঁদে উঠল।
অনুপমা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। হাতটা মুঠো করে নাকের তলায় ঠোঁটের ওপর চেপে ধরলেন। তারপর সুতপা তখনও দাঁড়িয়ে আছে দেখে বললেন, “যাও, তুমি দাঁড়িয়ে কেন? রিসেপশনে যাও।”
“হ্যাঁ, বেলানগরটা কোথায় যেন? কলকাতার কোথাও?” জিজ্ঞেস করলেন অনুপমা।
“বালিতে ম্যাডাম।” বলল বিশ্বরূপ। “আমরা দুজনেই ও অঞ্চলের বাসিন্দা। ও থাকত লাইনের এপারে, বৈশালিপাড়ায় আর আমি ওপারে অভয়নগরে।”
অনুপমা বললেন, “অত ডিটেল অবশ্য আমার লাগবে না। তা আপনি যে তখন ফোন করেছিলেন, তা নিয়ে অত ভাবছেন কেন? উনি যে রেল লাইন পেরোচ্ছিলেন আপনি নিশ্চয়ই জানতেন না।”
বিশ্বরূপ একটু চেঁচিয়েই বলল, “না, ম্যাডাম না। ও আসলে একটা কল সেন্টারে কাজ করত। সে সপ্তাহে সকালের ডিউটি থাকার কথা, আচমকা সেদিন বিকেলের স্লট দিয়েছিল, আমি কী করে জানব বলুন?”
অনুপমা বললেন, “স্যাড, ভেরি স্যাড। তারপরে পুলিশ আপনাকে নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া করেনি?”
– না ম্যাডাম।
– কেন? লাস্ট ফোনে তো আপনার নম্বর থাকার কথা। সে ক্ষেত্রে তো পুলিশের –
– পুলিশ ফোনটা পায়নি ম্যাডাম। ও যে ফোনে কথা বলছিল, তা কেবল আমিই জানি।
– ও, কেউ তুলে নিয়েছে তাহলে। নিয়ে সিম কার্ডটা ফেলে দিয়েছে। কিন্তু আইএমআইই নম্বর দিয়ে তো সহজেই ফোনকে ট্র্যাক করা যায়। আমাদের পুলিশও যেমন, কোনও রকমে কেসটা ঘাড় থেকে নামাতে পারলে বাঁচে। আচ্ছা দাঁড়ান দাঁড়ান, আপনি তো বলছেন সেই নম্বর থেকে ফোন আসে এ ব্যাপারে আপনি নিঃসন্দেহ। তা সেই সিম ব্যবহার করে কেউ আপনাকে অন্যভাবে বিরক্তও তো করতে পারে।
– না ম্যাডাম, তেমন কিছু নয়। যদি লগে নম্বরটা উঠত, আমিই তো আগে পুলিশের কাছে যেতাম।
অনুপমা বললেন, “আচ্ছা, আজ তাহলে এইটুকুই। কয়েকটা জিনিস ভালো করে শুনে নিন, ও ব্যাপারটা মন থেকে তাড়ানো কঠিন হলেও আস্তে আস্তে ভুলতে চেষ্টা করুন। যদি দিনের বেলা ফোন আসে, আশেপাশে যে-ই থাক, অপরিচিত লোক হলেও তাকে দেখিয়ে কনফার্ম করুন, যে নম্বরের কথা আপনি ভাবছেন, সেটা সেই নম্বর কিনা। আমার তো মনে হয় খুব তাড়াতাড়ি আপনার ভুল ভাঙবে। এছাড়া যে ওষুধগুলো লিখে দিলাম, নিয়মিত খাবেন। বাড়িতে যিনিই আপনার কাছের মানুষ হন, মা, বোন বা ভাই, তাঁকে বলবেন ওষুধের কথা মনে করিয়ে দিতে। রাত্তিরে শোবার আগে একটা ঘুমের ওষুধ দেয়া আছে, সেটা খেয়ে ঘুমোতে যাবেন।”
বিশ্বরূপ বলল, “তাহলে আসি ম্যাডাম? আপনার ফি-টা?”
