About Sristisukh Library

Sristisukh Library is a promotional site for the books published by Sristisukh Prokashan, Sristisukh Print, Ha Ja Ba Ra La and Flying Turtle. Readers can read the selected portion of the books in this site for free.

মেজোবাবু আসবেন

অর্ণব রায়

 

তালার মধ্যে সরু তারটা ঢুকিয়ে মোচড় দিয়েই হরেন বুঝল, খাম কাজ হয়ে গেছে। বাঁ চোখের কোণ দিয়ে বারবার মনে হচ্ছিল হলুদ জামা নীল লুঙ্গি পরা লোকটা নজর রাখছে। কিন্তু এত ভিড়ের মধ্যে কে আর খেয়াল রাখছে মনে করে, খুঁতখুঁত করলেও কাজে হাত দিয়েছিল হরেন। ব্যস, লাফ দিয়ে এসে হাত চেপে ধরেছে। সে হাত তো নয়, থাবা।
“এটা কী হচ্ছে বটে?”
হরেনও কাঁচা জিনিস নয়। এক ঝটকায় হাতটা ছাড়িয়ে মাছভাজার মতো মুখ করে সোজা হাঁটা লাগায় হনহন করে। ও খুব ভালো করেই জানে, এখন যদি একটাও কথা বাড়ায়, সোজা মার শুরু হবে। আর যদি ছোটে তো মুহূর্তের মধ্যে পাঁচশ লোক পেছনে ধাওয়া করতে শুরু করবে। কেটে বেরোবার যেটুকু সুযোগ, তাও কেঁচে যাবে। এ অবস্থায় হেঁটে যতটা পারা যায় দূরত্ব বাড়াতে হয়, তারপর চোঁ-চা দৌড়। সামনের মাঠটা পার হতে পারলেই বড় রাস্তা। একবার উঠে গেলে কোন শালা তাকে ধরে?
এই ছোটার মতো করে হাঁটার ফাঁকটুকুর মধ্যে কালীপুজোর পোকার মতো হুড়হুড় করে ভুলগুলো হরেনের চোখে পড়তে থাকে। জায়গা আর সময় ঠিকই বেছেছিল হরেন। হাসপাতালের আউটডোর। সকালবেলা। মহা হল্লাগুল্লার জায়গা। কোথায় লাগে মাছবাজার। থিকথিক করছে রোগী আর তাদের আত্মীয়স্বজনদের ভিড়। ভোররাত থেকে হত্যে দিয়ে পড়ে আছে। দূর গাঁয়ের আবছা আবছা মানুষ সব। আটটায় টিকিট ঘর খুলবে তো চারটে থেকে সব লাইন দিয়ে জায়গা ঘিরে বসে আছে। ডাক্তার আসতে আসতে নটা সাড়ে নটা। আর এই সময়েই গন্ডগোলটা সবচেয়ে বেশি হয়। টিকিট নাও রে, ডাক্তারের ঘর খোঁজো রে, কাল যে ঘরে হাড়ের ডাক্তার বসেছিল, আজ সেখানে নাক-কান-গলা। হামেশাই ভুল হয়। একঘণ্টা চোখের ডাক্তারের ঘরের সামনে লাইন দিয়ে ঢোকার পরে ডাক্তার বলে, প্যান্ট খোলো। ডাক্তার যদি বা দেখানো হয় তো তার কাগজ বুঝে, কোন ওষুধ হাসপাতাল থেকে পাওয়া যাবে কোনটাই বা বাইরে থেকে কিনতে হবে বুঝে ওষুধের ঘরের সামনে লাইন দিয়ে দাঁড়ানো। আর ছবি করানোর ব্যাপার থাকলে তো হয়েই গেল। তার ওপর আছে দালালদের চক্কর। একেবারে হাঁ করেই আছে। কী করাতে হবে? হাড়ের ছবি? থুতু? রক্ত? বীর্য? নাকি রেফার করল? গাড়ি লাগবে? সব একেবারে রেডি।
এই সময় লোকের নিজের হাত-পা খেয়াল করার সময় থাকে না, তো সাইকেল। এমনিতে হরেন হাসপাতাল এলাকায় কোনওদিন কাজ করেনি। ছায়া-মন্দির সিনেমার ওদিকটাতেই ওর ঘোরাফেরা। তাই আজ তিনদিন ধরে হাসপাতাল চত্বরে ঘোরাঘুরি করে হালহকিকত বোঝার চেষ্টা করেছে। এখানে ঝুঁকি বেশি। লোকজন তিনঘণ্টার জন্য মোহিত হতে অন্ধকার হলের মধ্যে ঢুকে যায় না, যে সে ফুরসত নিয়ে ধীরে সুস্থে তালাটি খুলে মালটাকে হাঁটিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাবে। এখানে মুহূর্তে ফয়সালা হয়। তালাটাকে বাগিয়ে সিটে বসেই মার প্যাডেল। নয়তো কোমরের সাথে একটা হুক লাগানো থাকবে। সাইকেলটাকে আলতো করে তুলে সিটের পেছনের লোহাটাকে লাগিয়ে দিতে হবে হুকের সাথে। চাকাটা থাকবে মাটি থেকে খুব বেশি হলে দেড় ইঞ্চি উপরে। দূর থেকে কোনও মামু দেখে বুঝতে পারবে না। তারপর সোজা তারকের গ্যারেজ। রঙটুকু শুধু পালটে নেওয়া। তবে সেও করতে হবে খুব সাবধানে। একটু এদিক ওদিক হলেই…
তেমনই আবার দেখতে গেলে সুযোগও বেশি। লোকজন যারা আসে আধক্ষ্যাপা হয়েই থাকে। হামেশাই তালা মারতে ভুলে যায়। এছাড়াও হরেন খেয়াল করে দেখেছে, অন্য অন্য ডাক্তারের চেয়ে যে লোক চোখের ডাক্তারের ঘরে ঢোকে তার সময় বেশি লাগে।
যে মালটাকে হরেন টার্গেট করেছিল, সে একটি ছোকরা। ঝড়ের মতো এসে সাইকেলটা ফেলেই চোখের ঘরে সেঁধিয়ে গেল। হরেন দেখল ছোকরা তালা মারল, কিন্তু তালাটা ঠিকমতো মারা হল না। পকেটে রাখা সরু চুলের কাঁটার মতো তারটাতে হাত বোলায় হরেন। এদিক-ওদিক দেখে। আস্তে করে ঢুকিয়ে একবার মোচড়। ব্যস।

 

পূরণ বলেছিল, “কাকা যেওনি। অনেকদিন কাম কাজ করো নাই, হাত দুরুস্ত নাই। ধরা পড়ি যাবা। আর পাবলিকেও আর সেরম নাই। ধরলি একেবারে জানে মারি দিবে। আজকাল আর জ্যান্ত ছাড়ে না গো!”
দত্তদের বাগানের পেছনে যে ঘরদুটো ভেঙেচুরে আছে, ওরা তিনটেতে ওখানেই বসেছিল ভূতের মতো। উবু হয়ে। হরেন ফিরে আসার আনন্দে পূরণই দুটো বোতল আনিয়েছিল। সাদেকুলের বুকে ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া লোম। তার মধ্যে আধখানা বাদাম ঢুকে পড়েছে। কিছুতেই বের করতে পারছে না। নেশায় হাত আর ঠিক জায়গায় পড়ছে না। তার ওপর অন্ধকার।
রঙ্গ দেখে এত দুঃখের মধ্যেও হরেন হেসে ফেলে। পূরণের কাঁধে হাত রাখতে গিয়ে মুখে হাত পড়ে যায়। বলে, “ওরে আমি হরেন মালো, কাজ করতে গিয়ে ধরা পড়ব তেমন গুরুর চেলা নই!” আর যে কথাটা এই ধুম নেশার মধ্যেও মুখ ফসকে বেরিয়ে আসে না, তা হল, ধরলেও আমার কে কী করবে। আমার মেজোবাবু আছে। ঠিক সময়ে এসে বের করে নিয়ে যাবে।
এরপরেই পূরণ আর সাদেকুলের মধ্যে ঝামেলা লেগে যায়। পূরণ বলে, “সাইকেল আবার কেউ সরায় নাকি? এখন বাইকের যুগ। কোনও মতে নিয়ে সরে পড়তে পারলেই হল। পয়লা চোটেই সোজা বর্ডার। তুমি কিছু ভাবিও না কাকা। সব ফিট করা আছে। দুহাজার পেলেই বি এস এফ লাইন দিয়ে দেবে। ওপারে নিয়ে যাবে কালাম আর তৌফিক। তুমার কাজ কালীগাঙ অবধি পৌঁছে দেওয়া। কমসে কম তিন হাজার থাকবে হাতে।” সাদেকুল বলে, “আরে না না। বি এস এফ-এর কোনও ভরসা নেই। ও শালারা টাকা পেলেও গুলি চালায়। ওসব করে কাজ নেই।” পূরণ সাদেকুলকে ডরপোক বলে। ব্যস, লেগে যায়।
হারান উঠে পড়ে। আমবাগানের ঝুঁঝকি অন্ধকার আর চকরাবকরা জোছনার মধ্যে দিয়ে আসতে আসতে আপন মনেই হাসে। ভাগ্যিস বলে ফেলেনি! মেজোবাবুর কথা মনে হলেই মনটা খুশিয়াল হয়ে ওঠে। আজকের জানাশোনা নাকি মেজোবাবুর সঙ্গে! সেই যেবার বন্যা হল, জলে জলে মানুষজন দিশাহারা। যে যেদিকে পারছে, ঠাঁই নিচ্ছে। কারোর কোনওদিকে তাকানোর অবস্থা নেই। সব কাছাখোলা হাল। মুহুরীপাড়ার বেশ কিছু বাড়ি থেকে ভালো হাত মেরেছিল হরেন। সাত নম্বর বাড়ি থেকে বড় দেওয়ালঘড়িটা সরাতে গিয়ে কিচাইন হয়ে গেল। ঘরদোরে জল ঢুকে এমনিতেই লোকজন ক্ষেপে ছিল। জনা পঞ্চাশেক জড়ো হয়ে ল্যাম্পপোস্টের সঙ্গে বেঁধে খুব কষে বানাচ্ছিল ওকে। তখনই মেজোবাবুকে দেখে হরেন।
সবাই বলল, “মেজোবাবু আসছেন, মেজোবাবু আসছেন।”
খুব যে হোমরাচোমরা চেহারার লোক মেজোবাবু তা নয়। হারান ভালো করে খেয়ালও করে রাখেনি চেহারা। ওর তখন প্রায় বেহুঁশ দশা। হাত পা ঝিমঝিম করছে। চোখের ওপর আঁধারের পর্দা নেমে আসছে। কিন্তু মনে আছে, ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলেন। দুহাত বাড়িয়ে ক্ষ্যাপা পাবলিককে থামালেন। বললেন, “আরে আর মারিও না হে। ইবার মরি যাবে যে! মরি গেলি তখুন তুমাদের থানা থেকি টানাহিঁচড়া কইরবে। ছাড়ে দাও। ছাড়ে দাও। পুলিশ ডাকো। পুলিশ যা করার কইরবে।”
পাবলিক থেমে গেছিল। এই যে ক্ষেপে ওঠা পাবলিকের মাঝে ঝাঁপিয়ে পড়া, বাঁচিয়ে দেওয়া, এ কি ভোলা যায়?
তারপর তো মেজোবাবুর সাথে কতবার কত জায়গায় দেখা! ইসলামপুরে গাড়ির স্পেয়ার পার্টস সরাতে গিয়ে, ডোমকলে মোবাইল, রসুলপুরে ক্যাশ। বলতে নেই, গুরুর আশীর্বাদে হারান খুব বেশিবার ধরা পড়েনি। কিন্তু যতবার ধরা পড়েছে, ওই মেজোবাবু। ভিড়ের ভেতর গলা গমগম করে উঠেছে, “আর মারিও না হে।”
মাঠের কোনাকুনি শর্টকাট নিতে গিয়েই হারান বুঝে গেল, পাবলিক পেছন ধরে নিয়েছে। মাঠের সিকিটা পার হতে না হতে কোমরে প্রথম লাথিটা এসে পড়ল। ঘুরে পড়ে যেতে যেতে হারান দেখতে পেল একটা ষোলো সতেরো বছরের ছেলে প্রায় উড়ে এসে লাথিটা মেরেছে ফিল্মি স্টাইলে। সেও পড়ে গেছে। কোঁকানির সঙ্গে সঙ্গে হারানের মুখ থেকে বেরিয়ে এল, “মেজোবাবু।”
প্রথম লাথিটা পড়ে যেতেই পাবলিকের উৎসাহের কল খুলে যায়। সিটি বাজিয়ে একসঙ্গে চিৎকার করে তারা ব্যাপারটাকে স্বাগত জানায়। এরপর আর কিছু হারানের হাতের মধ্যে থাকে না।
বাবলু ওস্তাদ বলত, “পেরথম ঘা-টা যখন পড়বে, দম চাপি লিব্যা। পিঠ কুঁজো করি রাখবা আর চোখখান খোলা রাখবার চেষ্টা করিও। আর দেখিও, বেম্মতালুতে আর বিচিতে যেনে মাইরতে না পারে।”
তা অত কী আর সামলানো যায়! এই তো আকালুকে সেবার এমন মারল মাথায়, একমাস হাসপাতালে পড়ে থাকল। যখন ছাড়া পেল, মাথাটা বেবাক ভুলভাল হয়ে গেছে। রাস্তায় যাকে দেখে, পেন্নাম ঠোকে।
লাথি খেয়ে পড়ে গিয়েই হারান হাউমাউ করে কান্না জুড়ে দেয়। এও বাবলুরই বিদ্যে। বলত, “খুব কাঁদবা বাপজানরা। যত মার খাবা, তার ডাবল চিল্লাবা। লোকে বিশ্বাস করবে না। তবে খানিক থমকাবে। মারের জোর আপুনি কমে যাবে। আর কাঁদাকাটা করলে তুমারও দেখবা লাগবে কম।”
হারানও ইনিয়ে বিনিয়ে চেঁচায়। ততক্ষণে একশ লোক ঘিরে নিয়েছে। প্রথমে যে লোকটা হাত ধরেছিল, তার দাবি সবচেয়ে বেশি। সে একটা মোটা ইলেকট্রিকের কেবল নিয়ে সপাৎ করে বসিয়ে দিল পিঠের আড়াআড়ি। দমটা মনে হল বের হয়ে যাবে। হারান আরও চেঁচাতে লাগল। যাকে পেল তার হাতে পায়ে ধরতে গেল, “হামি কিছু করি নাই ভাই। হামার কথাটা একটুকুন শুনেন। হামি চুরি করি নাই ভাই। উটা হামি হামার সাইকেল ভেব্যাছিলাম।”
“হাঁ রে শালা, তুমার সাইকেল তুমি আপুনি তার মেরে খুলছিলা, না?”
“মার মার। চোখ উপড়ে নে উয়ার।”
“আপনি ছাড়েন ইফতার ভাই। হামি দেখে লিছি।”
“আরে প্যান্টটা খুলো। শালার মেন পয়েন্টে মারো।”
“বাড়ি কতি রে তুর? শালা সব বাংলাদেশের মাল।”
“হাত দুটো ধর। পেটে মার। পেটে মার।”
হারান মনে মনে গুনতে থাকে। আর বড়জোর দশ থেকে বারো মিনিট। তারপরেই মেজোবাবু এসে যাবেন। ততক্ষণ মাথাটা বাঁচাতে হবে। দম ধরে রাখতে হবে। কিন্তু তা করতে করতেই চোখের সামনে অন্ধকার হয়ে আসে। মাথার পেছনে তীব্র যন্ত্রণা। ঘোড়ানিম গাছটার তলায় যে লোহার পাইপগুলো পড়েছিল, মনে হল তা দিয়েই মারল।

 

গায়ে ফুটন্ত জল পড়তে হারানের হুঁশ ফিরে আসে। মুখে নোনতা স্বাদ। হাত পা নাড়াতে গিয়ে বুঝল, ওকে কিছু একটার সাথে পিছমোড়া করে বাঁধা হয়েছে। বুক দিয়ে পিঠ দিয়ে হাত দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। কোনও মতে চোখটুকু খুলে দেখে, যে ছেলেটা উড়ে এসে কোমরে লাথি মেরেছিল, সে প্যান্টের চেনটা নামিয়ে তার গায়ে ছরছর করে পেচ্ছাপ করছে।
সিনেমা হলে কারেন্ট ফিরে এলে পাবলিক যেরকম উল্লাস করে ওঠে, সিটি মারে, ওকে হুঁশে ফিরতে দেখে জড়ো হওয়া লোকজন সেরকম আওয়াজ দিয়ে উঠল। হাততালি সিটি বগলের বাদ্য সব মিলিয়ে যে আওয়াজটা উঠল তাতে আশেপাশের গাছ থেকে পাখপাখালি উড়ে পালাল।
হালচাল দেখে হরেন ব্যোমকে গেল। একে তো মার খেয়ে জ্ঞান হারানো এই প্রথম। তার ওপর গায়ে পেচ্ছাপ করে হুঁশে আনছে! তাছাড়া এতক্ষণ হয়ে গেল, মেজোবাবু তো এলেন না! এতক্ষণে তো এসে যাওয়ার কথা। এতক্ষণে তো হাত তুলে বলার কথা, “আর মারিও না হে। দেখছ না বেহুঁশ হয়্যা গ্যাছে।”
পাবলিক এখন একটু দম নিচ্ছে। যে ছেলেটা গায়ে পেচ্ছাপ করল, সে বীরের সম্মান পাচ্ছে। বুক ফুলিয়ে রেলা নিচ্ছে আর উঁকিঝুঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করছে ভিড়ের মধ্যে কোনও মেয়ে-টেয়ে আছে কিনা। তা মেয়েমানুষ আছে বইকি। তারাও ভিড় করে আছে পাশটাতে। দাঁতে আঁচল চেপে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে আছে। প্রত্যেক আঘাতে ‘ঈশ’ করে উঠছে, কিন্তু নড়ছে না একচুল। নানারকম কথা উড়ছে বাতাসে। ভিড় দেখে এক বাদামওয়ালাও জুটে গেছে। টুকটাক বিক্রি-বাট্টাও হচ্ছে মন্দ না। হারানের ছাতি তেষ্টায় ফেটে যাচ্ছে। মাথার পেছনের আঘাতের জায়গাটা থেকে রক্ত গড়িয়ে কান বেয়ে নামছে। ঘাড়ের কাছটা সুড়সুড় করছে। পায়ের নখ থেঁতলে দিয়েছে। রক্ত আর ধুলোয় মাখামাখি। মুখের সামনে মাছি ভনভন করছে। বাঁ চোখটা এমন ফুলেছে যে খোলাই যাচ্ছে না।
মাথাটা আর একটু পরিষ্কার হতে হরেনের মনে হল, ও একা নয়, ওর সঙ্গে আরও কেউ বাঁধা আছে। বাঁধা আছে তার দিকে পেছন করে। সম্ভবত একই দড়িতে। হারানের কাঁধে তার কাঁধ ঠেকে যাচ্ছে। হাতে হাত। পাছায় পাছা।
নানারকম কথা উড়ছে বাতাসে।
“শালা চামড়া চোর। ভর সকালে তোমার রস উঠেছে না?”
“পাগলিটাও ঢলানি আছে। ডেকেছে আর পেছন পেছন চলে গেছে।”
“আরে ওটার কী বোধ-শোধ কিছু আছে? কেন ডাকছে অত কী বোঝে?”
“শালা পাগল ছাগলকেও ছাড়ে না বে। এগুলান মানুষ!”
“দে শালার ওইটা কেটে। রস ছুটে যাবে।”
এরকম অবস্থায় আগে পড়েনি হারান। তার সাথে একই খুঁটিতে বাঁধা আর একটি আসামি। ডবল মজার লোভে পাবলিক উল্লাসে ফুটছে। বিশেষত দ্বিতীয়টিতে যৌন গন্ধ থাকায় মাঝবয়সিদের ভিড়টা ওদিকেই বেশি। হারান ভাবে আবার হাঁউমাউ শুরু করবে কিনা। তখনই ওপাশের ছেলেটা জোরে ককিয়ে ওঠে একবার। হারানের হাত ছুঁয়ে থাকা হাত দুটো কেঁপে ওঠে থরথর করে। হারান শিউরে ওঠে। মাথায় মারল নাকি? বেহুঁশ হয়ে গেল? মরবে না ঠিক। মানুষ এত সহজে মরে না।
নতুন করে মার শুরু হওয়ায় ভিড়টা ওদিকে হেলে গেল। হারানের দিকে আর সেরকম খেয়াল নেই কারও। হারান দড়িটা টেনেটুনে দেখল কোনওভাবে কিছু করা যায় কিনা। এত লোক ঘিরে আছে, এর মধ্যে পালানোর চিন্তা করাটাই পেটে তলোয়ার ঢুকিয়ে দেওয়ার মতো কাজ। এখন সমস্তটা ছেড়ে দিতে হবে ওদের হাতে। আর অপেক্ষা করতে হবে কখন মারতে মারতে, গায়ের ঝাল মেটাতে মেটাতে ওরা ক্লান্ত হয়ে পড়ে। আর অপেক্ষা করতে হবে, কখন মেজোবাবু আসেন।
হারান প্রাণপণে খুঁজতে থাকে ভিড়ের মধ্যে। মাথা ঘোর হয়ে আসছে, তবু কান দুটো যতটা সম্ভব খাড়া করে রাখে। যদি তাঁর গলা শোনা যায়। এত দেরি তো কখনও করেন না মেজোবাবু। ইসলামপুর ডোমকল রসুলপুর— আরও কোথায় কোথায় যেন, হারানের মনে পড়ে না, গুলিয়ে যায়, মেজোবাবু ঠিক এসে হাজির হয়েছেন। তাকে বাঁচিয়েছেন। যতবার ভেবেছে, মারধোর চুকে গেলে একটু পায়ের ধুলো নেবে, ততবারই উনি হাওয়ায় মিলিয়ে গেছেন যেন। চেহারাটাও ছাই ভালো করে দেখে রাখা হয়নি যে ভিড়ের মধ্যে দেখে চেনা যায়। কখন যে আসবেন!
পেছনে গায়ের সঙ্গে গা লাগিয়ে যে লোকটা বাঁধা আছে সে কি চেনা কেউ? হারান গলা শোনার চেষ্টা করে। হাজার লোকের গলায় সে গলা চাপা পড়ে গেছে। যে হাত-কাঁধ-পাছা তাকে ছুঁয়ে আছে, তা দিয়ে চেনার চেষ্টা করে। অবশ্য এখন চেনা দেওয়াটা আত্মহত্যার শামিল। আর চেনা হবেই বা কী করে? গত কয়েকবছর ধরে হারান বাইরে বাইরে। কাজকর্মের মধ্যে নেই। এখন মনে হচ্ছে পূরণ ঠিকই বলেছিল। পাবলিক আর আগের মতো নেই। মেজোবাবুই বা কখন আসবেন? ওদিকে ছেলেটাকে বোধ হয় মেরেই ফেলল। যা কোনও দিন হয়নি, হারানের এবার ভয় করতে থাকে। প্রচণ্ড ভয়। মেজোবাবু না এলে এদের থামাবে কে? দড়িটা ধরে আরও দু-একবার টানাটানি করে। যেটুকু শক্তি শরীরে ছিল, এতেই ফুরিয়ে যায়। মাথার ভিতরটা আবার ঘোর হয়ে আসে।
মুখভর্তি রক্ত লালা ঘাম আর নড়ে যাওয়া দাঁতের মধ্যে কোনও মতে বিড়বিড় করতে থাকে, “আর মারিয়েন না ভাই। আর মারিয়েন না। উয়ার কথাটা একবার শুনেন। আর মারলে মরে যাবে যে! মরে গেলে কাকে আর মারবেন তখন…”
নিজের গলা হরেনের কানে পৌঁছয় না।

 

খোঁজ

 


 

Mejobabu Asben O Anyanya
A Short Story Collection by Arnab Roy
ISBN 978-81-932146-6-4

Online available at http://sristisukh.com/ss_wp/product/মেজোবাবু-আসবেন-ও-অন্যান্/

প্রথম সংস্করণঃ ডিসেম্বর, ২০১৫
সৃষ্টিসুখ প্রকাশন এলএলপি-র পক্ষে হাল্যান, বাগনান, হাওড়া ৭১১৩১২
থেকে রোহণ কুদ্দুস কর্তৃক প্রকাশিত

© অর্ণব রায়, ২০১৫
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

প্রচ্ছদঃ পার্থপ্রতিম দাস
মূল্যঃ ৯৯ টাকা (ভারতীয় মুদ্রা) / ৯.৯৯ আমেরিকান ডলার

মুদ্রক – সৃষ্টিসুখ প্রিন্ট (www.sristisukhprint.com)
সৃষ্টিসুখ-এর বইয়ের আউটলেট – ৩০এ সীতারাম ঘোষ স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০০০৯
যোগাযোগ – ৯০৫১২ ০০৪৩৭

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *