About Sristisukh Library

Sristisukh Library is a promotional site for the books published by Sristisukh Prokashan, Sristisukh Print, Ha Ja Ba Ra La and Flying Turtle. Readers can read the selected portion of the books in this site for free.

একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা

সায়ন্তন ভট্টাচার্য

 

ভারী সমস্যায় পড়েছেন তারাপদবাবু…
বুকের বাঁ দিকটায় অসম্ভব ব্যথা করছে। সমস্যা সেটা নয়। বুকে ব্যথা তারাপদবাবুর প্রায় গত এক মাস ধরে। রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে ঝাড়া আধঘণ্টা সময় কাটানোর অভ্যেস তাঁর। প্রথমে একটা বিড়ি ধরাবেন, তারপর পায়খানা করবেন, তারপর বসে বসেই একটা মাইক্রো ন্যাপ নেবেন, তারপর চোখে-মুখে জল দিয়ে, দাঁত মেজে, জিভ ছুলে বেরোবেন — এই ছিল রুটিন। একমাস আগের সেদিন সকালেও তারাপদবাবু ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে গেছিলেন। বিড়ি ধরিয়ে পায়খানায় বসে প্রথম খেয়াল হল বুকে কেমন একটা ব্যথা করছে। হতেই পারে, একান্ন বছর বয়েস তারাপদবাবুর। তিনি ঠিক করলেন পরে এক সময় গিন্নিকে ব্যাপারটা বলবেন। দ্বিতীয়বার ব্যথাটা হল বিকেলবেলা। ক্লাস টুয়েলভ-এর ব্যাচটা পড়ানোর সময়। এবার বেশ তীব্রভাবে। যন্ত্রণায় তারাপদবাবুর মুখ কুঁচকে গেল। হাত থেকে অঙ্ক বইটা টপ করে নীচে পড়ে গেল। কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রী “কী হয়েছে স্যার? জ্যেঠিকে ডাকব? জল খাবেন?” ইত্যাদি বলে পড়া ভন্ডুল করার চেষ্টা করল। ঘটনাটা যখন খবর হওয়ার উপক্রম, ব্যথাটা হঠাৎ নিজে থেকেই কমে গেল। তারাপদবাবু এবার ভয় পেলেন। প্রেশার নর্মাল, সুগার নেই, বাত-অর্শ-মানসিক রোগ কিছুই নেই, আচমকা বুকব্যথা কেন? তারাপদবাবু ঠিক করলেন রাতে গিন্নিকে ব্যাপারটা বলবেনই। কিন্তু বয়সের ভারে স্মৃতিলোপের জন্যেই হোক বা স্ত্রী টেনশন করবে বলেই হোক বা একটু বয়েস বাড়ার পর থেকেই বাঙালি পুরুষদের মধ্যে যে ‘রোগ চেপে গিয়ে হিরো হলাম’ জাতীয় দুর্বোধ্য মানসিকতা কাজ করে তার থেকেই হোক, ব্যাপারটা আর বলা হল না। কদিন পর থেকে ব্যথাটা অভ্যেস হয়ে গেল। এই ধরো সকালবেলা তারাপদবাবু অফিস টাইমের বনগাঁ লোকালে উঠে কাঁধের ব্যাগটা শূন্যে ভাসিয়ে ‘দাদা, একটু তুলে দিন তো’ বলে ভিড়ের মধ্যে সেট হচ্ছেন, হঠাৎ চিনচিন। বা বাজারে গিয়ে পোকা বেগুনের মধ্যে থেকে তাজাটা বাছতে গিয়ে চিনচিন। তারাপদবাবু একটু দাঁড়ান, কিছুক্ষণ চোখ বুজে থাকেন আর অপেক্ষা করেন ব্যথাটা চলে যাওয়ার। চলেও যায়। গোলমাল হল গিন্নির কাছে ধরা পড়ে গিয়ে। এই গত সপ্তাহের কথা, রবিবার, ইস্কুল নেই। বিকেলে শুধু একটা ব্যাচ। তারাপদবাবু হেব্বি রোমান্টিক মুডে ছিলেন। সকালটা বেশ ভালো, ফুরফুরে হাওয়া দিচ্ছে। গিন্নি রান্নাঘরে লুচি ভাজছে। তারাপদবাবুর অনেকদিন বাদে আদর পেল। তিনি গুটিগুটি পায়ে রান্নাঘরে ঢুকে পেছন থেকে গিন্নিকে জড়িয়ে ধরতেই শুরু হল ব্যথাটা। এবার চিনচিন নয়। ধুপধাপ করে। তারাপদবাবু যন্ত্রণায় মাটিতে বসে পড়লেন, চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে, নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। অজ্ঞান হওয়ার আগে তিনি শুনলেন গিন্নি ‘বাঁচাও বাঁচাও’ করে চেল্লামেল্লি করছেন। সেদিন বিকেলেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট ঠিক করা হল কার্ডিওলজিস্ট দিবাকর আচার্যের কাছে। সব শুনে দিবাকর আচার্য ইমিডিয়েট একটা চেস্ট এক্স-রে করতে বললেন। পরেরদিন সকালবেলা বগলে পাউডার মেখে তারাপদবাবু গেলেন পাশের পাড়ার ডায়াগোনস্টিক সেন্টারে চেস্ট এক্স-রে করতে। একটা লম্বাটে ঘর। মেঝের উপর একটা স্ট্রেচার রাখা, তার উপর একটা পেল্লায় বড় মেশিন। তারাপদবাবুকে কিন্তু সেখানে শুতে হল না। একটা মুশকো মতো লোক তারাপদবাবুর শার্টটা হুড়মুড় করে খুলে তারাপদবাবুকে দেওয়ালের এক কোনায় ঠেসে দিল। কেমন ভয় ভয় লাগল, এমন পোজে ইংরেজি সিনেমায় জেলের কয়েদিদের গুলি মারা হয়।
“দেখি দাদা, এবার দুহাত দিয়ে কোমরটা ধরুন দেখি।”
“অ্যাঁ!”
“উফ… মুরগির ডানা দেখেছেন? বিহু নাচ? ওই ওরকম।”
তারাপদবাবুর অল্প হাসি পেল। ডাকসাঁইটে অঙ্কের মাস্টার, স্কুলের হেডস্যার অব্দি সমীহ করেন, যিনি পরীক্ষায় গার্ড দিতে ঢুকলে ক্লাসের সেরা টুকলিবাজেরও বুক কাঁপে, মুদির দোকানদার পর্যন্ত ‘সার’ বলে ডাকে, তিনি খালি গায়ে মুরগি সেজে দাঁড়িয়ে আছে।
“আমি থ্রি বললেই নিশ্বাস নেওয়া বন্ধ করে দেবেন ঠিক আছে? রেডি ওয়ান… টু… থ্রি!”

 

“আপনি এর আগে অল্প বয়েসে কখনও বুকের এক্স-রে করাননি না?”
“নাহ।”
“থাকলে ভালো হত।”
“কেন বলুন তো ডাক্তারবাবু? কিছু সিরিয়াস হয়েছে কি?”
“আপনার কার্ডিয়াক ট্রান্সভার্স ডায়ামিটার অসম্ভব বেশি। প্লেটটা দেখুন, নিজেই বুঝতে পারবেন। বাঁ দিকটা ডান দিকের তুলনায় কত বেশি বড়।”
“অল্প বয়েসে এক্স-রে করার কথা কেন বললেন?”
“দেখতাম ব্যাপারটা কনজেনিটাল কিনা। অনেক ক্ষেত্রে ছোটোবেলা থেকেই হার্টের শেপ একটু এদিক-ওদিক হয়, সেটা নর্মাল, কোনও প্রবলেম হওয়ার কথা নয়। যাক গে, আপনি কাল-পরশুর মধ্যে একটা ই সি জি উইথ কালার ডপলার করিয়ে নিন। বারোশ মতো পড়বে বুঝলেন!”
চেম্বার থেকে বেরিয়ে এক বোতল শ্যাম্পু, এক কেজি ময়দা আর এক প্যাকেট চানাচুর কিনে তারাপদবাবু একটা বিড়ি ধরালেন। ভয় লাগছে। কী থেকে কী রোগ বেধে বসল কে জানে। গিন্নিকে বললে উটকো টেনশন করবে। তিনি আবার ডায়াবেটিসের পেশেন্ট। টেনশন করতে ডাক্তারের শক্ত নিষেধ। কিন্তু বলতে তো হবেই। এইসব ভাবতে ভাবতেই বাড়ির দিকে পা বাড়ালেন তারাপদবাবু। রাস্তার এই জায়গাটা খুব অন্ধকার। স্ট্রিট ল্যাম্পটা মান্ধাতার আমল থেকে কানা হয়ে আছে। অল্প ঘাম হচ্ছে তারাপদবাবুর। এখন আর অত হাঁটতে পারেন না, বাঁ পায়ের গোড়ালিতে সারাক্ষণ কেমন খিঁচ ধরে থাকে। কাল আবার সকাল নটায় বনগাঁ লোকাল। পরপর দু পিরিয়ড। তার মধ্যে একটা আবার ক্লাস সিক্স, অসহ্য!
তারাপদবাবুর পাশ দিয়ে হুশ করে সাইকেল চালিয়ে একজোড়া প্রেমিক-প্রেমিকা বেরিয়ে গেল। আজকালকার ছেলেমেয়েগুলো একদম নির্লজ্জ তৈরি হয়েছে। প্রাইভেসির কোনও মা-বাপ নেই, যেখানে সেখানে প্রেম করছে। গুরুজনদের দেখলে যে লজ্জা পাবে, সেই বোধটাই জন্মায়নি এদের। তারাপদবাবু নিজে নিঃসন্তান। থাকলে নিশ্চই এরকমই বেহায়া হত। দেখতে দেখতে অসীমের চপের দোকান এসে গেল। এক কালে গিন্নির সাথে রোজ এখান থেকে আলুর চপ-বেগুনি-সিঙাড়া কিনতেন তারাপদবাবু। গিন্নির বেগুনি খুব প্রিয় ছিল। এখন সুগারের ভয়ে প্রায় গত পাঁচ বছর ঘরে তেলেভাজা ঢোকে না।
ঠিক এই অব্দি ভাবার পরেই তারাপদবাবু অজ্ঞান হয়ে গেলেন। চারপাশ থেকে লোক ছুটে এল। ভিড়ের মধ্যে একজন তারাপদবাবুর চেনা বেরিয়ে গেল। সে আবার মাইক্রোবায়োলজি অনার্স বলে পাড়ার সবাই তাকে মিনি ডাক্তার ভাবে। সে-ই পালস-টালস দেখে সবাইকে বলল, ভদ্রলোক টেঁসে যাননি। তারাপদবাবুর বুক তখন যাচ্ছেতাই ধড়ফড় করছে। কেউ টের পাচ্ছে না। না চারপাশের লোক, না তারাপদবাবু।

“কিছু বুঝতে পারছি না।”
“মানে?”
“ইয়োর হার্ট ইস কমপ্লিটলি নর্মাল। এম মোড, ডপলার এভরিথিং। অ্যাওর্টিক রুট ডায়ামিটার একটু কমের দিকে, বাট সেটা কোনও সমস্যাই নয়!”
“কিন্তু প্রবলেমটা তো হচ্ছে ডাক্তারবাবু! লাস্ট দিন আপনার এখান থেকে বাড়ি ফেরার সময়ও যন্ত্রণায় অজ্ঞান হয়ে গেছিলাম। পাড়ার লোকজন তারপর বাড়ি দিয়ে আসে।”
“এক কাজ করুন, আপনি ইমিডিয়েটলি একটা এল ডি এল-এইচ ডি এল করে নিন। আর এই কয়েকটা ওষুধ দিয়ে দিচ্ছি। ডোন্ট ওরি, সব ঠিক হয়ে যাবে।”
বিরক্ত লাগছে তারাপদবাবুর। ভুলভাল ডাক্তারের পাল্লায় পরেছেন। এর তাল খালি টাকা নেওয়া। প্রথমদিন ডায়াগনস্টিক সেন্টার রেফার করার সাথে সাথেই বোঝা উচিত ছিল। শালা হাতুড়ে অপদার্থ একটা। শুধু টাকা খাওয়া জানে। তারাপদবাবু ডিসাইড করলেন ডাক্তার চেঞ্জ করবেন। অনেক হয়েছে দিবাকর আচার্য। সেদিন স্কুলে দীনেশবাবু একজন কার্ডিওলজিস্টের কথা বলছিলেন। প্রচুর ডিগ্রি। এম ডি, এফ আর সি এস আরও কত কিছু!
বাড়ি ফিরেও মুড ঠিক হল না তারাপদবাবুর। হবেও না সারাদিনে। কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। বাট বলতে হবে, গিন্নি চা নিয়ে মুখের সামনে গ্যাঁট হলেন।
“কী বলল?”
“সব নর্মাল। আমার নাকি কিচ্ছু হয়নি।”
“সে আবার কী কথা!”
“বাজে ডাক্তার। সেদিন দীনেশ একজনের কথা বলছিল, ওদের ওদিকটায় বসে। সামনের শুক্রবার স্কুল থেকে ফেরার সময় ওখান থেকে দেখিয়ে আসব।”
“সে তো আবার গাদা গাদা টেস্ট করতে বলবে।”
“করতে হলে করব। এই ডাক্তার আর না। ব্যাটা এক নম্বরের জোচ্চোর। খালি টাকা খাওয়ার ধান্দা।”
“দেখো, যা ভালো বোঝো। কিন্তু শুনেছিলাম উনি নাকি খুব বিখ্যাত। বিদেশ ফেরত।”
“থামো তো! ঘরকুনো গবেট একটা, দৌড় বলতে পাশের বাড়ি। কোত্থেকে খবর নিয়ে এসেছ বিদেশফেরত।”
“এভাবে কথা বলছ কেন?”
“মাথা গরম করিও না। এমনিতেই মেজাজ চড়ে আছে।”
এরপর প্রায় তিন-চারদিন কোনও প্রবলেম হল না তারাপদবাবুর। নতুন ডাক্তার আবার সব টেস্ট রিপিট করতে দিয়েছে। সে দিক। এবার তারাপদবাবু নিশ্চিন্ত। মানুষ দেখলেই তার বিদ্যে বোঝা যায়। এ ডাক্তার একেবারে খাঁটি সোনা।

 

“ইউ আর অ্যাবসোলিউটলি ফাইন তারাপদবাবু! সুগার, প্রেশার, ব্লাড কাউন্ট, ই সি জি, ডপলার, এল ডি এল-এইচ ডি এল সব নর্মাল। স-অ-অ-ব। হার্টটা একটু বড়, বাট ওটা বোধ হয় জন্মগত। আপনি বেকার দুশ্চিন্তা করছেন।”
“কিন্তু ব্যথাটা…”
“আপনার লাস্ট কবে অ্যাটাক হয়েছে বলুন তো?”
“সে বেশ কয়েকদিন আগে। প্রায় এক সপ্তাহ।”
“হওয়ার কথাও নয়। আপনার কিচ্ছু হয়নি। তাও যদি মানসিক শান্তি চান কিছু প্লাসিবো দিতে পারি। বাড়ি যান তারাপদবাবু, কটা দিন রেস্ট নিন আর এসব উলটোপালটা ভাবা বন্ধ করুন।”
“থ্যাঙ্ক ইউ।”
সেদিন সকাল থেকেই মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছিল। আলিপুর আবহাওয়া দপ্তর থেকে বলেছে নিম্নচাপ। আরও দু-তিনদিন থাকবে। তারাপদবাবু চেম্বার থেকে বেরিয়ে ছাতা খুলে অটোস্ট্যান্ডের দিকে পা বাড়ালেন। রাস্তা কাদায় প্যাচপ্যাচ করছে। মনটা মুষড়ে গেল। ব্যাপারটা হল কী? তবে কি সত্যিই তারাপদবাবুর কিছু হয়নি? সব মনের ভুল? মনের ভুলে কেউ মাঝরাস্তায় অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে! ফেরার পথে ট্রেনে সিট জুটে গেল। ট্রেনটা আজ এমনিও ফাঁকা। একে অফিস টাইম চলে গেছে, তার উপর এমন বৃষ্টি। তারাপদবাবু হাত-পা ছড়িয়ে কোলের উপর সমস্ত রিপোর্টগুলো রাখলেন। বেশিরভাগই দুর্বোধ্য টার্ম। বোঝা যায় শুধু এক্স-রে রিপোর্টটা। কাগজপত্র ঘাঁটতে ঘাঁটতে পুরনো এক্স-রেটাও বেরিয়ে এল। সব এক ফোল্ডারেই রাখা ছিল। যদিও এই ডাক্তার পুরনো কিচ্ছু খুলেও দেখেননি। তারাপদবাবু নতুন আর পুরনো রিপোর্ট দুটো পাশাপাশি রেখে আচমকা কেমন ভেবলে গেলেন। নতুন ছবিতে হার্টটা আরও বড় লাগছে তো! নাহ, আর ভাববেন না। এবার বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। সব মনের ভুল। হয়তো পজিশন এদিক-ওদিক আছে। হয়তো নতুনটা ক্লিক করার সময় নিশ্বাস পড়ে গেছিল। কে জানে!
বাড়ি ফিরেই বাথরুমে ঢুকলেন তারাপদবাবু। সর্বাঙ্গ ভিজে চুপচুপ করছে। বিড়ির প্যাকেটটাতেও অল্প জল ঢুকেছে। তারাপদবাবু উলঙ্গ হয়ে শাওয়ার চালিয়ে বেশ খানিকক্ষণ মাথা ভেজালেন। তারপর একটা বিড়ি ধরিয়ে ভেজা শরীরেই কোমডে বসে পড়লেন। ভীষণ খারাপ লাগছে! ডাক্তার চেঞ্জ করা নিয়ে গিন্নিকে কী কথাই না শুনিয়েছিলেন। এখনও সেই ঝগড়া মেটেনি। অবশ্য এটাকে ঠিক ঝগড়া বলা যায় না। তারাপদবাবুর স্ত্রী অত্যন্ত নিরীহ প্রকৃতির। একদম প্রথম থেকেই। সমস্ত গালিগালাজ মুখ বুজে সহ্য করে যান। তারাপদবাবুর আবার আদর পেল।
“ভগবান… কেন এত খারাপ আমি? এত ভালো বৌটাকে কীভাবে অপমান…”
ধপ! তারাপদবাবু কোমড থেকে এলিয়ে মেঝেতে পড়ে গেলেন। শাওয়ার জমা জলে লাল বিড়ি নিভে গেল। বাথরুমে এখন শুধু বাল্বের গাঢ় কমলা। বাইরে তখনও বৃষ্টি হচ্ছে।

 

প্রায় এক সপ্তাহ পর স্কুল ফিরলেন তারাপদবাবু। সেদিন বাথরুমে পড়ে গিয়ে মাথা ফেটে গেছিল। তারাপদবাবুর গিন্নি আর পাড়ার ছেলে-ছোকরারা মিলে কাছের নার্সিংহোমে ভর্তি করার চার ঘণ্টা পর তাঁর জ্ঞান ফেরে। এক গাদা স্টিচ, স্যালাইন, অক্সিজেন সে এক বিরাট কাণ্ড। গত পরশু ছাড়া পেলেও কাছ থেকে শুঁকলে এখনও বিধ্বস্ত শরীরটা থেকে হাসপাতালের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। তারাপদবাবু বুকে ব্যথার কথা আর বলেননি কাউকে। গিন্নিকেও নয়। এবার সবাই পাগল ভাববে। সবাই জানে সাবান জলে পা পিছলে অ্যাক্সিডেন্ট। কিন্তু সবাই মিথ্যে জানলেও তিনি তো জানেন বুকের ব্যথাটা যে অসম্ভব সত্যি! ঘরে বসে থাকলে সারাক্ষণ এলোমেলো চিন্তা মাথায় ঘুরঘুর করছে, প্রাইভেট টিউশন বহুদিন লাটে, গিন্নি সামনে এলে ক্রমাগত বুক চিনচিন করে যাচ্ছে। শেষমেশ একরকম বাড়িতে ঝামেলা করেই তিনি স্কুল এলেন আজ।
ফার্স্ট পিরিওড সেই সিক্স। ছোটো ক্লাসগুলো পড়াতে বিরক্ত লাগে। ক্লাসের পড়ানো তো কেউ শোনেই না, উলটে ব্যাক বেঞ্চারগুলো রাজ্যের মিচকেমি করে। ওই ক্লাসে তন্ময় বলে একটা বাঁদর আছে যে তারাপদবাবুর নিক নেম দিয়েছে ‘হিটলার’। অন্যান্য দিন ওই ক্লাসটার কথা ভাবলেই মুড অফ হয়ে যায় তারাপদবাবুর। কিন্তু আজ হচ্ছে না। ঘরে বসে থাকার চেয়ে বাঁদরের অত্যাচার হজম করাও অনেক ভালো।
“তোদের লাস্ট কোন চ্যাপ্টার পড়িয়েছিলাম?”
ফার্স্ট বেঞ্চের সবাই একত্রে বলে উঠল, “সমকোণী ত্রিভুজ।”
“আচ্ছা। আজ ধরব ত্রিভুজের বাহুর উপর নির্ভর করে শ্রেণিবিভাগ। বাহুর উপর নির্ভর করে ত্রিভুজ তিন ধরনের হয়। সমবাহু, সমদ্বিবাহু আর বিষমবাহু ত্রিভুজ।”
তারাপদবাবু চক হাতে ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে এগিয়ে এলেন।
“প্রথমে সমবাহু ত্রিভুজ। নাম থেকেই বুঝতে পারছিস এই ত্রিভুজের তিনটে বাহুই সমান হয়। আর যে কোনও সমবাহু ত্রিভুজের প্রত্যেকটা কোণের মান হয়…”
কোনও এক টিউশনে এক চ্যাপ্টার এগিয়ে যাওয়া অত্যুৎসাহী ছাত্র চেঁচিয়ে উঠল, “ষাট ডিগ্রি।”
“রাইট। এই ধর একটা ত্রিভুজ, যার তিনটে শীর্ষবিন্দু এ বি আর সি। এবার এই এ-বি-সি ত্রিভুজের বাহু তিনটে যতই বাড়ানো হোক না কেন, তার ভেতরের কোণ তিনটে সবসময় ষাট ডিগ্রি হয়।”
তারাপদবাবু হঠাৎ থতমত খেয়ে গেলেন। তারপর অ্যাটেনডেন্স রেজিস্ট্রার বগলে নিয়ে দুদ্দাড় করে ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। বাড়ি ফিরতে হবে। এক্ষুনি বাড়ি ফিরতে হবে।
ভারী সমস্যায় পড়েছেন তিনি…

 

ভর দুপুরে তারাপদবাবুকে ফিরতে দেখে গিন্নি চমকে উঠল।
“কী গো কী হয়েছে? তাড়াতাড়ি চলে এলে যে! শরীর ঠিক আছে তো?”
“আগে এক গ্লাস জল দাও।”
“কী হয়েছে তোমার? এত ঘামছ কেন?”
“আগে জলটা দাও, সব বলছি।”
জলের বোতল নিয়ে তারাপদবাবুর সামনে যখন গিন্নি এসে দাঁড়াল, তাঁর মুখটা তখন অদ্ভুত লাগছে। অনেকটা নাইন-টেনের বায়োলজি বইতে জড়বুদ্ধিসম্পন্ন শিশুর উদাহরণে যেমন মুখের স্কেচ থাকে, সেরকম।
“আমাদের এক্ষুনি ডিভোর্স করতে হবে।”
“মানে!”
“আমি বুঝতে পেরেছি কী হয়েছে আমার।”
“কী হয়েছে তোমার?”
“আমার হৃদপিণ্ডে প্রয়োজনের বেশি ভালোবাসা ঢুকে যাচ্ছে। একটা সমবাহু ত্রিভুজের মতো। সব রিপোর্ট বলছে এবিসি, সব কোণ ষাট ডিগ্রি, কিন্তু সাইজ তো বেড়ে যাচ্ছে! আমার এক্স-রে রিপোর্ট দুটো দেখো, নতুনটার সাইজ পুরনোটার চেয়ে বড়।”
গিন্নির মুখটা দেখার মতো হল। তারাপদবাবু বলে চললেন, “খেয়াল করে দেখো, যেদিন তোমার সাথে আমার অমন ঝগড়া হল, তার পর কয়েকদিন একটুও অসুবিধে হয়নি। সেদিন বাড়ি ফিরে তোমার জন্যে মন খারাপ করছিলাম, সাথে সাথে অ্যাটাক হল। আমি সাবানে পিছলে পড়িনি গো, আমার আবার বুকে ব্যথা করছিল তখন! তারপর আজ ফেরার সময় গোটা পথ ভাবতে ভাবতে এলাম, আমার যতবার অ্যাকসিডেন্টগুলো হয়েছে ঠিক তার আগের মুহূর্তে আমি তোমার কথা ভাবছিলাম।”
গলা শুকিয়ে গেছিল। তারাপদবাবু আবার বোতল খুলে ঢকঢক করে জল খেলেন।
“জানি আমায় পাগল ভাবছ, কিন্তু এটাই ঘটনা। আমি তোমার থেকে দূরে না গেলে এটা বাড়তেই থাকবে। আমি মারা যাব।”
গিন্নি এবার কান্নায় ভেঙে পড়ল।
“তোমার কী হয়েছে? কী বলছ এসব? তুমি কি কারো প্রেমে পড়েছ?”
“বাজে কথা না বলে মন শক্ত করো। ভুলে যাও আমায়। আমিও ভুলে যাব।”
গিন্নি এবার তারাপদবাবুকে জড়িয়ে ধরল। তারাপদবাবুর শার্টের উপরের দিকের দুটো বোতাম ছিঁড়ে গেল। “আমায় ফেলে যেও না প্লিজ! আমার তুমি ছাড়া কেউ নেই। আমি পাগল হয়ে যাব সোনা।”
বুকে চিনচিনে ব্যথা শুরু হচ্ছে আবার। তারাপদবাবু জাপটে ধরলেন তাঁর স্ত্রীকে। তারপর কান্নায় ভেঙে পড়লেন। চিনচিনে ব্যথাটা মারাত্মক দ্রুত লয়ে বাড়ছে। পাঁজরে অসম্ভব চাপ লাগছে। শিরাগুলো ফুলে ঢোল হয়ে যাচ্ছে। কুলকুল করে ঘাম হচ্ছে।
“কতদিন পরে সোনা বললে…”

দুম!

 


 

Jara Niyam Bhalobase
A Short Story Collection by Sayantan Bhattacharya
ISBN 978-1-63535-107-1

Online available at http://sristisukh.com/ss_wp/product/যারা-নিয়ম-ভালোবাসে/

প্রথম সংস্করণ – ডিসেম্বর, ২০১৬
সৃষ্টিসুখ প্রকাশন এলএলপি-র পক্ষে হাল্যান, বাগনান, হাওড়া ৭১১৩১২
থেকে রোহণ কুদ্দুস কর্তৃক প্রকাশিত

প্রচ্ছদ – রোহণ কুদ্দুস (Francesco Tortorella-র Sleepless অনুসরণে)

© সায়ন্তন ভট্টাচার্য, ২০১৬
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

মূল্য – ১২৫ টাকা (ভারতীয় মুদ্রা) / ৯.৯৯ আমেরিকান ডলার

মুদ্রক – সৃষ্টিসুখ প্রিন্ট (www.sristisukhprint.com)
সৃষ্টিসুখ-এর বইয়ের আউটলেট – ৩০এ সীতারাম ঘোষ স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০০০৯
যোগাযোগ – ৯০৫১২ ০০৪৩৭

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *