About Sristisukh Library

Sristisukh Library is a promotional site for the books published by Sristisukh Prokashan, Sristisukh Print, Ha Ja Ba Ra La and Flying Turtle. Readers can read the selected portion of the books in this site for free.

বিষমবাহু

শ্রাবণী দাশগুপ্ত

 

হৈমন্তীকে কী যেন ঝাপটাচ্ছে। সে ভাবুক গোছের নয়, তবু রক্তের ঢেউয়ে কুচিকুচি ফেনা গহীনে, তটেও, পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ।

পরিচয়পত্র এক

নাম– হৈমন্তী বাগচি
বয়স– অনুমেয়
শিক্ষা– বি এস সি দ্বিতীয়বর্ষ পর্যন্ত
সামাজিক স্থিতি– বিবাহিত (৩২বছর)
কর্ম/পেশা– স্থায়ী গৃহিণী; মহিলা ক্লাবের সদস্য
নেশা– দূরদর্শন-ধারাবাহিক, রন্ধন ও স্বাস্থ্যচর্চা,
পরিবারের সদস্য সংখ্যা– চার (আপাতত দুই)।

পরিচয়পত্র দুই

নাম– শৈবাল বাগচি
বয়স– চৌষট্টি
শিক্ষা– ইঞ্জিনিয়ারিং (পি-এস-ইউ, রিটায়ার্ড)
সামাজিক স্থিতি– বিবাহিত (৩২বছর)
কর্ম/পেশা– নিজস্ব,
নেশা– সংবাদপত্র, স্পোর্টস চ্যানেল, ফ্যাশন চ্যানেল,
পরিবারের সদস্য সংখ্যা– চার (আপাতত দুই)।

পরিচয়পত্র তিন

নাম– অর্ফিয়ুস (ছদ্মনাম)
বয়স– সম্ভাব্য ত্রিশ
শিক্ষা– চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট
সামাজিক স্থিতি– বিবাহিত
কর্ম/পেশা– এম-এন-সি, (অধুনা সংগীতকার)
নেশা– সংগীতরচনা ও সুরসংযোজন,
পরিবারের সদস্য সংখ্যা– আপাতত দুই।

ঘরের মধ্যে পাহাড় ফাটার বা বন্যার শব্দটব্দ না হওয়াই স্বাভাবিক কেন-না ওরকম হয় না আদতে। যেটা হবার এমনিতেই হয় তিল প্রমাণ না রেখে। গোবেচারা সন্ধ্যাবেলায় এসব উলটোপালটা দোল খাওয়া ভাবনা। তাই আগেই ভাবনার ঘরে একটা বড়োসড়ো তালা লাগিয়ে দেওয়াটা বরং প্রিয় বিচক্ষণতা। শীত শেষের এতোলবেতোল হাওয়া জানালা দিয়ে ঢুকছে বারবার এবং ঢুকেই পড়ছে। আর কী বিশ্রী চারদিক ধুলোয় ধুলো! টেবিলের কাচ, টিভির স্ক্রিন, সোফার হাতল-পিঠ মুছে মুছে শেষ হয় না তো কী করা যাবে? বাতিক বাতিক, ওসিডি, মনোরোগী! বলুক গে, যা মনে হয় বলুক। যুগযুগান্তর চলছে তো ওভাবে, থেমে তো আর নেই কিছু।
সঞ্চালিকা প্রায় সংয়ের মতো সাজগোজ করে (টিভিতে নাকি সাজতেই হয়!) কথা বলে কেন এত? হলেই বা মানায়, হলেই বা সুন্দরী। বুকের মধ্যখানে যে বিশাল ধাতু পাথরের প্রবল আদিবাসী লকেটটা, ওরকমটা তো হিমাচল প্রদেশ থেকে এনেছে নির্ঘাত। কী উদ্ভট প্রশ্ন রে!
“হাই অর্ফিয়ুস! নামটা বদলে ছদ্মনাম কেন?”
তা বেশ করেছে, কিন্তু কেন বদলাল দেখা যাক ব্যাপারটা। নাম আবার কী? লোকের নাম থাকে কেন? না, যেটা ডাকলে জন্তুজানোয়ার পাখিটাখি মনে হবে না, আর অন্যের খানিকটা সঙ্গে পৃথক করে বোঝানো যাবে, এই।
“দেখুন সন-চালিকা, আসলে আমার নামটা বেশিই কমন আর এই একটু সেকেলেও বলা যায়।”
তাতে কী? হুম, কী নাম? চাকরি পেয়েই এল ই ডি-র সাইজটা অতি বড়ো এনেছিল শঙ্খ, অথচ স্লিম স্লিক রুমানী, ছবি দুর্ধর্ষ। শৈবালের কেনা পুরনো স্বাস্থ্যবান টিভি খোদ শয্যাকক্ষে আপ্যায়িত। ডিশ অ্যান্টেনা, হ্যানত্যান, দেখে কে? উপদ্রবের পুরোটা আয়োজন করে দিয়ে স্কলারশিপের হাওয়ায় তিন বছরের নামে ভাগল বা! ফিরেও কি তুই আর এই গ্যাঞ্জাম শহরটায়— অত ভরসা নেই। অতএব হাতে রইল পুরনো পেনসিলখানা। এখন আবার কম্পিউটার শেখ, নেট-চ্যাট কর— হাওয়াই নির্দেশ ছেলের। জবরদস্তি না? কী দরকার একটা আদ্যন্ত যন্ত্রমানব হয়ে? বেশ তো আছি বাবা, যথা পূর্বে তথা পরে না কী যেন ওইরকম কিছু একটা। সমসকৃত-টিত আসে না কোনোকালে।

