রশিদা বেওয়ার কিস্‌সা // শামিম আহমেদ

বদনা হাতে খাটা-পায়খানা থেকে বেরিয়ে ছায়ামূর্তিটাকে স্পষ্ট দেখতে পান রশিদা বেওয়া। দেখামাত্র তাঁর বুকের ভিতরে কী যেন একটা ধড়ফড় করে ওঠে। সাদা পিরহানই হবে, খুব বড়ো জোর মাখন রঙের টেরিকটের পাঞ্জাবি হতে পারে। সারোয়ারের আব্বা এই দুটো রঙ ছাড়া আর কোনও রঙ পরতে ভালোবাসতেননা। কিন্তু সারোয়ারের বাবা কী প্রকারে আসবেন! এক কুড়ি বছর আগে তো তিনি ইন্তেকাল করেছেন। “ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্নাইলাহে রাজেউন।” মৃত্যুর খবর শুনে এই দোওয়া-ই পড়তে হয়। তাতে মউতার কবরের আজাব কমে, দোওয়া পড়নে-ওয়ালার নেকি বাড়ে। প্রায় বিশ বছর পর ফোঁপানো গলায় সারোয়ারের মায়ের মুখ থেকে আবার সেই দোওয়া-ই বেরিয়ে এল। দোওয়া পড়ার পর তিনি আর বাইরে থাকার সাহস পাননা, সোজা ঘরে ঢুকে খিল এঁটে দেন। আর বিছানার উপর বসে বসে ভাবেন, তাঁর কাছের মানুষ তো গত কুড়ি বছরে কেউই গত হয়নি। একমাত্র তাঁর ভাইয়ের পাগল ছেলেটা ছাড়া। আল্লাহ তাকে জান্নাতবাসী করুন। খ্যাপা ভাইপোর ইন্তেকালের খবর পেতে দিন-দশেক লেগেছিল তার। পোস্টকার্ডে বড়ো ভাইজান লিখেছিলেন— “বোন রশিদা বেওয়া, অত্র পত্রে আমার হাজার দুই দুয়া গ্রহণ করিবা। পর সমাচার এই যে, তুমার মধ্যম ভাতিজা রজব আলি মিঞা গত ১২ জিলকদ জুম্মাবারে পুব মাঠের ল-পুকুরে ছুঁচতে যাইয়া পানিতে ডুবে মারা যায়। চাষাবাদ লাগিয়াছে, তাই তুমাকে চিঠি লিখা হয় নাই। উহার চল্লিশাতে তুমি আসিবা।”
ভাতিজার চল্লিশাতে রশিদা বেওয়ার যাওয়া হয়নি। সেই চিঠির কথা এখন মনে পড়ছে কেন তাঁর? তবে কি রজব আলিকেই তিনি দেখতে পেলেন! কিন্তু সে এমন ধোপদুরস্ত পিরহান তো পরতনা। মউতের পর অবশ্য আল্লাহতালা কাকে কী পরান তা কি আর তাঁর জানার কথা? তবে ওই চেহারা সারোয়ারের আব্বা ছাড়া আর কারও হতে পারেনা। এমন সময় মাইকে এশার নামাজের আজান ভেসে আসে। দরজা খুলে এবার তাঁকে বাইরে বেরোতে হবে। কিন্তু বেশ ভয়-ভয় লাগছে তার। আঞ্জির গাছের নীচেই লোকটা দাঁড়িয়েছিল। তাঁর দিকে কি হাত নাড়ছিলেন সারোয়ারের বাপ? সারোয়ারের মায়ের বুকে তোলপাড় শুরু হল। তিন বার ‘কুল’ পড়ে তিনি সিনায় ফুঁ দিলেন। তারপর ঘরের দেওয়ালে হাত ঘষে তাহাক্কুম সারলেন। পানি না পেলে তেমনটাই করা নিয়ম। তাতে ওজুর কাজ হয়ে যায়। এই শেষ বয়সে তিনি আর নামাজ কাজা করতে চাননা।
মৃত্যুর আগে সারোয়ারের বাপ তাঁকে কম জ্বালিয়ে যায়নি। বছর খানেক ধরে সে মিনসে বিছানাতেই পড়েছিল। দাওয়াই থেকে শুরু করে হাগা-মোতা করানো সবই একা হাতে করেছিলেন রশিদা বিবি। মেয়ে বুড়ির শাদি হয়ে গিয়েছিল অনেক আগেই। বাপের পেরেশানির খবর শুনে একবার কাঁদতে কাঁদতে এসেছিল সে। তার আসা তো না, সে আর এক হাঙ্গামা। তার ছেলের দুধ গরম করা থেকে শুরু করে জামাইয়ের নাস্তা-পানি করতে তাঁর দম ছুটে গেছিল। বুঝেছিল কিনা কে জানে? তারপর আর বাপকে দেখতে আসেনি। সারোয়ার কলকাতায় চামড়ার কারখানায় কাজ করে। বউ-বাচ্চা নিয়ে সে ওখানেই থাকে। মাঝেমাঝে অবশ্য টাকাপয়সা পাঠায়। আর ছোট ছেলে মানোয়ার সুরাটে গয়নার দোকানে কাজ করে। বাপের চিন্তা তারা কেউ করেনা। বিমারি হলে তারা কেউই আসবেনা, ইন্তেকালের খবর পেলে এসে মাটি দিয়ে যাবে। সারোয়ারের বাপের সব দায়িত্ব যে রশিদা বিবির একার। ওই গু-মুত সাফ করতে কম খোঁয়ার হয়নি তার। প্রথম দিকে মুখে ভাতই তুলতে পারতেননা। সব খাবারে অরুচি। তারপর ধীরে ধীরে অবশ্য সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে গেছিল। কিন্তু মরণের দিন কয়েক আগেও সারোয়ারের বাপ খেল দেখিয়েছিল বটে!
“ওই দেখ, ওই দেখ, হারামজাদি মাগি আবার এসেছে। আঞ্জির গাছের নীচে রগড় দেখতেছে। আরে আমার মরুনে তুর অতো হাসি ক্যানে রে গু-খাকির বিটি।” সারোয়ারের বাপের এই বিলাপ শুনে সারোয়ারের মা চমকে উঠেছিলেন। আজরাইল কখন কোন বেশে আসে, তারা কী আর সে সব কথা জানে! তার উপর মুখ-খিস্তি করলে কবরের আজাব কি আরও বেড়ে যাবে না? রশিদা বিবি আঞ্জির গাছের নীচে তাকিয়েও কিছুই দেখতে পেতেন না, অথচ সারোয়ারের আব্বার কাছে শুনেছেন, অল্পবয়সি কোনও মেয়ে হাতের ইশারায় তেনাকে ডাকছে আর বলছে, “আয় আয় আমার সাথে আয়, তুকে আমি সাত আশমান ঘুরাব।” বহুদিন পর রশিদা বেওয়া সেই আঞ্জির গাছের নীচে সাদা অথবা মাখন রঙের পিরহানউলা পুরুষমানুষকে দেখে তাই খুব ঘাবড়ে যান। নাঃ! এবার ওই আঞ্জির গাছটাই কেটে ফেলতে হবে। ফলবতী বৃক্ষের সায়েত খুব খারাপ বলেই তাঁর মনে হতে লাগল।
সেবার সারোয়ারের আব্বাকে ঝাড়-ফুঁক করতে এসেছিলেন মধ্যমপাড়া মসজিদের মৌলবি সাহেব। তিনি বলেছিলেন, “সারোয়ারের আব্বাজানকে খবিস জিনে ভর করেছেন। কুরানখানি করতে হবে আপনার বাড়িতে।” ঘরের মধ্য থেকে সারোয়ারের মা উত্তর দিয়েছিলেন, “সারুয়াল আসুক। উহার সাথে কতা বুলে আপনাকে জানাব।” সারোয়ার আসেনি। তাই তার সঙ্গে পরামর্শ করে আর কিছুই জানানো হয়নি মৌলবি সাহেবকে।
সারোয়ার অবশ্য এল ঠিক তার পরের হপ্তায়। আসতে বাধ্য হল। উনি ইন্তেকাল করলেন। সেই খবর পেয়ে ছুটে এসেছিল সারোয়ার, তার বউ-বাচ্চারাও। মেয়ে-জামাই থেকে সব আত্মীয়রা এসে মাটি দিয়ে গেছিল। একটা গরু জবাই করে খানা হয়েছিল। এত লোক যে, সেই গোস্তেও নাকি কুলোয়নি। মানোয়ার শুধু আসতে পারেনি। অতদূর থেকে এলে সে লাশ দেখতে পেতনা। তবে খবর পাওয়ার পর সে খুব কান্নাকাটি করেছিল। চল্লিশার দিন এসে বাপের কবর জিয়ারত করে যায়। এ বার কী সেই মৌলবি সাহেবকেই ডাকতে হবে? কুরানখানি করে যদি কোনও সুরাহা হয়। না, রশিদা বেগম মরতে চাননা। এই তিন কুড়ি বছর বয়সেও তিনি দিব্যি শক্তপোক্ত আছেন। তাঁর মরণের এখন ঢের সময় বাকি। কিন্তু এভাবে একা থাকাটা তাঁর আর উচিত নয়। জিনের সঙ্গে এক বাড়িতে তিনি কী ভাবে কাটাবেন? তাও সঙ্গে যদি কেউ একটা থাকত। কিন্তু তাঁর সঙ্গে কেই বা থাকবে? আজকাল কাজের লোকও পাওয়া দুষ্কর। বাচ্চা-ছেলে বা মেয়ে পাওয়া যায়, কিন্তু তারা সন্ধ্যা হতে-না-হতে এমন ঘুম লাগায় যে, ওদের থাকা আর নাথাকা দুই-ই সমান। কী যে করেন রশিদ বেওয়া, ভেবে কোনও দিশা পাননা।
“আর অ্যাকটা নিকা করেন জি সারুয়ালের মা। সারুয়ালের আব্বাজান নাই, ছেলিমেয়ি থেকিও নাই। নিকা করলি ক্ষেতি কি?”
পাশের বাড়ির মতু সকালে এঁটো বাসন ধুতে ধুতে সারোয়ারের মায়ের গল্প শোনার পর বলেছিল। সারোয়ারের মা এই মশকরায় বেশ আনন্দ পান এবং মতুকে জিজ্ঞাসা করেন, “হা-টি মাগি, তুর উমর আমার চাইতে এক কুড়ি বৎসর ত কম হবেই, তা তু নিকা করলি না ক্যানে?” মতু বেওয়া হাসে। সেই হাসির মধ্যে কিছু লুকানো ছিল কিনা তা আর বোঝা গেল না, কারণ সে দিন আকাশ ছিল মেঘলা। এমন মেঘলা দিনেও মতু বেওয়া হেসে ওঠে। বলে, “পাঁচ বাড়িতে বাঁদি-গিরি কর‍্যা খাই, নিকা করার সুময় কুতা? আমরা তো আপনার লগে আইমাদারের ঘরের বিবি লই, জি আমাদের নিকা করার লোক দাঁড়ি আছে। আর আমি তো আপনার মুতুন রেতি মরদ-মানুষের ভূত দেখি না।”
সারোয়ারের মা মতুর কথার খোঁচাটা ধরে ফেলেন, আবার মতুর বাক্যের ভিতর যে রহস্যময় কোনও মরদ-মানুষ লুকিয়ে আছে সেটাও বুঝতে পারেন। মতুকে তিনি নাছোড়বান্দার মতো প্রশ্ন করেন, “হা-লো বেওয়া, আমাকে নিকা করার লেগি তুর কুন ভাতার দাঁড়ি আছে?”“ক্যানে, লুহা মাস্টার।” মতুর উত্তর যেন তৈরিই ছিল।

 

সেবার গাজির মেলা উপলক্ষে গ্রামের লোকেরা যাত্রা করেছিল। যাত্রার নাম দেবী সুলতানা। হয়েছিল ছোট মিঞার খামারে। কোঠার উপরে বসে অনেকের সঙ্গে সে যাত্রা দেখেছিলেন রশিদা বেওয়াও। যাত্রার মেয়েগুলোকে ভাড়া করে আনা হয়েছিল দাসকলগ্রাম থেকে। সেই সঙ্গে বাজনদার, মেকআপ ম্যান আর লাইট। এ তল্লাটে কারেন্টের আলো নামেই আছে। সব শুষে নেয় মাঠের পানি তোলার কল। ছ-মাসে ন-মাসে সেই আলো কখনও দেখা যায়। তাও সাব মার্সিবল পাম্পের দৌলতে টিমটিম করে জ্বলে।
দেবী সুলতানা নবাবজাদি। মুর্শিদকুলি খাঁর বেটি। এক হিন্দু পুরুতের সঙ্গে সে পেয়ার করে। এই নবাবও নাকি হিন্দু থেকে মুসলমান হয়েছে। তার বেটি হিন্দুর সঙ্গেই তো পালাবে। পুরুত ভৈরব-ঠাকুর সেখান থেকে পালিয়েছে। চারদিকে নবাবের সৈন্য খুঁজে বেড়াচ্ছে তাকে। এমন সময় হাতে বল্লম নিয়ে স্টেজে ঢুকল এক সৈন্য, সে পয়গাম নিয়ে এসেছে। মাথায় তার পাগড়ি, গায়ে ঝলমলে জরির পোশাক। সৈন্য গলা কাঁপিয়ে বলছে, “শাহেনশা, সেই হারামজাদা ঠাকুরকে খুঁজে পেয়েছে এই অধম।” নবাবের মুখে তখন ক্রুর হাসি। তিনি অট্টহাস্য করতে করতে বললেন, “কোথায় সেই পাজির পা-ঝাড়া? সামনে নিয়ে আয় তাকে। আজ নিজের হাতে আঁশবটিতে করে তাকে আমি টুকরা টুকরা করব।”
সৈন্য জবাব দিল, “মহারাজ গোস্তাকি মাফ করেন। আগে আমার বাত তো শুনেন।”
“কী বলবি, জলদি বল। আমার হাতে টাইম নাই। যতক্ষণ না সেই খামোশ বেয়াদপকে আমি কোতল করছি ততক্ষণ আমার জানে শান্তি নাই।”
“হুজুর, পাহাড়ের গায়ে সেই শয়তানকে দেখে আমি তার পিছনে ধাওয়া করি। সে আমাকে দেখেই ছুট লাগায়। আমিও তার পিছু ছাড়িনা। তারপর সে শয়তানকে আমি হাতের নাগালে পেয়ে তার টুঁটি টিপে ধরি। কোমরবন্ধ থেকে তলোয়ার বের করে তার মুণ্ডু খসাতে গেছি, মগার সে আমাকে লাথি মেরে ফেলে দিয়ে চলে গেল।”
মুর্শিদকুলি খাঁ এবার সজোরে লাথি মেরে সৈন্যটিকে ফেলে দেন। দ্বিতীয়বার পদাঘাত সহ্য করতে না পেরে সে স্টেজ থেকে নীচে পড়ে যায় এবং সে দৃশ্য দেখে দর্শকরা হাসিতে ফেটে পড়ে। সৈন্যটি তখন নবাবের উপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ, তার উপর তার মাথার পরচুলা খসে গেছে। এবার সৈন্যটাকে বেশ চেনা-চেনা লাগল সবার।আরে এ যে লোহা মাস্টার। সেই প্রথম লোহা মাস্টারকে দেখেন রশিদা বেওয়া। চড়া ডায়নামোর আলোতে।
কেরোসিনের বাতির আলো-অন্ধকারে বসে রশিদা বেওয়া লোহা মাস্টারের কথা ভাবছেন। তিনি শুনেছেন, খুব বেশি দূর লেখা পড়া শেখেনি লোহা। এমনকী গ্রামের স্কুলের গণ্ডি পার হয়েছে কিনা সন্দেহ। বাচ্চা ছেলেমেয়েদের বাড়িতে বসে অক্ষর চেনায় সে আর তাতেই সে মাস্টার বনে গেল। অ-আ আর নামতা পড়ানো ছাড়া আর কিছুই পারেনা লোহা। তাঁর ছেলে মানোয়ারও দিন-কয়েক পড়েছিল লোহার কাছে। সে বহু দিন আগের কথা। আজ রশিদা বিবি ভাবছেন, তখন যদি লোহার সঙ্গে তিনি দু-চারটে কথা বলতেন, কী এমন খারাপ ব্যাপার হত?কিন্তু আইমাদার ঘরের বিবি, পর্দানশিন হয়েই থাকতে হবে। লোহা যে পরপুরুষ। আইমার জমি চলে গেলে কী হবে, ঠাট রয়েছে ষোলো আনার উপর আঠারো আনা। রশিদা বেওয়া ভাবলেন, মতু বেওয়াকে দিয়ে লোহাকে একটা খবর পাঠালে কেমন হয়? তার পরেই ইচ্ছাটাকে সংযত করলেন। এ কী ভাবছেন তিনি? ছিঃ! এই বুড়ো বয়সে ভীমরতি ধরল নাকি তাঁর? আর কী খবরই বা পাঠাবেন তাকে? গ্রামের লোক জানতে পারলে তার আর শরমের শেষ থাকবেনা। ছেলেমেয়েরা জোয়ান হয়েছে, তারাই বা মুখ দেখাবে কেমন করে? না, না। অমন ভাবনা থেকে সরে আসাই উচিত। হ্যারিকেনের আলোটা একটু উশকে দিলেন তিনি। হঠাৎ কী মনে হল, আরশিতে নিজের মুখটা দেখতে লাগলেন। নাঃ! এমন কিছু বয়স হয়নি তার। রাতের বেলা নাকি আরশিতে মুখ দেখতে নেই, তাতে ফেরেশতারা ক্রুদ্ধ হন। তিনি আয়নাটা নামিয়ে রেখে বারান্দা থেকে আবার দেখতে পেলেন আঞ্জির গাছের নীচে একটা ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে। ভয়ে তাঁর হাত-পা অবশ হয়ে যাচ্ছে। ঘরে চলে যাবেন, এমন শক্তিও তার নেই। এবার খিলখিল করে কে যেন হেসে উঠল। মেয়েলি গলা। তাহলে সারোয়ারের আব্বাজান মরণকালে যাকে দেখতে পেতেন, সেই আওরত আবার এল নাকি? আজরাইল নিশ্চয়ই আওরতের বেশ ধরে তার জান কবজ করতে এসেছে।
“আরশিতে রেতির ব্যালায় মুক দেখি কী হবে বৌবিবি? আমি লুহাকে খপর দিয়্যাছি। সে মিনসে তো হেসি খুন হয়। কাল দ্যাকা করবি।” মতুর গলার স্বর শুনতে পান রশিদা। যাক বাবা, বাঁচা গেল। এত ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন যে, নিজের ঘর অবধি যাওয়ার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। কিন্তু মুখে ‘কিছুই হয়নি’ গোছের ভান করে রশিদা বেওয়া বলে উঠলেন, “রেতির বেলা নাগ করি ব্যাড়াবি আর লোককে ডর দেখালি সে ভিরমি খাবে নাকি!”মতু এসে তাঁর পাশে বসে। দুই স্বামী-হারা গ্রাম্য রমণী নানাবিধ কথায় ডুবে যান। তার ফাঁকেই রশিদা বিবি মতুকে জিজ্ঞাসা করেন, “লুহা মাস্টার শাদি করেনি ক্যানে রে?”মতু বলে, “আপনার লগে। আপনাকে নিকা করব্যা বুলেই না…” এরপর তার খিল খিল হাসিতে আর কিছুই শোনা যায়না।

 

“কী দিনকাল পড়ল, এত দিন জানতাম ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা পিরিত করে বেড়ায়, একন দেখি কবরের দিকে পা-বাড়ানো মাগিরাও পেরেম-পেরেম খেলা করতেছে। এত রস ওই বুড়ি মাগির!”
“শালা লুহা মাস্টার আর মাগি পেল না জি, উ হারামি ব্যাটাছেলের কলঙ্ক গো।”
“আগে ওই শালিকে গাঁ থেকি খেদাতে হবে। নইলে গুটা গেরাম পচে যাবে জি।”
পুকুরের ঘাটে, পাড়ার রোয়াকে, চায়ের দোকানে, এমনকী পার্টি অফিসেও এমন কথা ভেসে বেড়াতে লাগল। লোহা মাস্টার ও রশিদা বেওয়ার প্রেমকাহিনি এখন স্কুলের ছেলেমেয়েরাও আলোচনা করে। বাদ ছিল কেবল মসজিদ। মসজিদে অন্যের গিল্লা গাওয়া উচিত নয়, মসজিদ হল খোদার ইবাদতখানা। সেখানে এসে ওজু নামাজ পড়ে আর ধর্মের কথা শুনে চলে যাওয়াই নিয়ম। কিন্তু নিয়ম তো আর সকলের জন্য নয়। তাই এক জুম্মাবারে কথাটা উঠল। তুললেন যিনি, তিনি গ্রামের মাতব্বর ফাহিম মিঞা, যাঁর কথায় বাঘে-গরুতে এক ঘাটে পানি খায়। ফাহিম মিঞার মুখের উপর কথা বলে এমন মানুষ এই গ্রামে নেই। ফাহিম মিঞা বসেই বললেন, “রেতির বেলা সারুয়ালদের বাড়ির পাশে তালগাছের মাথায় টর্চের ফুকাস ফেলে লুহা মাস্টার, আর রশিদা বেওয়া তকুন রেডি হয়। এই খারাবি আর গেরামে চলতে দেওয়া যায়না। আমাদের ইবাদত-বন্দেগি বুলে তো একটা বেপার আছে। এই গুনাহ চললে তা কবুল হয় কেমন কর‍্যা? মৌলবি সায়েব আপনি ফতোয়া জারি কর‍্যান, অদের চুনকালি মাখি গাঁ থেকি খেদাব।”
মৌলবি সাহেব চোখের ইশারায় কিছু একটা বলতে চাইলেন ফাহিম মিঞাকে, তারপর সটান উঠে গেলেন বেদিতে যেখানে দাঁড়িয়ে জুম্মার খুৎবা পড়া হয়। মৌলবি সাহেবের খুৎবা পড়াকালীন অল্পবয়সিরা ফিক-ফিক করে হাসতে লাগল আর ফিসফিস করে সেই প্রেমকাহিনির চর্চা করতে শুরু করে দিল। বড়রা ভেবে পেলনা, মৌলবি সাহেবের বকলমে কী ফতোয়া জারি হবে? একশ কোঁড়া, না চাবুক? নাকি পাথর ছুঁড়ে ঘায়েল করা হবে দু জনকেই?
লোহা মাস্টার কিন্তু বুঝে গেল ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটতে চলেছে। জুম্মার পর দিন মাঠে প্রাতঃকৃত্য সারতে গেছে সে, তখনও দিনের আলো ভালো করে ফোটেনি। এমন সময় তার পাঞ্জাবির পকেটে বেজে উঠল মোবাইল ফোন। ‘হ্যালো’ বলতেই ওপারের কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “শালা তুর ধুন কেটি লুবো। হাবে বাঞ্চত, এত রস যদি তুর, চুহার গত্তোয় ঢুকা না বে। গিরাম ছেড়ি চলি না গেলি শালা জান চলি যাবে তুর।”
লোহা মাস্টার বেশ ভয় পায়। তার প্রাতঃকৃত্য তখনও সম্পূর্ণ হয়নি। সে প্রাতঃকৃত্যের স্থানটা পরিবর্তন করে গলায় তেজ ফুটিয়ে বলার চেষ্টা করে, “শালা, আমাকে থিরেট করচিস?” কিন্তু তার মিনমিনে গলা অন্য প্রান্তে শেষ পর্যন্ত পৌঁছোয় না। সে বোঝে, এ নিশ্চয়ই ওই শালা ফাহিমের কাজ। ইতিমধ্যে ফোন কেটে যায়। লোহা মাস্টারের সামনে দিয়ে অন্য কেউ হেঁটে যাওয়াতে সে উঠে দাঁড়ায়। লোকটি একটু আড়ালে প্রাতঃকৃত্য সারতে বসলে লোহা পায়খানা সম্পূর্ণ না করেই পাশের ডোবাতে শৌচকার্য সেরে তড়িঘড়ি বাড়ির দিকে হাঁটা দেয়।

 

অবশেষে লোহা মাস্টারকে গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে হয়। মৌলবি সাহেবের ফতোয়া জারির আগেই সে পাশের গ্রামে তার মামাতো ভাইদের বাড়িতে গিয়ে ওঠে। ফাহিম যখন বলেছে, তখন আর এই গ্রামে বাস করা চলে না। তাছাড়া চাবুক অথবা কোঁড়া কোনওটাই তার সহ্য করার মতো বুকের পাটা নেই। কোনও দিন ছিলও না। মামার বাড়িতেই গোটা কয়েক ছেলেমেয়ে জোগাড় করে পড়াবে সে, তাতে করে যদি পেটটা অন্তত ভরে।
এদিকে রশিদা বেওয়াও আর আঞ্জির গাছের নীচে কোনও জিন-পরি বা মরদ-মানুষের ভূত দেখেন না। এতে করে তাঁর শান্তি পাওয়ারই কথা। কিন্তু লোহা মাস্টার গ্রাম ছাড়ার পর তাঁর মন থেকে সব স্বস্তি উধাও হয়ে গেছে। লোহা মাস্টার যাওয়ার দিন মতু শাড়ির আড়ালে লুকিয়ে একটা ছোট্ট কাগজের বাক্স এনে দিয়েছিল তাঁকে। ওটা নাকি লোহা মাস্টার দিয়েছে। রশিদা বিবির সেটা আর খুলে দেখতে ইচ্ছা করেনি। কী হবে? তাঁর জন্যই লোকটাকে বাপের ভিটে ছেড়ে অন্য গ্রামে গিয়ে বাস করতে হচ্ছে, এই কথা ভাবলে তিনি আরও অস্থির হয়ে পড়েন। এখন রাতের জন্য অপেক্ষা, আঞ্জির গাছের নীচে সেই পুরুষ অথবা মহিলা-রূপী আজরাইলের অপেক্ষা করেন রশিদা বেওয়া। আজরাইল তাঁর জান কবজ করে নিয়ে যাক, তাঁর আর বাঁচতে ইচ্ছে করেনা একটুও।
সন্ধ্যা নামার পর তার বারান্দায় বসে থাকতে ইচ্ছা করল না। ঘরের মধ্যে ঢুকে তিনি খিল এঁটে দিলেন।তারপর বাক্স থেকে বের করে আনলেন বহু পুরোনো একটা শাড়ি। সবুজ রঙের। বেশ ভারী। কিন্তু ভাঁজে ভাঁজে যেন ছিঁড়ে গেছে শাড়িখানা। অথচ প্রতি বছরেই ভাদ্র মাসের রোদ খাওয়ানো হয়েছে। সাদা থান ছেড়ে তিনি তাঁর বিয়ের শাড়িটাই পরলেন। হ্যারিকেনের শিখাটা উশকে দিয়ে আরশিতে তাকিয়ে দেখলেন নিজের প্রতিবিম্ব। তারপর এক অজানা পুলকে তাঁর হাত চলে যায় লোহা মাস্টারের পাঠানো কাগজের বাক্সটার দিকে। সেটা খোলা মাত্র বেরিয়ে আসে একটা মোবাইল ফোন। রশিদা বেওয়া রুবাবায় ভেসে গেলেন। আর সেই যন্ত্রটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে তিনি এক অনাবিল সুখের আস্বাদ পেলেন। সারোয়ারের বাপের সঙ্গে বিয়ের পরও এই অনুভূতি হয়নি তাঁর। এমনকী যেদিন সারোয়ার প্রথম তাঁর বুকের দুধ খায়, সেদিনও না। কী আছে ওই যন্ত্রটার মধ্যে? কোন ফেরেশতা লুকিয়ে আছে সেখানে, যে তাঁর মনের কথা পৌঁছে দিয়ে আসবে লোহা মাস্টারের কাছে! সবুজ রঙের শাড়িটা খুলতে পারলেন না তিনি। সেটা পরেই বুকে মোবাইল ফোন আঁকড়ে শুয়ে পড়লেন রশিদা বেওয়া।

 


 

বিলকিস বেগমের পতনজনিত আখ্যান ও অন্যান্য গল্প
শামিম আহমেদ
গল্প সংকলন
সৃষ্টিসুখ প্রকাশন
মূল্য – ১১১ টাকা
প্রচ্ছদ – পার্থপ্রতিম দাস
অনলাইন অর্ডার – সৃষ্টিসুখ, আমাজন
ই-বুক – গুগল প্লে স্টোর, সৃষ্টিসুখ অ্যানড্রয়েড অ্যাপ
সৃষ্টিসুখ আউটলেট – সৃষ্টিসুখ, ৩০এ সীতারাম ঘোষ স্ট্রিট, কলকাতা – ৯, যোগাযোগ – ৯০৫১২ ০০৪৩৭