অনুপমা বললেন, “সুতপা বলেনি আপনাকে? ওয়ান থাউজ্যান্ড। আপনি এখনও ভাবুন এর পর আমার জুনিয়রের কাছে যাবেন কিনা। আপনার পক্ষে একটু –”
বিশ্বরূপ টাকাটা দিয়ে বলল, “এই যে। না ম্যাডাম, আমি এখানেই আসব। একমাস পরে তো?”
অনুপমা বললেন, “যদি না মাঝখানে বিশেষ প্রয়োজন হয়। যদি তেমন কিছু হয়, কয়েকটা টেস্ট করতে দেব, এখন করার দরকার নেই। আর হ্যাঁ, আসল কথাটাই বলা হয়নি। রাত্তিরে শোবার আগে ফোন সুইচ অফ করে শোবেন। আপনার কাগজটায় অবশ্য লিখে দিয়েছি।”

বিশ্বরূপ বেরিয়ে রাস্তায় হাঁটা দিল। যাক, অনেকটা হালকা লাগছে। মাসে হাজার টাকাটা একটু বেশিই, কিন্তু মেয়েটির গায়ের গন্ধটা কেমন অন্য জগতে নিয়ে যাচ্ছিল। ওর আলতো ছোঁয়াতেও যেন অন্যরকম অনুভূতি। কই আর কারও সঙ্গে তো এমন হয় না? তৃষার গায়েও একটা অদ্ভুত গন্ধ ছিল, মন মাতানো। বহুদিন ভুলতে পারিনি। কিন্তু এই গন্ধ নাকে লাগার পর তা আর মনেই পড়ছে না। আমি ফোন করেছিলাম বলছি তো। পরোক্ষ ভাবে তো আমিই দায়ী। কী শাস্তি দেবে দাও না। কিন্তু আমি তো বাঁচার স্বাদ পেয়েছি আবার। এবার ফোন এলে ধরবই না। আচ্ছা এর পরের দিন যখন যাব, সেই নিখিলেশ না কে যেন, সে কি সেদিনও ছুটিতে থাকবে? তা না হলে তো সে-ই মাপবে প্রেশার। ধুর!
বিশ্বরূপের ফোন বেজে উঠল। চমকে উঠল সে। কেমন একটা ঘোরের মধ্যে ছিল যেন, ঠিক যেন স্বপ্ন দেখছিল। স্বপ্নটা চুরমার হয়ে গেল।
দাঁতে দাঁত চাপল বিশ্বরূপ। ধরব না ফোন, কী করবে? আমি দুঃখ পেয়েছি, আমার বুক ফেটে গেছে, আমি কিছুটা দায়ী তা স্বীকারও করছি। অপরাধ বোধেও ভুগেছি অনেক দিন। কিন্তু আমি বাঁচতে চাই। আমি বাঁচার রাস্তাও পেয়ে গেছি। ধরব না আমি ফোন। কেউ ধরাতে পারবে না আমাকে।
কাঁধে একটা টোকা, পেছন ফিরল বিশ্বরূপ। হাসি হাসি মুখে এক বৃদ্ধ, “বাবা, আমি দশ মিনিট মতো আপনার পেছনে পেছনে হাঁটছি। আপনার পকেটে ফোন তো সমানে বেজেই যাচ্ছে। তিনবার না চারবার পুরোটা বেজে গেল। কী এত ভাবেন? ফোনটা তুলুন – কে কী দরকারে ফোন করছে –”
বিশ্বরূপ ভাবল, “এই তো এঁকে পাওয়া গেছে। ফোনটা রিসিভ করার আগে নম্বরটা যাচাই করিয়ে নেব। একটা সাক্ষী তো থাকবে।”
ফোনটা তুলেই বিশ্বরূপ দেখল সে যে নম্বরটা আশা করেছিল, এটা সে নম্বর নয়। ফোন কানে লাগাতেই ভাই বলল, “কী রে দাদা, ফোনও তুলছিস না, বাড়িতে একটা খবরও দিসনি, এত রাত হয়ে গেল, মা তো কান্নাকাটি করছে –”
বিশ্বরূপ মোটা গলায় বলল, “ঠিক আছে, রেখে দে। আজ একটু দেরি হবে।”

বিশ্বরূপ একটু আগেভাগেই পৌঁছল ডক্টর করের চেম্বারে। সুতপা জায়গা মতোই ছিল। বলল, “কেমন আছেন?”
বিশ্বরূপ বলল, “ভালো।”
সুতপা বলল, “আপনি তো অনেক আগে এসে পড়েছেন। ম্যাম তো সাড়ে পাঁচটার আগে আসবেন না।”
বিশ্বরূপ তা ভালোই জানে। তবু বলল, “ওহো, তাহলে কী করি? এখানে বসলে আপনার অসুবিধে হবে?”
সুতপা বলল, “না, না, অসুবিধে কী? বসুন না।”
এর মধ্যে একটা বাচ্চা ছেলে কাগজের কাপে করে সুতপাকে চা দিয়ে গেল। সুতপা বলল, “চা খাবেন?”
বিশ্বরূপ বলল, “না, না, আপনি খান।”
সুতপা বলল, “খান না এক কাপ। অ্যাই ছোটু, দাদাকে এক কাপ দে।” তারপরই বলল, “টাচ উড আপনাকে কিন্তু অনেক ফ্রেশ লাগছে। ম্যাম খুশি হবেন।”
বিশ্বরূপ দুম করে বলে বসল, “আপনি খুশি হননি?”
একটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হল, দুজনেই দুজনের থেকে চোখ সরিয়ে নিল। আড়চোখে সুতপার দিকে চাইতে গিয়ে বিশ্বরূপ দেখল, সেও আড়চোখে চাইছে। হঠাৎ চোখাচোখি হয়ে যেতেই আবার সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে চোখ।
কাজের কথা হোক। বিশ্বরূপ কাউন্টারে উঠে গিয়ে বলল, “আর কোনও পেশেন্ট নেই আজ?”
সুতপা বলল, “আপনার তো সাড়ে পাঁচটায়, তার পরের জনের পৌনে ছটায় অ্যাপো। এত আগে এসে কী করবেন, তিনি ওই সাড়ে পাঁচটা নাগাদ আসবেন। সবাই তাই করেন।”
বিশ্বরূপ বলল, “ও।”
খানিক নীরবতা। সুতপা হঠাৎ বলল, “এখন ফোন আসছে আর?” বলেই ভাবল, ম্যাম জানতে পারলে কেলেঙ্কারি। তাই তাড়াতাড়ি বলল, “মানে ম্যাম তো জানতে চাইবেন, তাই আর কী।”
বিশ্বরূপ মনে মনে অনেক অঙ্ক কষল। এই যে যেসব মেয়েরা রিসেপশনে বসে, রেগুলার নানা রকম পেশেন্ট হ্যান্ডল করতে করতে তারা কেমন যান্ত্রিক, মেকানিকাল হয়ে যায়। বাড়তি কথা তারা একটাও বলে না। আজকে সুতপা নামের মেয়েটি কি একটু অন্যরকম আচরণ করল?

আজ ম্যাডামের সেশন বেশ আশাব্যঞ্জক হল। চেহারার উন্নতি দেখে ডক্টর কর তো খুশি হয়েছেনই। ওষুধ নিয়মিত খাওয়া হচ্ছে কিনা জিজ্ঞেস করলেন। খিদে আর ঘুমের কথাও জোর দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন। তারপর বললেন, “রাতে ফোন সুইচ অফ করে শুচ্ছেন তো?”
এর উত্তরে অবশ্য বিশ্বরূপ বলল, “তাও ফোন আসছে।”
ম্যাডামের কলম থেমে গেল। ভুরু কুঁচকে গেল। কপালে ভাঁজ পড়ল। “তাও আসছে? মানে? ফোন সুইচ অফ, তাও?”
বিশ্বরূপ বলল, “হ্যাঁ ম্যাডাম, তাও। তবে আমি তুলছি না। আর তুলবও না। আর তুলছি না বলেই ফোন আসা কমেছে অনেক। অবশ্য বেশি রাতে আমি এত গভীর ঘুমে থাকছি আজকাল, যে এলে জানতেও পারতাম না।”
অনুপমা বললেন, “গুড। অখিলেশ –”
নিশ্চুপে সুতপা এসে পেছনে দাঁড়িয়েছে। টেবিলে একটা ফাইল রেখে বলল, “এর পরে আছেন মিসেস সুরেকা। ম্যাম, আমি দেখে নেব, প্রেশার?”
অনুপমা ভুরু কোঁচকালেন, “এর পরে যিনি আছেন তাঁর ফাইল তো ইনি বেরিয়ে যাবার পরেই আনতে পারতে। তুমি দেখবে কেন, অখিলেশ নেই?”
সুতপা বলল, “আছে, মানে ওকে একটু জেরক্স করতে পাঠালাম তো, তাই বলছিলাম –”
কোঁচকানো ভুরু নিয়েই অনুপমা বললেন, “দেখো।”
বিশ্বরূপ স্পষ্ট টের পেল, আজ আর পেট বা কোমরের ছোঁয়া মোটেই আলতো নয়। সেও শরীরটা যত পারে এগিয়ে রাখল। প্রেশার দেখতে যত সময় লাগার কথা, তার বেশিই লাগল আজ।
অনুপমার ভুরু তখনও সোজা হয়নি। তিনি বললেন, “কী হল, কত?”
সুতপা বলল, “একশ দশ বাই সত্তর ম্যাম।”
অনুপমা বললেন, “একশো দশ? কী বিশ্বরূপ, আপনার মাথা-টাথা ঘোরে নাকি মাঝে মাঝে? মানে এই চিকিৎসা শুরু হওয়ার পর?”
বিশ্বরূপ বলল, “না তো ম্যাডাম।”
অনুপমা ঠোঁট দুটো চেপে ধরে প্রেস্ক্রিপশনটা টেনে নিয়ে লিখতে লিখতে বললেন, “একটা ওষুধ একটু কমিয়ে দিলাম, দেখে নেবেন, কেমন? কী সুতপা? তুমি দাঁড়িয়ে আছ কেন, রিসেপশনে যাও।”

রাত্তিরে একটা ফোন পেল বিশ্বরূপ।
ফোন সে তোলে না আজকাল। তবে এখনও অত রাত্তির হয়নি। খাওয়াই হয়নি বাড়ির সবার। ফোনটা তুলে বিশ্বরূপ দেখল অচেনা নম্বর। হ্যালো বলতেই ওদিকে একটা মেয়েলি গলা, “হ্যালো, আমি সুতপা বলছি। বলছি কী, ম্যাম একটা ওষুধ দিনে দুবারের বদলে একবার করেছেন দেখেছেন তো? আমি আসলে তখন বুঝিয়ে দিতে ভুলে গেছি। রিসেপশন থেকেই ফোন করতাম, তখন কাজের মধ্যে পারিনি। তাই বাড়ি থেকে বলছি।”
অঙ্ক, অঙ্ক, অঙ্ক – ভাবল বিশ্বরূপ। হ্যাঁ ডাক্তারের প্রেস্ক্রিপশন অনেক সময়েই অ্যাসিস্ট্যান্ট বা নার্সরা বুঝিয়ে দেন। কিন্তু তখন ভুলে গেলেও বাড়ি থেকে ফোন করতে গেলে তো আমার নম্বরটা লাগবে। সেটা যত্ন করে রেজিস্টার থেকে যদি কেউ তুলে নিয়ে থাকে, তবে তো বাড়ি থেকে ফোন করবে বলেই নিয়েছে, ভুলে গিয়ে তো নয়। ফোন তো চেম্বার থেকেই করা যেত।
বিশ্বরূপ বলল, “দেখুন আমার কথা খারাপ লাগলে আপনি ফোন রেখে দিতে পারেন। আমি বলছিলাম, আপনি যে খুব সুন্দর, সে কথা নিশ্চয়ই অনেকে বলেছে এর আগে। আপনার শরীরের গন্ধটাও যে খুব সুন্দর, তা কি কেউ বলেছে আগে?”
ফোন কেউ রেখে দেয়নি। শুধু জোরে জোরে শ্বাস পড়ার আওয়াজ পেয়েছে বিশ্বরূপ অনেকক্ষণ। তারপর সে-ই বলেছে, “শিগগিরই দেখা হবে।” বলে ফোন রেখেছে সে-ই।

বছরখানেক পরের কথা।
ডক্টর অনুপমা করের চেম্বার। কাঁচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলে রিসেপশনে একটি ঘন কৃষ্ণবর্ণা মিষ্টি চেহারার মেয়েকে দেখা যাবে। তার নাম জর্জেট এক্কা। তার কাছেই একটা ছোট টেবিল আর চেয়ারে বসা সাদা এপ্রন স্যুট পরা একজন বছর চল্লিশের স্বাস্থ্যবান পুরুষ, নাম তার অখিলেশ দুবে। কিন্তু সুতপা? সুতপা কোথায় গেল? চাকরি ছেড়ে দিল, না ছাড়িয়ে দিলেন ম্যাডাম?
বাইরের বসার জায়গায় আজ বেশ কিছু পেশেন্টের ভিড়। বরং ভেতরেই গিয়ে দেখা যাক।
ভেতরে অনুপমার টেবিলের উলটোদিকে বসে আছে সুতপা। তার চোখের তলায় কালির পোঁচ, চুল এলোমেলো, জামাকাপড়েরও যত্ন নেই। সে বলছে, “আমাকে বাঁচান ম্যাম, প্রায়ই ফোন আসছে, প্রায়ই। সেই নম্বর। তুললে কোনও কথা নেই, শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ। আমি জানতাম না ম্যাম, বিশ্বাস করুন। ওর তো অডিট ফার্ম, বিকেলে ছটার মধ্যে বেরোনোর কথা। এপ্রিল মাসে যে বেরোতে রাত দশটা বেজে যায় আমি জানতাম না। আমি তো ভালো মনেই ফোন করেছি। ও যে তখন লাইন পেরোচ্ছিল আমি জানতাম না ম্যাম –” ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে সুতপা।
অনুপমা বলেন, “বেডে উঠে শুয়ে পড়ো তুমি। অখিলেশ, প্রেসারটা দেখো তো। না, থাক, জর্জেট এসো, সুতপার প্রেসারটা দেখ তো কত আছে এখন?”

 


 

অপ্রাকৃত ২
রূপঙ্কর সরকার
গল্প সংকলন
সৃষ্টিসুখ প্রকাশন
মূল্য – ১২৫ টাকা
প্রচ্ছদ – রোহণ কুদ্দুস
অনলাইন অর্ডার – সৃষ্টিসুখ, আমাজন
ই-বুক – সৃষ্টিসুখ অ্যানড্রয়েড অ্যাপ
সৃষ্টিসুখ আউটলেট – সৃষ্টিসুখ, ৩০এ সীতারাম ঘোষ স্ট্রিট, কলকাতা – ৯, যোগাযোগ – ৯০৫১২ ০০৪৩৭