কালো কালো সিরিয়াস তেলবেণি মাথায় বিজ্ঞান অর্থে বিশেষ জ্ঞান— নিউটনের সূত্র, মাইকেল ফ্যারাডে। অঙ্কে লেটার। তবু এদিকে সাতসকালেই ‘সুন সুন সুন দিদি তেরে লিয়ে এক—’ পিঠোপিঠিগুলোর কী অসভ্যের মতো লম্ফঝম্প। শৈবালের মা-ও ক্ষেপে গিয়েছিলেন এই বউ-ই চাই, করে। ছোটোখাটো গুড়িয়া, জ্বাল দেওয়া ঘন দুধ রং, তেমন বাড়ন্ত গড়ন না, কিছু না। মন দিয়ে বি এসসি পড়ছিল তখন। মা-ও তো তেমনই, হাতে যেন হীরের টুকরোটা! খুব কথা, ওরা নাকি পরে পড়াবে। সব হল! বউ হল, বাকি সব গেল। কেলেকুষ্টি শ্যাওলা রংয়ের হেই উঁচু একটা পাহাড়তলিতে এতগুলো দিন গড়াতে গড়াতে— মানিয়েছে কিনা তাও সেই ভগাই জানে। সারাদিন বইমুখো, জার্নাল-ম্যাগাজিন-সংবাদপত্র— আর বাকি সবেতেই হচ্ছে, হবে। এযাবৎ শুক্তিটা যতদিন কাছে ছিল বেশ গুজুর গুজুর চলত। আজকাল সেও তো দেখি—“বড্ড কাজের চাপ যাচ্ছে মা। একফোঁট্টা সময় খালি নেই।” হায় রে মা! আগে কত বয়ফ্রেন্ড-টেন্ডের গল্প শোনাতিস, এখন তারা গেল কোথা? বিয়েটা পবিত্র এবং সময়ের নিরিখে অবশ্য করণীয়, সেটাও তো মানতে হয়। সময় নেই কি কোনো একটা কথা সোনা মা!

সেই প্রায় প্রাচীনকালে কম্পাসাঙ্কিত মুখ, সোনা রং, চাঁদকপালে লাল মিনেকারি, আবার তাতে বড়োসড়ো দুটি ভ্রমর আর ভেজা ভেজা কাচ, ছোটো মতো গোলাপি মাখোমাখো উলটানো-যুগল প্রায় সব সময়তেই টইটম্বুর।
“আহা বড্ড ছেলেমানুষ রে, ওকে বকিস না বুলু—”
কে যেন বলতেন দিদিশাশুড়ি না বড়ো পিসশাশুড়ি মনে পড়ছে না এখন। শুক্তি রে, তুই কি বুড়ো হলে পরে ছেলেমানুষ হবি মা? সেই তখন ফোঁপাতে ফোঁপাতেই প্রথম প্রথম কত্তগুলো মাস। মা-র ওপরে রাগটাগ খুবই—।
“আ-রে তুমি এত ভয় পাও কেন? ওঃ ঘামছ এই ঠান্ডাতে, খারাপ লাগছে? এদিকে এস, কথা বলি।”
আচ্ছা ঘাম হবে না, হাত-পা ঠান্ডা হবে না, যদি পাহাড়ের পাশে কেউ একা বোকা দাঁড়িয়ে থাকে?

সন-চালিকা গুছিয়ে চালাচ্ছে।
“আচ্ছা অর্ফিয়ুস তুমি কি কলেজে থাকতেও গান গাইতে এরকম?”
হাসিটা বেশ মিঠেকড়া রোদ্দুর যে রে, হালকা ওম। বাঃ, দেখতে দেখতে ভাবতে ভাবতে খেয়াল হয়নি তো এই দুটিতে আবার এল কখন?
“অর্ফিয়ুস, এরা দুজন আজকের ভাগ্যবান দর্শক, তোমার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পেল।”
“হাই অর্ফিয়ুস! আমি সায়র—”
“হাই! আমি তিয়াসি। ভাবতেই পারিনি এতটা লাকি হব। প্লিজ একবার তোমার হাতটা দাও, একটু ছুঁই!”
মা গো, কী আদিখ্যেতা! ন্যাকা বটে মেয়েটা। নেভিব্লু ঝিলমিল সাটিন ফ্রকটা যেন হাঁটুতে শেষ, পা-ঢাকা পোশাক ভালো ছিল না? উদোম পা দুটো কায়দায় ঘুরিয়ে, বুকটুক সতেজ টানটান। ছেলেটার থুতনির কাছে এই এতটুকু, ওটাকে দাড়ি বলে? তবে আপত্তির কিছু না, ভালো ফিগার তো দেখানোরই, সিলিন্ডার হলে আলাদা। (তবে তাই কি প্রথম থেকে ছিল নাকি?) যেমন অকল এদের, এই বেশরম মেয়েগুলো বোঝে না যে লজ্জা পাচ্ছে নতুন গায়ক। গাইবে কী, ভারি লাজুক তো! মুখের চেহারা ভালো দেখাচ্ছে না তেমন। আসলে, পাকাপোক্ত সেলেবটেলেব হয়ে ওঠেনি বুঝি এ পজ্জন্ত। নাকি, আবার এটাও তার ভান? ভান হয়তো নয়, মাথা নীচু করেই বসে আছে। গিটারটায় টুংটুং, টিংটিং, তার সাজাচ্ছে কোনও গানের?

“আ-রে ঘোমটাটা সরাবে তো, দেখি না দেখি, কোথায় আবার সেফটিপিন লাগিয়ে রেখেছ, ওহ ফুটে গেল!”
বাবা গো, পর্বত রাগ করছে! এই গর্জন, না এরকম আওয়াজ, এমনই? ভ্যাঁ-টা জোরে হল না শুধু। বাকি কাজল-টাজল গলে দুধের সরের ওপরে কালো কালো একরাশ ধারাবৃষ্টি।
খেয়েছে, এটা কী হল আবার? জিসকি বিবি নাটি উসকা ভী বড়া-! পাঁজাকোলা হয়ে তখন দুই খড়খড়ে শক্ত লোমঅলা হাতের ভাঁজে, এ মা! গোলাপি পপিন্স ফাঁক হয়ে সরে দুসারি জুঁই ফুল, তখন তার ওপরে আস্তে করে ঝুঁকে আসছে বড়োসড়ো কালো মেঘটা। সত্যি চোখ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। শুনে সর্বাণী আর কণিকা হিং হিং করছিল—
“তুই কী লাকি, তুই কী লাকি! টল ডার্ক হ্যান্ডসম আবার দারুণ গোঁফটা। এই তুই নাকে খোঁচা খাস না? এই বলনা, খুব রোম্যান্টিক, না রে? এই তোকে আই লভ ইয়ু…?”
“ধ্যাৎ, কী যে ন্যাকার দল! রো-ম্যা-ন- ঈঈ, হেহে, যা ভাগ অত খায় না। তোদের যখন হবে— দেখিস।”
“অর্ফিয়ুস, তোমার এই অসাধারণ গলা প্লাস মেধার সমন্বয়— সত্যি, কী বলব! বাড়ি থেকে উৎসাহ পেয়েছ গান গাওয়াতে?”
“ততটা না, মূলত পড়াশোনাই। গানটা প্যাস্টাইম ছিল, প্রফেশন হিসেবে নেব ভাবিনি। ক্যান্টিনে করিডোরে চুটিয়ে গীটার-ব্যাপক প্যারডি।”
আহ এত বকবক কথা না বলে গান শোনালেই তো পারে। কী কথা ওর গানগুলোর, আহা। বাউল থেকে একটুআধটু টুকলি আছে অবশ্য সুরে, ওতে তেমন দোষ নেই। ঠাকমা সন্ধেয় কীর্তন গাইত যে কানে বসে গেছে।
“শুন হাসি, গা তো। ভগবান তোর গলায় বড্ড সুর দিছিল, শিখাইল না বাপ-কাকায়। নাতজামাই যদি শিখায়—!”
আহা, কত আশা! তাই না তাই। ভাগ্যিস বেচারি বুড়ির দুচোখই অন্ধ। নাতজামাইয়ের ভোঁতকা মুখ আর খাড়া নাকখানা মরণ পর্যন্ত অদেখাই। ছবছরের বনবাস সেই অবাংলায়, হনিমুন ভী। কম্ম সারা, পরপর দুবছরেই হম দো হমারে দো কমপ্লিট। নইলে বয়স বেড়ে বেড়ে যাবে যে! সারাদিন কারখানা সেরে, সন্ধেয় দুধের টিন ওষুধ, ফিরে সংবাদপত্র নামের নেশায় আত্মসমর্পণ ও দেশের সমস্ত বাচাল খবর সংগ্রহ করতে করতে বিছানায় কাত হয়ে,
“এবারে এদিকে এস না, অতক্ষণ কী করছ?”
“ওরে বাবা দাঁড়াও এমা হিস্‌ হল। ঈশ আবার তুইও দুধ তুললি কেন? আর পারি না, এই এটাকে একটু ধরবে গো?”
ততক্ষণে ওপাশেও গররর নাসিকা সংলাপ।

“অর্ফিয়ুস, ওই ছবির পরিচালকের সঙ্গে তোমার পরিচয় কীভাবে?”
এইরকম করে হাসে কেন অর্ফিয়ুস? ও কেন চুরি করে চা-য়। কী যেন তারপর? লুকোতে গিয়ে হাসি হেসে পালায়! ঈশ, হাসিটা বুকের মধ্যে ক্ষীর।
“পরিচালক আমার ছোট্টবেলার ক্লাসমেট, পরে অবশ্য ও সরে অন্য লাইনে।”
অহো কী গায় গো! মুখ বাঁকানো নেই, মুণ্ডু ঝাঁকানো নেই, গায়ে কাঁটা। হ্যাঁ গো লিপ দিচ্ছ না তো? কী করে এমন পারে! সেই যে কবে কলেজের নবীনবরণে স্বনামধন্য শিল্পীমানুষ, তখন তো তিনি তত যুবকও নন। ‘ঝড় উঠেছে বাউল বাতাস—’ বুকে ঝড় অডিটোরিয়াম তোলপাড়। একটা অটোগ্রাফের জন্যে শুধু সব্বাই জবা-অনুপমা-বাবলি— “প্লিজ প্লিজ।” দু-তিনটে বছর পরে আরও একবার দেখা।
“যাবে নাকি? গান শুনতে যাবে? অফিসের কালচারাল স্বর্ণজয়ন্তী বলে দু-একজন বিখ্যাতকেও ডাকা হচ্ছে।”
“তাই?” (এত ভালোবাসি এত ভালোবাসি!) তক্ষুনি হ্যাঁ হ্যাঁ এবং হ্যাঁ! লম্বা বেণিটা ঢিলে ঢিলে করে বেঁধে, নতুন সরু জরিপাড় ঘন জামরং চান্দেরি, হীল-শু। তখন থেকেই অবশ্য একটু রোলার-টাইপ। সামনে গোল, পেছনে গোল, ভারী ভারী, গিন্নি-মতো। তাতেই তো—“কী দেখাচ্ছে তোমার বউকে শৈবাল! তোমার মেয়ে বলেই চালিয়ে দেওয়া যায়, হরণ করব? হা-হা-হা-হা।”
হুঁহ, আর কিছু নয়? পাশের সিটে বসে আড়চোখে কোঁচকানো ভ্রূ, ফিশফিশ…
“বেশি হাসবে না বুঝেছ? এত বড়ো-গলা ব্লাউজ পরেছ কেন? পিঠটা ঢাকা দিয়ে নাও তো!”
কান্না পেয়ে গেছে যে! নিজের ভালো না লাগে, ভালো না বাসো, শুনতে দাও না কেন একটু?
‘যাবার বেলায়— পিছু থেকে ডাক দিয়ে— কেন বলো কাঁদালে আমায়।’ এমন সুরে চোখে জল আসবে না?
“একটিবার যাব গো, যাই না গো প্লিজ, শুধু একটা অটোগ্রাফ। না না, কথা না, ছোঁব না, হাসবও না কিচ্ছু না, শুদ্দু অটোগ্রাফটা।”

এই যে মেয়েটা, তিয়াসি না কী যেন নাম, সত্যি লাকি, সত্যি। ঈশ, আবার কেন বিরতি দিল? উফ কে রে বাবা এখন আবার? “ও বাবা, কী হল আজ এত আগে ফিরলে? শরীর ঠিক তো?”
“হুম, সব ঠিক। কফি বানাও তো কড়া করে। আরে এসব কী আজেবাজে দেখছ এখন, কাজ নেই? এটা সেই মুখ্যু ছোকরা না, কেরিয়ার-টেরিয়ার বরবাদ— চেহারার চটক খালি।”
“ন-না, গান গানও দারুণ।”
“হুহ, গান! বাজে ক্রেজ। দাও তো ছাড়ো, নিউজটা চালাও। লিবিয়াতে রেভলিউশন ডেমোক্রেসি, গদ্দাফির কী সব ঘটছে আর তুমি একটা কী ফালতু চ্যানেলে!”
“হোক না ফালতু তাই হোক না, যত্তসব! ডেমোক্রেসি না হাতির মাথা। ভাল্লাগে না আর। সবেতে বাগড়া! কফির সঙ্গে আর কি কিছু লাগবে? পাঁপড় সেঁকা? চিঁড়ে মাইক্রো করে, কটা কাজু দিয়ে?”
“না না, শুধু কফিই। বেকারির বিস্কিট আনা হয়েছিল না?”
যা হোক বেডরুমের টিভিটাতেই— ছিল বলে তাই। অর্ফিয়ুস বলল না তো আসল নামটা।
“হাসি— এদিকে শুনছ, কাল নীলাভ বলে একটি ছেলে বোম্বে থেকে আসবে, শুক্তি পাঠিয়েছে। ওর কলিগ বুঝলে, লাঞ্চ খাবে এখানে। আমাদের বাড়িতে।”
জানি তো আগেই, যা দেখছে দেখুক না বাপু, মেয়ে মাকে জানিয়েছে হপ্তাখানেক আগেই। ভাও নিই না তাই নইলে, উঁহু, সব ভাঙছি না এক্ষুনি।
অর্ফিয়ুস দাঁড়িয়ে গাইবে? লম্বা খুব, একটু রোগাই, জিন্‌সটা চাপা বলে আরও দেখাচ্ছে। মুখের ওপরে চুল সামান্য অগোছালো, গীটারটা গলায়। কী অ-অসাধারণ এই গানটা ধরেছে নতুন অ্যালবাম থেকে। তিয়াসি ওখানে তুই কেন? ওখানে—?
“প্লিজ অর্ফিয়ুস, একটু নাচি তোমার গানের সাথে, নাচব? আবার হাসছ যে?” একে কি রোমান্স বলে, এটাকেই? এত বছর ধরে তো কই! দুহাতের সব লোম খাড়া হয়ে, আরও যে কী হচ্ছে জানি না যাও। বুকের বন্ধ খাঁচাটার মধ্যে ঝড়ো হাওয়া। শনশন কুচিকুচি রুপোলি সোনালি গুঁড়ো। ‘মেরি ভীগি ভীগি সী—’ চোখটায় কী যে পড়ল, অস্পষ্ট লাগছে! আহা, আমি কি দুঃখী বেচারি নাকি? মোট্টেও না। সব তো পেয়েছিলাম, পেয়েছি তো। এই তো এত কত কিছু।
অর্ফিয়ুস, কোনটা আসল তুমি সেটা জানো কি? বুঝতে পারো, নিজে? বড়ো এক্সিকিউটিভ, নদী কাঁপিয়ে উপলখণ্ড ঝাঁকিয়ে দেওয়া গায়ক, না কি আসলি রোমান্স, বুকের মধ্যেকার রূপকথার স্বপ্নটাই? ও বাব্বা, কবিতা হয়ে গেল যে এটা, বটে! ধ্যাৎ, এত ভাবতে যাবে কেন তুমি শুধুমুদু, ভেবো না প্লিজ, গাও। এমন ছায়াছায়া মুখটা, বড্ড আরাম। চোখ ফেরাতে পারছি না গো, তাই বুজেই রাখি। প্লিজ আমায় দেখো না (পাবেও না) কিন্তু, শোনো আমি কিন্তু হই—। আচ্ছা পরে হবে এখন। এমন গান আরো গাও তো, যেটা কষ্টে ফাটা ফাটা। তোমার সঙ্গে যদি একদিন কফিহাউস বা ক্যান্টিন, রাজি হবে তুমি? আসলে ওটাই জীবনে হয়নি, কক্ষনো হয়নি। কারণ তো সব্বাই জানে, জানত। তুমি জেনে আর— বাদ দাও। গান থামিয়ে দিলে?

“অর্ফিয়ুস, তুমি যে সবে বিয়ে করেছ আমরা জানি, আরও কিছু বলো। কে প্রপোজ করেছিল আগে?”
(লজ্জা পাচ্ছ বুঝি, আহা রে!)
“তেমন কিছু না। ফাংশানে ওর বান্ধবী অটোগ্রাফ আর ফোন নাম্বার নিয়েছিল। তিন-চারদিন পরে আমার মোবাইলে আমারই একটা গান অচেনা মেয়ের ফ্যান্টাস্টিক সুরেলা গলায়— ব্যাস, এভাবেই। তবে পাবলিকলি গায় না, গাইলে পারত—বলেওছি।” “ওয়াও, দা-রু-ণ! লং লিভ ইয়োর লভ এন্ড লভ ফর মিউজিক। কিন্তু আজ আমাদের সময় প্রায় শেষ হয়ে এসেছে অর্ফিয়ুস। দুটো ছোট্ট প্রশ্ন করব তুমি যাবার আগে, তোমার আসল নামটা আর তোমার গার্লফ্রেন্ড টার্ণড টু অর্ধাঙ্গিনীর!”
আবার অমনি হাসি?
শেষ গানটা আগে হয়ে যাক না, একটা রবীন্দ্রসংগীত গাই? ‘কিছু পলাশের নেশা কিছু বা চাঁপায় মেশা—’
জালটা ছড়িয়ে ভাসছে হাওয়ায়, দুলছে ঘরের সিলিং ছুঁয়ে শিরশিরশির। ঈঈশ, ড্রইংরুমের ল্যান্ড ফোনটায় এসটিডি রিং কী জোরে! উঠে ধরবেও না নাকি? মোবাইলে করলে পারে না? জাপানে রাজতন্ত্র না ব্রিটেনে স্বৈরতন্ত্র দেখা হয়ে গেল বুঝি? অর্ফিয়ুস প্লিজ— শুধু ফোনটা ধরেই একটিবার— একটু জাস্ট! দায়িত্ব যে। গনগন করে এনডি টিভি— লিবিয়া উচ্ছ্বসিত, ইস্তেহার আন্দোলন বিপ্লব গণতন্ত্রের জয়।

“ওরে হ্যাঁ রে কী করছিস রে তোরা দেবাদেবী, ফোন ধরিস না কেন?”
“না গো ও মেজদি এই তো, কিছু না আমি আসলে ওঘরে—। তোমার ভাই তো এখানেই টিভি দেখছিল, ভাবলাম উঠে ধরবে। এসে দেখছি ঘুমিয়েই অজ্ঞান। হি হি!”
“তা ঘুমিয়ে পড়বে না? যা পরিশ্রম করে এই বয়সেও।”
“সত্যিই তো। হ্যাঁ মেজদি বল তোমরা কবে এদিকে—? তাই তো! হ্যাঁ ভালো আছে ভালো আছে— শাঁখ ঝিনুক দুটোতেই।”
“হ্যাঁ হ্যাঁ শুনছি গো!”
বকর বকর বকর বকর! (আর একটুক্ষণ থেকো কিন্তু, আসছি সত্যি!)
এ কী, ওরা যে আর কেউ নেই! চলে গেছে।
ভালো ভালো বিজ্ঞাপন চলছে তো চলছেই। খাঁটি তেল, তাওয়া, সিমেন্ট, হেলথ ড্রিংকস, মোবাইল, ফর্সার ক্রিম, বগলের দুর্গন্ধের। পরের ধারাবাহিকের— আগে যা ঘটেছে। কবে তুমি আসবে আবার, কত দিনে? বলে গেছ?
তিনি তো ঘুমোচ্ছেন। পাঁচটা রুটি করে নিতে কতক্ষণ, খানিক দেরি হলেই বা! সকালের চিকেন স্টু মাইক্রোতে মোটে তিন মিনিট। ইদানীং শুক্তির ঘরটা নীইট এ্যান্ড ক্লিন। মেয়ে-মায়ে চুড়ি পায়জামা পরে দেওয়ালে ঝুলছে, বছর চারেক আগে হ্যাভলক বিচে। এটা কেতরে গেল কী করে? গোদরেজের চাবিটা এই তো এখানেই। মেয়েটা একটা পাগলি, কিচ্ছুটি খেয়াল থাকে না। খোলার সময় আলমারিটায় ঘটাং হল কেন? হুম, ঠিকমতো হ্যান্ডলই করে না, বেঁকেছে সামান্য।
গ্রিন লেগিংটা ট্রাই করে একবার— উফ বাপরে বাপরে এঁটে বসছে কোমরে, গ্রে-কুর্তিটা ম্যাচিং। এ মা, সামনেটা এত্ত বাজে দেখাচ্ছে জঘন্য ধ্যাবড়া বেঢপ। কোমরের কাছটায় ভাঁজভাঁজ তুলোর ব্যাগ না মাখন ফ্যাক্টরি। ছি ছি। মেয়ে তো পাতলা, মেয়ে তো স্লিম। কানের পাশের রাস্তাটায় পুরনো পিচ সরে গিয়ে কদিনেই ছায়াপথ। হি হি, টিংটিং মতো দু-বেণি কেমন? ঘন দুধের সরেও মাছি এসে বসেছে ছোটোছোটো, চশমা প্রোগ্রেসিভ হলেও চশমাই না হল, না থাকলে আঁধার। হুম, কী এল, কী গেল? অর্ফিয়ুস আর একটিবার ফিরে— বল না কবে? এ কেমন আনচান।
“হল তোমার টিভি শেষ? রাতের খাওয়াদাওয়া বাদ?”
“ও কী না, রেডি তো সব, দিচ্ছি দিচ্ছি দিচ্ছি দিচ্ছি—যাচ্ছি।”
“হে ভগবান ফোলে না কেন আজ রুটি—? টেবিলে রাখা প্লেট— স্টুও তো রেডি, এস।”
“আরে এটা আবার কী ব্যাপার, মাথার পোকা বাড়ল? না নতুন করে কোথাও কিছু আবার?”
“কীসব বলে যে যাচ্ছেতাই, না না এমনিই শুধু শুধু ইচ্ছে, ট্রাই তুমি খাও না খাও।”
“পারোও, বয়েসটয়েস ভুলে গেছ দেখছি, দেখেছ আয়নায় মুগুরের মতো ঠ্যাং দুটো নাচিয়ে? দেখো উঠে। হা হা হা, কাল কিন্তু খবরদার আবার এসব এক্সপেরিমেন্ট— উঠলাম, আর একটু দেখে নিই গদ্দাফি।”
“মেজদি কিন্তু ফোন করেছিলো-ও-ও। ঈঈশ এত্ত বাজে লাগছে রুটিটা আজকে, চামড়া। কোত্থেকে আনল তেতো আটাগুলো, কিন্তু কালও তো এটা দিয়েই? কে জানে বিস্বাদ লাগছে এত? ঠান্ডাটা দপদপিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে।”

পরিপাটি বারান্দা চুপচাপ। এই বাইপাস ঘুম পাচ্ছে বুঝি তোমার? ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে রাত কাটাচ্ছ! খুচরো খুচরো রাতবাতি শপিংমলে সারারাত। এই নেড়ি কুকুর, তোরাও আদর করিস, হিংসে, রোমান্স সব? এ-প্লাস-বি হোল কিউবের ফরমুলা দেখছি ঠিকঠাক মনে আছে। কী করে? শঙ্খটার কত দেরিতে কথা শুরু হয়েছিল। না, রাত হচ্ছে যে বড্ড, দেখি গিয়ে ঘরে।
“কী হল, শোবে না নাকি?”
(ঈশ, ধমকি আবার!) গিরগিরগির এসি ঘট করে থামল, টেম্পারেচার তেইশ। নিজের কম্বলটা টানতেই, ও মা গো সাঁড়াশি-প্যাঁচে এঁটে ধরেছে শক্ত ভারী পদযুগল।
“কী গো খুকি রাগ করেছ নাকি তখন মুগুর বললাম?”
“ও মা কেন? রাগ আবার কীসের? ঠিকই তো মুগুরই তো, কী বিচ্ছিরি কত বেঢপ।”
“ও করনি? বাচ্চাই রয়েছ এখনও! তাহলে এবারে এদিকে এস তো।”
আহা, এনার্জি কত কমে গেছে মানুষটার। হি হি বুড়োবাবুর ইচ্ছে তো আঠেরো আনা! বাথরুম থেকে ফিরে শুতে না শুতেই অগাধ অতলে। ঘুঁৎঘুঁৎ নাকের গল্প। কপালে সমান্তরাল ভাঁজ, নাকের পাশেও, মাথার সামনেটা খালি। কোলেস্টেরল সুগার ধরেছে বছর পাঁচেক হল। কেমন নরম নরম লাগে একটা, বুকের মধ্যেটায় দুঃখু দুঃখু। আহা গো! লেগিং-টেগিং, কুর্তি-ব্রা, সব নীচে মাটিতে। থাক এখন, তোলাতুলি হবে পরে— কাল সকালে। রোজকার নরম নাইটিটায় ঢুকে আঃ আরাম। হ্যাঙারে ঝুলছে হালকা সবুজ ফিনফিন ছোটো ছোটো ফুলেল সুপারনেট কোটা। পরশু মৃন্ময়ীর বিবাহবার্ষিকীতে পরা হয়েছে। রোদ খাওয়াতে হবে। আয়নার ওপরে বাইরের আলোর বেঁকা ইঙ্গিত। ঘুমন্ত ভারী হাতটা তার বুকের ওপর চেপে আছে। সাবধানে না নামালে ঘুম ছুটে যেতে পারে। আস্তে পা, আরো ধীরে— আয়নার কাছে। ভাঁজ করা সুপারনেটটা খুলে নিয়ে দুহাতে মুখের সামনে ঝুলিয়ে পাতলা ব্যবধানের পিছনে কেমন বেশ লুকোচুরি! ডবল-পাওয়ার চশমাটাও খাটের সাইড টেবলে। একপাশে আঁধারের ঝাপসা ছায়া, ওপাশের আয়না ঝকঝক। সত্যি বলো তো আয়না মুছে যাচ্ছে কিনা? মুছে গেছে কিনা? ওই যে সেই মেয়েটা, ডবল চিন নেই, মুগুর পা নেই। শোনো-না একবার অর্ফিয়ুস— ওই তাকাও দেখো, আয়নার ওপাশে ওধারে, পাচ্ছ? বল পাচ্ছ? এবারে বলো তো আমি— আমায়! কোন ফ্ল্যাটে মিউজিক চলছে রে বাপু এত রাতে? কে শোনে?
‘যেতে যেতে পথে হল দেরি—’ ওই সেই গানটা না? পাশে বসে একদিন তুমি, কানের কাছে ফিশফিশ একটিবার, ঠিক তো?

 


 

Bishamabahu
A Short Story Collection by Srabani Dasgupta
ISBN 978-1-63535-326-6

Online available at http://sristisukh.com/ss_wp/product/বিষমবাহু/

প্রথম সংস্করণ – জানুয়ারি, ২০১৭
সৃষ্টিসুখ প্রকাশন এলএলপি-র পক্ষে হাল্যান, বাগনান, হাওড়া ৭১১৩১২
থেকে রোহণ কুদ্দুস কর্তৃক প্রকাশিত

প্রচ্ছদ – রোহণ কুদ্দুস

© শ্রাবণী দাশগুপ্ত, ২০১৭
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

মূল্য – ১৩৯ টাকা (ভারতীয় মুদ্রা) / ৯.৯৯ আমেরিকান ডলার

মুদ্রক – সৃষ্টিসুখ প্রিন্ট (www.sristisukhprint.com)
সৃষ্টিসুখ-এর বইয়ের আউটলেট – ৩০এ সীতারাম ঘোষ স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০০০৯
যোগাযোগ – ৯০৫১২ ০০৪৩৭

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *