About Sristisukh Library

Sristisukh Library is a promotional site for the books published by Sristisukh Prokashan, Sristisukh Print, Ha Ja Ba Ra La and Flying Turtle. Readers can read the selected portion of the books in this site for free.

নামাসাগালিতে

প্রবীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

 

প্রায় মিনিট পনেরো ধরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে, স্বভাবতই হিরণ সান্যাল একটু অস্থির। কিন্তু চারু দত্তর বয়স বিবেচনা করেই বোধ হয় খবরের কাগজটা আর চেয়ে উঠতে পারছিলেন না। এবার একটু ঘুরিয়ে বললেন, “আজকের অমৃতবাজার কী বলছে চারুবাবু? কোনও স্পেশ্যাল খবর আছে নাকি?”
চারু দত্ত মুখ না তুলেই বললেন, “নাহ! সেই একই খবর সব — মোহনবাগান গোল করতে পারেনি, বাগবাজারে ষাঁড়াষাঁড়ি বান এসেছে, রবীন্দ্রনাথ জার্মানি যাচ্ছেন…”
সুধীন বললেন, “হ্যাঁ সত্যেনদা বলছিলেন বটে, এবারে নাকি ওনার বার্লিনে আইনস্টাইনের সঙ্গে দেখা করার কথা।”
সুশোভন ঘাড় নাড়লেন, “ঠিক ঠিক… আগের দিন ওই কথাই তো হচ্ছিল। কিন্তু সত্যেনদা গেলেন কই?”
“এই সপ্তাহে ঢাকা থেকে আর আসতে পারেননি। গুরুদেবের হাত দিয়ে আইনস্টাইনকে কী কাগজপত্র পাঠাবেন, সেই নিয়ে ব্যস্ত বোধ হয়।” জানালেন সুধীন।
হিরণ একটু উসখুস করছিলেন, এবার আর থাকতে না পেরে বলেই ফেললেন, “কোনও ইন্টারেস্টিং খবরই নেই বলছেন? চারুবাবু অত মন দিয়ে পড়ছিলেন দেখে ভাবলাম, আজকে সত্যেনদাকে ছাড়াই নরক গুলজার হতে বাধা নেই।”
চারু দত্ত মুখ তুলে বললেন, “না না, আমি তো ছবি দেখছিলাম। এক সাহেব ব্যাটা জবরদস্ত এক চিতা মেরেছে, সেই ছবি দিয়েছে আজ বড় করে।”
সুশোভন হৈ হৈ করে উঠলেন, “আরে তাই নাকি! করবেটের ছবি ছাপিয়েছে বুঝি আজকে? চিতা নয়, উনি চিতাবাঘ মেরেছেন, সেটা অবশ্য গত সপ্তাহের ঘটনা… মনে নেই, আগের সপ্তাহে নীরেন বলছিল আমাদের।”
নীরেন রায় সম্মতি জানালেন, “হ্যাঁ রুদ্রপ্রয়াগের চিতাবাঘ, করবেট সাহেবের একেবারে জয়জয়কার পড়ে গেছে।”
“গান্ধী কি এই অনর্থক প্রাণীহত্যার প্রতিবাদে অনশনে বসছেন?” সুধীন সুযোগ বুঝে ফুট কাটলেন।
গান্ধীবাদী নীরেন দৃশ্যতই একটু বিরক্ত, “ঠিক জানতাম, গান্ধীকে ঠেস না দিলে আড্ডা জমবে কেন? আর অনর্থক প্রাণীহত্যা হয়েছে বলল কে? ও রীতিমতন মানুষখেকো চিতাবাঘ, সরকার নিজে করবেটকে ডেকে নিয়ে গেছেন।”
সুশোভন হাসছিলেন, এবার সুধীনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কথাটা ঠিকই, আর করবেট সাহেব নিজেও কিন্তু মানুষখেকো বাঘ না হলে প্রাণীহত্যা করেন না, বরঞ্চ শখের শিকারীরা যাতে অনর্থক বাঘ না মারে তার জন্য বহুদিন ধরে আপিল করছেন।”
শ্যামল ঘোষ আধশোয়া হয়ে শুনছিলেন বাকিদের কথাবার্তা। এবার উঠে বসে বললেন, “রাজাগজার কথা বাদই দিলাম, এখন তো ধ্যাদ্ধাড়ে গোবিন্দপুরের জমিদাররাও বন্দুক ছাড়া এক পা চলেন না। শিকার না করতে পারলে যেন প্রেস্টিজ গঙ্গা দিয়ে বয়ে চলে যাবে। এই পাতলা জঙ্গলে গাদা গাদা লোক নিয়ে গিয়ে কত্ত কেরামতি! নামাসাগালির খাগড়া আর হোগলায় ভরা জঙ্গলের মধ্যের বাড়ির পাশে রোজ সিংহ হাঁক ছেড়ে গেলে এদের কী অবস্থা হত দেখতাম।”
“দাঁড়ান দাঁড়ান, নামসা গলি না কী বললেন — কোথায় জায়গাটা?” সুধীনের পাশে এক নতুন ভদ্রলোক বসেছিলেন, তিনি তড়িঘড়ি জিজ্ঞাসা করলেন।
শ্যামল ভদ্রলোককে এর আগে দেখেননি, সুধীনও সেটা আন্দাজ করেছিলেন, “আলাপ করিয়ে দিই, এনার নাম শ্রী বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। ভাগলপুরে থাকেন, আজকেই প্রথম এলেন পরিচয়ের আড্ডায়।”
শ্যামল হাসলেন, “নমস্কার এবং সুস্বাগতম! নামসা গলি নয় নামাসাগালি। উগান্ডার রাজধানী এনটিবি-র কাছে একটা ছোট্ট জায়গা।”
ভদ্রলোক আরও উত্তেজিত হয়ে পড়লেন, “তাই নাকি? আপনি গেছেন সে জায়গায়?”
সুধীন বললেন, “শ্যামলের পুরো ছোটবেলাটাই তো কেটেছে পূর্ব আফ্রিকায়। কেনিয়া আর উগান্ডা নিয়ে অনেক গল্প শুনতে পারবেন ওর কাছে।”
“বা বা! তা বলুন না শ্যামলবাবু, হোগলা জঙ্গলের সিংহের গল্প একটু শোনা যাক।”
“গল্প নয় বিভূতিবাবু, সব নিজের চোখে দেখা। কিন্তু আজকে বরং সিংহ থাকুক, অন্য একটা দিনের কথা বলি। এ ঘটনাও কিন্তু নামাসাগালির ওই বাড়িতেই। বাগান ঘেরা সেই বাংলোতে সেদিন পিসেমশাই ছিলেন না, কাজের জন্য নাইরোবি গেছেন দুদিন আগে, ফিরতে আরও দিন তিনেক বাকি। আমি আর আমার ছোট বোন মাসখানেকের জন্য বেড়াতে এসেছি, বাড়িতে আমাদের সঙ্গে রয়েছেন শুধু পিসিমা। কিন্তু পিসিমার তার আগের দিন থেকেই প্রবল জ্বর, প্রায় অচৈতন্য অবস্থা। আমি আর বোন পালা করে জলপট্টি দিয়ে যাচ্ছি। তার মধ্যে সকাল থেকে এত প্রবল বৃষ্টি যে স্থানীয় কাজের মেয়েটিও ডুব দিয়েছে। রান্নার কোনও বালাই নেই, ছোট বোনটাকে দুধ আর পাঁউরুটি খেতে দিয়ে পিসিমার পাশে এসে বসে আছি। এমন সময়ে দেখলাম তাঁর ঠোঁট নড়ল, অস্ফুটে কী যেন বলে উঠলেন।
“আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘পিসিমা, কিছু লাগবে?’
“শুনতে পেলেন বলে মনে হল না, আবার ঠোঁট নড়ল। কানের কাছে মুখ নিয়ে গেলাম যদি কিছু শোনা যায়। মনে হল জিজ্ঞাসা করছেন, ‘আজ আসবে?’ পিসিমা বোধ হয় জ্বরের ঘোরে ভুলে গেছেন যে পিসেমশাই-এর আসতে এখনও কয়েক দিন বাকি, কিন্তু এই সময়ে সে কথা বলা উচিত হবে কিনা বুঝতে পারলাম না।
“পিসিমা আবার কিছু বললেন, কিন্তু এবারে মনে হল যেন বলছেন, ‘আজ আসবে।’ প্রশ্ন নয়, যেন খানিকটা স্বগতোক্তির ধরনে বলা। কিন্তু কার কথা বলছেন পিসিমা? কারোর আসার কথা থাকলে দুজনের কেউ নিশ্চয় বলতেন আমাদের। যাই হোক, এলে দেখা যাবে এখন আর কী-ই বা করা?
“পিসিমার জলপট্টি ভেজাতে যাওয়ার জন্য উঠেছিলাম, দেখি ঠাকুরঘরে আমার বোন হাঁ করে কীসের দিকে তাকিয়ে আছে। আমি ঢুকতে আঙ্গুল তুলে দেখাল — একটা পাটাতনের ওপর দাঁড় করিয়ে রাখা একটা বালা, কাঠের তৈরি বলেই মনে হচ্ছে। দেখলাম পাশেই শিব, কালী প্রভৃতি দেবদেবীর ছোটো মূর্তি এবং ছবি থাকা সত্ত্বেও স্তূপাকৃতি ফুল রাখা ওই পাটাতনের সামনে। আরও যে জিনিস চোখে পড়ল সেটা হল, ওই বালার রঙ একেবারে কুচকুচে কালো।
“‘দ্যাখ, ফুলগুলো কী সুন্দর।’ সাদা আর হলুদ রঙের ফুলগুলো মেঘলা দিনের অন্ধকার ঘরেও বেশ উজ্জ্বল লাগছে, আর তার মধ্যে টের পেলাম একটা চিনচিনে মিষ্টি গন্ধও আছে ফুলগুলোতে।
“এরকম ফুল আমি আগে দেখিনি। পিসিমা পেলেন কোথায় কে জানে! পিসিমার কথায় খেয়াল পড়ল জলপট্টি ভিজিয়ে নিয়ে যেতে হবে। ফিরে গিয়ে কাপড়ের টুকরোটা কপালে বিছিয়ে রাখছি এমন সময় পিসিমার হাতের দিকে নজর পড়ল — বাঁ হাতের মণিবন্ধে একটা বালা। আর তেল-হলুদের ছোপছোপের মধ্যেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে সে বালার রঙ সাদা নয়, ঠাকুরঘরে রাখা বালার মতনই কালো।
“পেছন থেকে বোন কিছু বলল, কানে ঢুকল না। আমার চোখ পিসিমার বালাটার দিকেই, ঠাকুরঘরে যা চোখে পড়েনি তা এবারে চোখে পড়ল। বালাটা নিটোল বৃত্তাকার নয়, মাঝখানে একটা মুখ উঠে রয়েছে আর অন্য প্রান্তটা এসে যেন ঢুকেছে সেই মুখের মধ্যে।
“‘দাদাআআ…’ এইবার আমার সম্বিত ফিরল।

“‘কী? কী হয়েছে?’
“‘একটা গন্ধ পাচ্ছিস?’
“‘হ্যাঁ, একটা মিষ্টি মিষ্টি গন্ধ তো? ওটা ওই সাদা হলুদ ফুলগুলোর।’
“‘না না, এটা আলাদা গন্ধ। পাচ্ছিস না?’
“এইবার আমিও পেতে শুরু করেছি। খানিকটা গরম পাঁউরুটির মতন গন্ধ, কিন্তু অল্প ঝাঁঝালো। গন্ধটা ধীরে ধীরে সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। গন্ধটার জন্যই কিনা কে জানে, নেশাগ্রস্তের মতন দাঁড়িয়ে ছিলাম দুজনে। বিছানার ওপর থেকে আওয়াজ আসতে দেখি পিসিমার চোখ খোলা, আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন ‘শুনছিস, এসে গেছে।’
“পিসিমাকে চোখ খুলতে দেখে দৌড়ে গেলাম। কিন্তু ওই এক মুহূর্তই, আবার সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছেন।
“‘কি শুনতে বললেন বল তো? কিছুই তো বুঝতে পারছি না।’ বোনকে জিজ্ঞাসা করতে গিয়ে দেখি ও মন দিয়ে কী যেন শুনছে।
“‘কী শুনছিস?’
“‘শ শ শ, ওই শোন। দাঁড়া দাঁড়া, ওই যে আবার।’
“হ্যাঁ, শুনতে পেলাম। প্রত্যেক চার বা পাঁচ নম্বর বৃষ্টির ফোঁটার শব্দটা যেন হালকা হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু থেকে যাচ্ছে একটু বেশি সময় ধরে — টিপটিপ শব্দের মধ্যেই একটা নির্দিষ্ট সময় অন্তর যেন একটা হালকা শিস। অতিপ্রাকৃত একটা শব্দ, ভাই বোন দুজনেই ভয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
“শিসের শব্দটা জোরদার হতে লাগল, কারণ এবার শিসটা শুধু একটা দিক থেকেই যেন আসছে না, অন্য কয়েক দিক থেকেও আসছে। আর সেই একাধিক শিসের শব্দ অনুরণিত হয়ে বৃষ্টির আওয়াজটাকেই যেন আস্তে আস্তে ঢেকে দিচ্ছে।
“আমি বাড়ির বাইরে বেরোতে যাচ্ছিলাম, বোন হাত চেপে ধরল, ‘যাস না দাদা, বড় ভয় করছে।’
“আমি ওর মাথায় একটু হাত বুলিয়ে খাটের পাশ থেকে ছাতা নিয়ে বাইরে বেরোলাম। বৃষ্টির জন্যই চারদিকটা কী রকম ধোঁয়া ধোঁয়া হয়ে রয়েছে। শিসের শব্দটা মনে হল শোয়ার ঘরের পেছন দিক থেকে আসছে। ঘুরে পেছন দিকটায় গিয়ে দাঁড়িয়েছি, কিছুই চোখে পড়ছে না, সামনে শুধু নাম-না-জানা গাছ আর লতাপাতার সারি।
“ধোঁয়া ধোঁয়া বৃষ্টির মধ্যে চোখটা সইয়ে আনার চেষ্টা করছি, মনে হল আমার সামনে ডানদিকে কিছু একটা নড়ল। তাকাতেই দেখতে পেলাম সেই সাদা হলুদ ফুল, মনে হল মিষ্টি চিনচিনে গন্ধটাও পাচ্ছি। আর ঠিক তক্ষুণি মনে হল লতানো গাছের নিচের ধোঁয়াটে ব্যাপারটা একটা কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠতে শুরু করল।”
থামলেন শ্যামল। সবাই শ্যামলের দিকে তাকিয়ে, বিভূতি যারপরনাই উত্তেজিত।
“থামলেন কেন? দেখলেন-টা কী?”
শ্যামল একটু চুপ করে থেকে বললেন, “ক্লাইম্যাক্স গড়ে তোলার জন্য থামিনি। হঠাৎ মনে হল এই যে, এতদিন বেঁচে রইলাম এ নেহাতই একটা ফ্লুক।”
“ধোঁয়ার কুণ্ডলীটায় জলপাই রঙের আভা যখন লাগতে শুরু করল তখনও বুঝিনি কী হচ্ছে। সাদা কুণ্ডলীটা হাঁ করতেই বিদ্যুতচমকের মতন মনে পড়ে গেল। মনে পড়ে গেল নামটা গায়ের রঙের জন্য নয়, মুখের ভেতরের কুচকুচে কালো রঙের জন্যই।”
বিভূতিভূষণ উত্তেজনায় শ্যামলের দিকে এগিয়ে এলেন, “কীসের কথা বলছেন আপনি?”
“ব্ল্যাক মাম্বা, পূর্ব আফ্রিকার সেই কুখ্যাত সাপ, যার এক ছোবলে মৃত্যু অবধারিত। ব্ল্যাম মাম্বার গায়ের রঙ ধূসর বা ধূসর সবুজ, কিন্তু মুখের ভেতরটা মৃত্যুর মতন কালো। শিকারকে ছোবল মারার আগে মুখটা খোলে আর ওই ভয়াবহ কালো রঙ দেখে কয়েক মুহূর্ত শিকার নড়তে চড়তে পারে না, ব্ল্যাক মাম্বার জন্য ওই কটা মুহূর্তই যথেষ্ট।”
চারু দত্তও রুদ্ধশাসে শুনছিলেন। বললেন “তোমাকেই ছোবল মারতে যাচ্ছিল তাহলে?”
শ্যামল মাথাটা দুদিকে নাড়ালেন।
“অন্য যে কোনও দিন হলে তাই হত। কিন্তু সেদিনটা একটু বিশেষ দিন ছিল। ব্ল্যাক মাম্বার মুখের সামনে দাঁড়িয়েও টের পেলাম সেই ঝাঁঝালো গন্ধটা যেন আমার সমস্ত ইন্দ্রিয়গুলোকে অসাড় করে দিচ্ছে, আর চতুর্দিক থেকে ভেসে আসছে শিসের আওয়াজ। চতুর্দিক থেকে ভেসে আসার ব্যাপারটা মনে হয় তাৎক্ষনিক বিভ্রম ছিল, কিন্তু তারপর যা দেখলাম, তাতে মনে হল ওই বিভ্রমটাই সত্যি। ফুল গাছটার নিচেই নড়ে উঠতে লাগল আরও ধোঁয়ার কুণ্ডলী। এক নয়, একাধিক ব্ল্যাক মাম্বা। এবং আমি তাদের লক্ষ্য নই, বিষম আক্রোশে সেই কুণ্ডলীগুলো একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে, দলামোচা হয়ে যাচ্ছে সেই সাদা-হলুদ ফুল গাছ।”
প্রশ্নমুখর মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে শ্যামল বললেন, “মেটিং সিজন।”
“বছরের ওই সময়টা ব্ল্যাক মাম্বাদের মেটিং সিজন। মেয়ে সাপের জন্য একাধিক পুরুষ সাপ নিজেদের মধ্যে ভয়ঙ্কর লড়াই করে। পিসিমাদের বাগানের ওই গাছের রঙ আর গন্ধ সাপেদের টেনে আনত। নামাসাগালি সে সময়ে এমনই জনবিরল জায়গা যে পিসেমশাই এ ব্যাপারে আগাম কোনও খবরও পাননি। কিন্তু পিসিমাদের কাজের লোকটির মতন কিছু কিছু স্থানীয় অধিবাসী জানত ব্ল্যাক মাম্বার ব্যাপার। তারা অবশ্য দৈবী উপায়ে সাপেদের সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করত। পিসিমার বালাগুলোও সেই সূত্রেই পাওয়া, এনে দিয়েছিল ওনাদের কাজের লোক।
“আমি বলা বাহুল্য তখন মেটিং সিজনের কথা জানতাম না। চোখের সামনে ব্ল্যাক মাম্বার লড়াই দেখে উদভ্রান্ত হয়ে গেছিলাম, সামান্য সম্বিত ফিরতেই প্রাণপণে দৌড়ে ঘরে ঢুকে সমস্ত দরজা-জানলা বন্ধ করে বসে রইলাম। দুদিন পরে পিসেমশাই ফিরে এলেন বটে, কিন্তু ঐ দুদিন যে কীভাবে কাটিয়েছিলাম, সে আমিই জানি।”

পরিচয়ের আড্ডায় বিভূতিভূষণ

সুধীন বললেন, “তোমার পিসেমশাই কি মেজাজি মানুষ ছিলেন? নাহলে পিসিমা এত বড় বিপদের কথাটা কোনওদিন তুললেন না।”
শ্যামল একটু চুপ করে থেকে বললেন, “এখানে একটু করুণ রস আছে সুধীনদা। পিসিমা নিঃসন্তান ছিলেন, ওই কাজের লোক তাঁকে বুঝিয়েছিল সাপেদের মেটিং সিজনের সময় পুজো দিলে তাঁর দুঃখ ঘুচবে। বুঝতেই পারছেন পিসেমশাই শুনলে কতটা বিরক্ত হতেন, সেই ভয়েই কিছু বলেননি। শুধু নিজের বিশ্বাস রেখে পুজোটুকু করে গেছেন। আমি নিশ্চিত যে পিসেমশাইয়ের থেকে বেশি ভয় পিসিমা ব্ল্যাক মাম্বাদেরই পেতেন। কিন্তু আফ্রিকার জঙ্গলে দিনের পর দিন নিঃসঙ্গ জীবন আর কাটাতে পারছিলেন না।”
“তো তোমার পিসিমারা তারপরেও থেকে গেলেন ওরকম একটা জায়গায়?”
শ্যামল বললেন, “পিসেমশাই ফিরে তো আমার কথা বিশ্বাসই করতে চান না। তবে ততদিনে পিসিমাও একটু সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। পিসেমশাইয়ের কড়া কড়া প্রশ্নের সামনে বেশিক্ষণ চুপ করে থাকতে পারলেন না। সব কিছু শুনে পরের দিনই ট্রেন ধরে নাইরোবিতে আমাকে আর বোনকে বাড়িতে দিয়ে এলেন। আর এক মাসের মধ্যে অন্য চাকরি জোগাড় করে চলে গেলেন তানজানিয়া।”
শ্যামল বিভূতির দিকে তাকিয়ে বললেন, “সেখানেও অনেক গল্প দাদা। তানজানিয়া মানে বুঝতে পারছেন তো, সেরেঙ্গেটির কাছেই থাকতেন ওনারা।”
বিভূতিভূষণ তন্ময় হয়ে কী ভাবছিলেন, শ্যামলের কথায় চমকে উঠলেন।
সুধীন বললেন, “আপনার নিশ্চিন্দিপুরে সাপ নিয়ে আসবেন কিনা সেই নিয়ে ভাবছেন বুঝি?”
বিভূতিভূষণ হেসে ফেললেন, “খানিকটা ঠিকই ধরেছেন। তবে নিশ্চিন্দিপুরে আর ব্ল্যাক মাম্বা আনি কী করে বলুন? নতুন কিছু লিখতে হবে, ওই আফ্রিকার পটভূমিকাতেই।”
এদিকে চারু দত্ত ভ্রূ কুঁচকে কী যেন ভাবছিলেন, “তানজানিয়ায় কাজ করতেন তোমার পিসেমশাই? কী নাম বলো তো? আমাদের গ্রামের এক ছেলে ওই দেশেই গেছিল ট্রেন কোম্পানির চাকরি নিয়ে।”
শ্যামল অবাক হয়ে বললেন, “তাই নাকি? আমার পিসেমশাইও তো ট্রেন কোম্পানিতেই চাকরি করতেন।”
এইবারে চারু দত্তের মুখ উদ্ভাসিত, “আরে, কে আমাদের শঙ্কর নাকি?”

 


 

Parichayer Addai
A Story Collection by Prabirendra Chattopadhyay
ISBN 978-81-932146-2-6

Online available at http://sristisukh.com/ss_wp/product/পরিচয়ের-আড্ডায়/

প্রথম সংস্করণঃ নভেম্বর, ২০১৫
সৃষ্টিসুখ প্রকাশন এলএলপি-র পক্ষে হাল্যান, বাগনান, হাওড়া ৭১১৩১২
থেকে রোহণ কুদ্দুস কর্তৃক প্রকাশিত

© প্রবীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ২০১৫
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

প্রচ্ছদঃ দেবাশীষ দেব
অলংকরণঃ সুমিত রায়

মূল্যঃ ১৩৯ টাকা (ভারতীয় মুদ্রা) / ৯.৯৯ আমেরিকান ডলার

মুদ্রক – সৃষ্টিসুখ প্রিন্ট (www.sristisukhprint.com)
সৃষ্টিসুখ-এর বইয়ের আউটলেট – ৩০এ সীতারাম ঘোষ স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০০০৯
যোগাযোগ – ৯০৫১২ ০০৪৩৭

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *