কৌশিক চক্রবর্তীর উপন্যাস “অন্তহীন বেদনাঋতু” ‘সৃষ্টিসুখ প্রকাশনী’ থেকে সংগ্রহ করেছিলাম বেশ কয়েকদিন আগে। প্রথমবার পড়লাম। কিছুটা ঘোর, কিছু প্রশ্নের বিড়ম্বনা, ও একটা অতৃপ্তি কাজ করল। এই ধরনের উপন্যাস খুব একটা পড়েছি বলে মনে করতে পারলাম না। ধরনটাই নতুন, স্বাদও ভিন্ন, প্রকরণ আলাদা। বইটা প্রায় দু-সপ্তাহ রেখে দিলাম। আবার পড়া শুরু করে ভাবতে ভাবতে এগোলাম ও শেষ করলাম। এবারে কিছু প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হলো। প্রশ্ন আগের চেয়ে অনেক কমে এল। আর কিছু মনে হওয়া জন্মালো। এরই প্রেক্ষিতে এই সামান্যটুকু। না, এ-কোনো আলোচনা-সমালোচনা নয়, নয় কোনো রিভিউ। প্রতিবেদনটি তিনটি ভাগে বিন্যস্ত করে (যেমন লিখলাম) উপস্থাপিত করছি।
প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া
ক) ভালো লেগেছে। এক ভিন্নধরনের ভালোলাগা, সবটা যার কথা বলায় প্রকাশ করা যায় না। খ) বলার ঢং কাব্যিক। প্রায় গোটা উপন্যাসটাই। গ) বলার ভাষাও যথেষ্ট কাব্যিক। মাঝেমধ্যে মনে হচ্ছিল যেন টানা গদ্যে কবিতাই পড়ছি। আবার তার কেটেও যাচ্ছিল বিভিন্ন জাম্পকাটে ঘ) একটা ঘোর তৈরি করে দ্যায়। একটা মন কেমন করা। ঙ) এই ধরনের উপন্যাস আগে খুব একটা পড়িনি। বাংলাভাষায় বিভিন্ন ধরনের উপন্যাস লেখা হয়েছে ও হচ্ছে। এর মননশীলতা ও স্বাদ যথার্থই ভিন্ন। চ) ঘটনা-কার্যক্রম-ইতিহাস-কাহিনি নেই বললেই চলে। আছে উপর্যুপরী ভাবনাসকল। স্বপ্নাবেশ। ন্যারেটিভ। যে কাহিনির ছোপটি পেছনে কাজ করছে, তা তিন-চার লাইনেই সমাপ্ত হয়ে যাবে। ছ) উপন্যাসের চরিত্র হয়তো কিছু আছে, কিন্তু মুখ্য চরিত্রের চিন্তা-ভাবনা, স্বপ্ন স্বপ্নভঙ্গ, শেষে প্রত্যয় ইত্যাদিই প্রধান। কিন্তু সেই চরিত্র ও পারিপার্শিক চরিত্র চিত্রণ সম্পূর্ণ মনোজগতের। তাদের ঘটনা বা কার্যাবলীর মাধ্যমে উদ্ঘাটিত করা নয়। তাদের মনস্তাত্ত্বিক জায়গাগুলোই উপন্যাস সৃষ্টি করেছে। জ) অস্তিত্ব-অনস্তিত্বের প্রশ্নে অনস্তিত্বকেই খাড়া করে তুলে ধরার প্রয়াস না-থাকলেও, জীবনের অর্থহীনতার কথা বারবার প্রকাশ পেয়েছে। যদিও অস্তিত্বের একটা বিশ্বময়তাও লক্ষনীয়। শেষে অর্থহীনতার মধ্যেও অর্থময়তাকে আবিষ্কারের একটা প্রচেষ্টা রয়েছে। ঝ) জীবন বিষাদময় ঠিকই, সেই বিষাদের আঁচ আছে ছত্রে ছত্রে, একটা ক্ষুদ্র বাসনা/স্বপ্ন না-পূরণের যন্ত্রণা এবং তদ্জনিত বিষাদময়তা ছেয়ে আছে উ্পন্যাস। চাওয়া ও পাওয়ার মধ্যে অন্তরটুকু পীড়া ও ভয়ের বা নিরাপত্তাহীনতার উৎপাদন বাড়িয়েছে ঞ) ‘অভি’ ও ‘আমি’ এই দুই চরিত্র একই, আমার হিসেবে, উপস্থাপনার গুণে ও প্রেক্ষিতে। বা বলা চলে সম্পূরক। এখানেও কিছুটা নতুনত্ব দেখতে পাই। বাকি চরিত্রগুলোও র্যালার মধ্যে এক ধরনের বিষাদাক্রান্ত, এবং তারাও যেন একক এক মহাচরিত্রের অংশমাত্র। ট) ভাবনা ও স্বপ্ন দৃশ্যে তথা কল্পে বা কার্যক্রমে ফ্যান্টাসি তৈরি করা হয়েছে, নানাভাবে, নানান অনুষঙ্গে ঠ) সবমিলিয়ে নাগরিক জীবনের কিছু মানুষ নিজের সঙ্গে আক্ষরিক অর্থে এই উপন্যাসের অবস্থান ও ভাবনাগত মিল খুঁজে পাবেন।
কিছু ব্যক্তি–প্রশ্ন
ক) এ-কে আমি উপন্যাস বলব কেন? এ-তো একটা সন্দর্ভ। অর্থাৎ বলতে চাইছি “টেক্সট” না-বলে নভেল কেন বলব? খ) এর ভাষা এত কাব্যিক কেন? গদ্যের ভাষা কি কবিতার ভাষা থেকে এক স্বতন্ত্র ভাষাগুণ সমন্বিত হওয়া উচিৎ নয়? একজন কবি উপন্যাস লিখছেন বলেই কি তাঁর গদ্যের ভাষার সঙ্গে কবিতার ভাষার পার্থক্য থাকবে না? গ) এত, মতো, মতন, যেন (প্রায় প্রতি পদে) কেন? এতে কি একটা একমুখী ঘোর তৈরি হয় না? এমনকি একটা সুররিয়ালিস্টিক অ্যাপ্রোচ? ঘ) কাহিনির বিস্তৃতি সেভাবে নাই থাকতে পারে, কিন্তু চরিত্র সৃষ্টি করলে, সেই চরিত্রের শুধুই ভাবনারাজি ও অতৃপ্তিরই প্রকাশ থাকবে, সেই ভাবনানুসারী সেভাবে কিছু ঘটনাবলী বা কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা থাকবে না? থাকলেও তা যথেষ্ট কি? ঙ) কিছু পরিচ্ছেদ আছে (দু-তিনটে) যার সঙ্গে এই উপন্যাসের(?) কোনো যোগসূত্র সেভাবে আছে কি? যে কোনো প্রাজ্ঞ ব্যক্তির মতো এইসব ভাবনাসকল ও মতামত নিয়ে ঔপন্যাসিক নিজেই কি নেমে পড়লেন না আসরে? এসব প্রশ্নগুলো আমার মনে জেগেছে। আমার মনে হওয়া দিয়ে নিজের মতো করে উত্তরগুলি খুঁজেছি, যা উপন্যাসকারের সচেতন প্রয়োগভাবনার সঙ্গে সম্পূর্ণ মিলতে নাও পারে, বা অন্য পাঠকের ভাবনার সঙ্গেও। ফলে আমার ভাবনা ব্যক্তিভাবনার সম্ভবনাসমূহমাত্র।
আমার মনে হওয়া
ক) কোনো বিশেষ চলমান ঘটনাক্রম ছাড়া এ এক মানসভ্রমণ, যেখানে জীবনের অর্থময়তা খানখান করে ভাঙা হয়েছে এবং এক বিষাদময় জীবনের গান গাওয়া হয়েছে। সুতরাং জীবনপ্রবাহের কথাকে কথাসাহিত্যই ধরা উচিৎ। উপন্যাসের তথাকথিত ধাঁচাটিকে ভাঙা হয়েছে মনস্তাত্বিক অবস্থানসমূহকে প্রাধান্য দিয়ে। খ) উপন্যাসের ভাষা কাব্যিক হতে পারবে না, বা গদ্যের ভাষাবয়নকেই পাথেয় করতে হবে, এমন ফরমান যদি থেকেও থাকে, তবে তাকে অস্বীকার করার মধ্যেই উপন্যাসকার এক নতুন বার্তা দিতে চেয়েছেন সচেতনভাবে। হয়তো সীমারেখা ভেঙে ফেলাতেই এই উপন্যাসের ভাষা কাব্যিক হয়েও এক বিশেষ মাত্রা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। পড়ার সুখকে অস্বীকার করা যায় না। গ) ‘অভী’ বা ‘আমি’ বা ‘অন্যরা’ এই উপন্যাসে সর্বদাই নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা। প্রত্যয় সেভাবে নাই এইসব চরিত্রে। জীবনের অর্থহীনতার মধ্যে অস্তিত্বের সংশয় তাদের ঘিরে রাখে। তাদের ভাবনা ও দেখার মধ্যেও সেই ছাপ। প্রকৃতর চেয়ে আপাতর ভিন্ন ভিন্ন রূপ, অবস্থান, ঘোর ইত্যাদিতে তারা তাদের দ্যাখা ও চিন্তনকে এককভাবে আইডেন্টিফাই করতে পারে না। সম্ভবত তাই তাদের দ্যাখাকে, তাদের অবস্থানকে, নানাভাবে ব্যাখাত করতে হয়। আসে মতো, মতন, যেন ইত্যাদিরা। তাদের মনে হয় কিছুটা হলেও প্রকাশ করা গেল, এই তুলনা সাযুয্য ইত্যাদি তুলে এনে। স্বাভাবিকভাবেই এই ধরনের ব্যক্ততা একটা ঘোর সৃষ্টি করে। হয়তো তা কিছুটা একমুখীন এবং সুররিয়ালিস্টিক, কিন্তু উপন্যাসকার সেটা রাখতেই চান সচেতনভাবে। ঘ) এই উপন্যাসে তথাকথিত কোনো কাহিনিমালা নেই। যা আছে, তা তিন লাইনেই সমাপ্য। যেমন— অভী, এক যুবকের ছোট্ট একটা স্বপ্ন— বারান্দাওয়ালা একটা ঘর, যেখান থেকে আকাশের তারা দ্যাখা যায়। সেই স্বপ্নের আশায় বেঁচে, যুগল (স্ত্রী, নিরু) তাদের ভ্রূণ-স্বপ্নকেই খুন করেছিল চার বছর আগে, জাস্ট লালনপালন ঠিকভাবে করতে পারবে না এই আশংকায়। যা থেকে ভয় এবং পালিয়ে বেড়ানো। কার্যত অভী, জীবনযুদ্ধে প্রায় পরাজিত সাবানগুঁড়োর সেলসম্যান। কায়ক্লেশে বাঁচে ও বিষাদগ্রস্ত। প্রাত্যহিক জীবনে কোনো পরিবর্তন না এলেও, স্বপ্ন অধরা থাকলেও, চারবছর পর তাদের বাঁচার ইচ্ছে জাগে নয়া গর্ভধারণের প্রেক্ষিতে। একটা প্রত্যয়ও কাজ করতে থাকে। কাহিনি বলতে এই-ই। এখন স্বপ্ন না-মেটা ও স্বপ্ন খুন করায় যে বাস্তবতাটুকু থাকে, তা বিশাল পৃথিবীতে নিজেকে আপনমনে বেমানান করে রাখার সামিল। সেখানে মনস্তাত্বিক যে অবস্থানগুলো পীড়িত করে, ভয়ার্ত করে, ফেরার করে রাখতে চায়, জীবনবিমুখ করে, বিষাদময়তায় ঠেলে দ্যায় তাকেই প্রায় বাধ্যত উপন্যাসকার তুলে আনেন। ফলে ঘটনার ঘনঘটা নয়, মনোজগতের আলোড়নই প্রাধান্য পেয়ে যায়। ঙ) অস্তিত্ব ও অনস্তিত্বের মাঝখানে যেভাবে জীবনের অর্থহীনতাকে প্রাধান্য দিয়ে অগ্রসরমান করা হয়েছে উপন্যাসে, তাতে একটা কালখণ্ড এক বিশাল কালখণ্ডের অংশমাত্র। আবার অস্তিত্ব অনস্তিত্বের প্রশ্নে ‘অভী’, ‘আমি’, ‘অন্যরা’, এমনকি ‘লেখক স্বয়ং’-ও একই চরিত্রভাবনার অংশীদার। প্রত্যেকের ক্ষুদ্র জীবনপ্রণালী যেন এক মহাজীবনের অংশ। তাই এরা প্রায় ভেদহীন। তাই লেখক স্বয়ং উপন্যাসে ঢুকলেন কি ঢুকলেন না, তা আর ম্যাটার করে না। কারণ অভী বা আমি ভাবলেও সেভাবেই ভাবত। চ) এই অর্থহীনতা ও বিষাদময়তা থেকে পরিত্রাণের কথা ভাবা হয়েছে একদম শেষে গিয়ে, নতুন করে বাঁচতে চাওয়ায়, পুনরায় নিরুর গর্ভধারণে, যা ইঙ্গিতময়। অসম্ভব কিছু নয়। বিচিত্র মানবজীবন সবসময় সবকিছু যুক্তি অনুসারে চলে না। এই বিচিত্রতা না-থাকলে মানুষ বাঁচতেও পারে না। হয়তো চার বছরের এই ফেরার-জীবনের অভিজ্ঞতাই তাকে আবার বাঁচার স্বপ্নে আশ্বস্ত করে। চ) কিছু পরিচ্ছেদে যেভাবে কলকাতা মহানগরীকে এবং তার নাগরিক জীবনকে তুলে ধরা হয়েছে তার নিজস্বতাসহ তা বাহবা কুড়োবার যোগ্য। ছ) সবমিলিয়ে দীর্ঘদিন মনে থাকবে এই উপন্যাসটা যার নাম ‘অন্তহীন বেদনাঋতু’। পাঠক পড়লে, যা হয়তো সার্থক হবে।
অন্তহীন বেদনাঋতু/ কৌশিক চক্রবর্তী/ সৃষ্টিসুখ প্রকাশনী/ ১৬০ টাকা।
]]>

সাপ্তাহিক বর্তমান পত্রিকায় প্রকাশিত তিনটি বইয়ের আলোচনা।

নির্মল ধরের ‘উর্বশীদের দিনরাত্রি’ নিয়ে প্রকাশিত দুটি প্রতিবেদন। ‘সংবাদ প্রতিদিন’ ও ‘এই সময়’ দৈনিকে।

বইমেলার প্রাক্কালে ‘এই সময়’ দৈনিকে সৃষ্টিসুখ-এর তিনটি বইয়ের কথা-

গৌরী ধর্মপালের ‘নির্বাচিত কবিতা’ প্রকাশ উপলক্ষে ‘সংবাদ প্রতিদিন’-এর মতামতঃ

ঈশা দেব পালের সম্পাদনায় ‘প্রমীলা পুরাণ’ নিয়ে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে প্রকাশিত রিভিউঃ

মণিমেখলা মাইতির ‘রোজনামচা’ নিয়ে সুখবর দৈনিকে প্রদীপ আচার্যের আলোচনা –

সরিতা আহমেদের ভেবলির ডায়রি নিয়ে লিখল ‘সাপ্তাহিক বর্তমান’।

অর্পণ পালের এবং আইনস্টাইন’ বইটির আলোচনা ‘আবাপ স্কুলে’। আলোচনা করলেন কৌশিক মজুমদার।

উত্তরবঙ্গ সংবাদ-এ শাঁওলি দে-র ‘বৃষ্টিফোঁটার মতো’ বইটির আলোচনা।

লেখকের লেখনীর সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল ‘হোমসনামা ’ দিয়ে । তাতেই এমন মজে গেছি যে তারপর থেকে একদম পারলে কড়াই থেকে ছো মেরে গরম চপ খাচ্ছি তাড়িয়ে তাড়িয়ে । গেলো শনিবার সৃষ্টি সুখের সাহিত্য উৎসবে গিয়ে একদম ফ্রেশ ফার্স্ট কপিটা সংগ্রহ করেছিলাম ‘কুড়িয়ে বাড়িয়ে’র উপরি পাওনা ছিল লেখকের সাক্ষর । রবিবার থেকে পড়া শুরু করে আজ এই ঘন্টাখানেক আগে শেষ করলুম । সাধের লেখকের সাধের বই পড়ে বৈরাগী হয়ে তাই সদ্য সদ্য পাঠ প্রতিক্রিয়া লিখতে বসেছি ।…
১) গবেষণা ধর্মী ৫০ টি প্রবন্ধ রয়েছে এই বইতে যেগুলোর মধ্যে অন্তর্বর্তী কোনও সম্পর্ক নেই (আক্ষরিক অর্থেই কুড়িয়ে বাড়িয়ে ) তাই এ বই শেষ থেকে শুরু করে প্রথম অবধিও পড়া যেতে পারে । পাঠক ইচ্ছে করলে শিবরামের মতন মাঝখান থেকে শুরু করে সমান্তরাল ভাবে শুরু ও শেষের দিকে এগোতে পারেন, কোনও অসুবিধে নেই ।
২) পঞ্চাশটি ভিন্ন প্রবন্ধ পরে পাঠক বন্ধুরা বিষয় বস্তুর স্বাদ আস্বাদন করতে পারেন তবে বিশেষ কোনও বিষয়ে পণ্ডিত হওয়ার জন্য এই বই নয় । এ বই সবার জন্য । সীমিত সংখ্যক তথ্য সুচারু ভাবে পরিবেশন করেছেন লেখক ।
৩) বইটির অনবদ্য প্রচ্ছদ বানিয়েছেন প্রখ্যাত শিল্পী দেবাশীষ দেব , প্রচ্ছদটিই যথেষ্ট যেন পাঠকের পাঠ পূর্বক অ্যাড্রিনালিন রাশ ঘটানোর জন্য। আর হ্যাঁ, বইটি যে বয়েস নির্বিশেষে সকলের পাঠ যোগ্য তারও যেন আভাষ পাওয়া যায় প্রচ্ছদ দেখেই।
৪) লেখকের লেখনীর গুনে তথ্য সমৃদ্ধ লেখাও যে সুখপাঠ্য হতে পারে সে পরিচয় আমি আগেও পেয়েছি কৌশিক বাবুর লেখা পরে । এ বই তার ব্যতিক্রম নয় । কলমের গুণে তথ্য নির্ভর ছোট ছোট প্রবন্ধ গুলি যেন জীবন্ত হয়ে এ বইকে আনপুটডাউনেবেল করে তুলেছে ।
৫) বইয়ের নাম যতই কুড়িয়ে বাড়িয়ে হোক প্রবন্ধের সংকলন কিন্তু লেখক করেছেন অত্যন্ত যত্ন নিয়ে। প্রতিটি প্রবন্ধই মন ছুঁয়ে যায়। আরও বেশি জানার খিদেটা বাড়িয়ে তোলে।
৬) লেখার সাথে সাথে রয়েছি ছবি ও তথ্য সূত্র যাতে পাঠকের বিষয় সম্বন্ধে আরও গভীরে জ্ঞানার্জনের ইচ্ছে হলে নিদেনপক্ষে শুরুটা কোথা থেকে করবেন সে ব্যাপারে কোনও সমস্যার সম্মুখীন হতে না হয় ।
৭) ছোটবেলায় যারা আনন্দমেলা পড়তেন তাদের মনে থাকা উচিত আনন্দমেলায় ছোট ছোট অনুচ্ছেদে একসময় দেশবিদেশের নানা অজানা নতুন খবর থাকতো । মার্জিত ভাষার গুণে এ বই পরে অনেক দিনের হারানো সেই স্বাদটা আস্বাদনের মজা পেলাম ।’
অপর মনযোগী পাঠক স্বর্ণপালি মাইতি জানিয়েছিলেন, ‘সত্যজিৎ রায় কে তো আপনি হরলিক্সের ন্যায় গুলে খেয়েছেন। এই বইয়ের মজা হল যেখান থেকে খুশি পড়া শুরু করা যেতে পারে। টুকরো টুকরো জ্ঞানের ভান্ডার৷ আপনার লেখনির গুণে যতগুলি প্রবন্ধ পড়লাম, সব কটি সুখপাঠ্য। দেবাশীষ দেবের প্রচ্ছদ আর তার মধ্যে বেড়াল টাকে দেখতে পেয়ে যার-পর-নাই খুশী হলুম।
পরিশেষে বলি,বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এত পড়াশুনো এক জন্মে করতে পারলেই জন্ম সার্থক হয়ে যায় মানুষের। আপনি লিখতে থাকুন। লেখনী আরো সমৃদ্ধ হোক। আর আমরা সে সব পড়ে আনন্দে থাকি।’
শুভ আইচ সরকার লিখলেন – ‘ জ্ঞানের আড়ৎ এই বই টা। যারা ক্যুইজ করেন, তাদের জন্য লাইনে লাইনে রসদ। কোনদিক বাদ দেন নি লেখক, সিনেমা, সাহিত্য, বিজ্ঞান কি নেই এই বই তে। এবং সংক্ষিপ্ত না, বরং কিছু ক্ষেত্রে বেশ বিস্তারিতই আছে বলে মনে হয়েছে। ননফিকশন ঘরানার এমন বই বিগত কয়েক বছরে বাংলাতে বেরিয়েছে বলে মনে পরছে না। (লেখকের আগের বই গুলো যারা পড়েছেন, তারা হয়ত একমত হবেন যে ননফিকশনের এই ঘরানায় এই মুহুর্তে তিনিই সেরা।) তার উপরে পাতায় পাতায় ছবি আপনাকে বই এর সাথে ধরে রাখবে। লেখার স্বচ্ছলতা আর সাথে ঝা চকচকে পৃষ্ঠা ও ছাপা অন্য মাত্রা দেয়। ব্যক্তিগত ভাবে আমি এইরকম লেখার অনুরাগী তাই আমার খুব ভাল লেগেছে, তাই বলছি যারা এখনও ভাবছেন তারা কিনে ফেলুন।’
দেবলীনা দাস জানিয়েছেন, ‘”কুড়িয়ে বাড়িয়ে” আমার পড়া কৌশিক মজুমদারের তৃতীয় বই। ঠিক এর আগের বই ‘তোপসের নোটবুক’ পড়ে এতো অসাধারণ লেগেছিল যে এই বইটা অর্ডার দিতে দেরি করিনি। পুরো বইটা পড়ে জাস্ট ব্যোমকে গেছি। শুরুতেই সিনেমার ইতিহাস নিয়ে লেখা প্রবন্ধ গুলো সমসাময়িক বাংলা প্রবন্ধের মধ্যে অন্যতম হয়ে থাকবে। বিশেষ করে “এক দৃশ্যের জন্ম” এবং “বাংলা ছায়াছবির নির্বাক নায়িকারা” বাংলা সিনেমার ইতিহাস রচনায় অন্যতম মাইলস্টোন হয়ে থাকবেই। কমিকস নিয়ে লেখকের আগেও লেখা পড়েছি কিন্তু কমিকসের স্রষ্টাদের নিয়ে এই লেখা আগের সব লেখাকে যেন ছাপিয়ে গেছে। সাহিত্য বিভাগে “জুল ভাৰ্ণ” আরেকটি মাস্টারপিস এই বইয়ের। তবে সমালোচনা করতেই হয় বলে বলা “কিং আর্থার” প্রবন্ধটির মধ্যে লেখকের পূর্ববর্তী বই “হোমসনামা” বেশ কিছু অংশ পাওয়া যায়। আমি আদৌ সাহিত্য সমালোচক নই। তবে এমন বইটি হাতে পেয়ে কয়েকটা কথা লেখার লোভ সামলাতে পারলাম না।’
এখন আপনি, কী বলছেন?

এই আশীর্বাদ মাথা পেতে নিল ‘সৃষ্টিসুখ’। তাঁকে প্রণাম।
আগ্রহীদের জন্য থাকল মহারাজের করা নিউটনের উপর লেখা প্রবন্ধটির অনুবাদ।
——————
A glimmer of life
A small town in Lincolnshire, England, named Grantham.
From there, a remote village of Woolsthorpe, about six-seven miles west.
Most of the people in that village were illiterate and almost every family’s livelihood was agriculture.
Newton was born in an uneducated farmer’s house. Isaac’s father had a farm in the village. Farming would have earned fairly well. Father died three months before Newton’s birth Naturally, all the responsibilities of bringing up Newton came to her mother. Newton’s mother would have to handle all the tasks alone – home affairs, care of the child, farm work, crop sales.
When Newton was three years old, a deep crisis came down in his family. Newton’s mother again got married. Newton’s mother Hannah married to Smith, an elderly, wealthy and religious leader of a village several miles away from Woolsthorpe.
Before marriage, Smith gave his would-be wife, Newton’s mother, some conditions. Among them, Smith will be responsible for Newton’s support. In addition, maintenance of Newton’s late father’s farmhouse and homestead, whatever needs to do will be done by Smith. Hannah and Smith will have no rights at any income related to the accumulated money and cultivation of Newton’s late father.
However, soon Newton’s mother got married and after the marriage, Newton’s mother went to the second husband’s house, in the remote village. After the marriage, Newton’s Step-father objected to the fact that he will be not be taken with them.
Then began the extreme crisis in the child’s life of Newton
Since his knowledge, he could not see his father. In this vacancy will have to leave his mother again. With such a great helplessness, frustration, anguish and extreme experience of pain, Newton’s other childhood began.
After Mom left, little Newton had to go to his grandmother. In the custody of the grandmother he grown a little. Due to being a little older, she admitted Newton to the primary school. Newton started studying.
The pain and neglect of childhood experience had a great effect on the young Newtons sentiment. From his childhood, mother’s affection and loveless Newton became very quiet. There was no one; alone, except friends, and the atmosphere became natural. There was nothing in the motivation. Solitary and lonely life was Newton’s daily companion.
In this way, Newton continued to grow bigger in the Woolsthorpe farmhouse with his grandmother. Newton was very interested in any kind of equipment since then. He was able to open the small machinery ans equipment, even the lock, etc., by looking at them with deep motive.
By doing these things, Newton himself learns to create a variety of sophisticated models.
Collection:
Poor farmars son became Lucasian professor of mathematics
Article compilation of Siddharth Majumdar

সহজ করে বলি।
১ — সৃষ্টিসুখ-এর সাইট থেকে আপনার মাসিক গ্রাহকচাঁদা কিনুন।
২ — নিজের নাম ও মেল আইডি রেজিস্টার করুন।
৩ — সাইটে লগইন করে নিচে দেওয়া ই-লাইব্রেরির লিংক থেকে বই পড়তে থাকুন।
৪ — কোনও সমস্যায় মেল করুন sristisukhprokashan@gmail.com-এ।
৫ — একমাস শেষ হলে নিজের সময় ও পছন্দ মতো গ্রাহকচাঁদার জন্যে পেমেন্ট করুন। ব্যাপারটা প্রিপেড, অতএব মাস শেষ হলে আপনাকে বিল হাতে তাড়া দেব না, নিশ্চিন্ত থাকুন।
সৃষ্টিসুখ-এর ভার্চুয়াল লাইব্রেরি বানানোর এই প্রয়াসে পাঠকবন্ধুরা পাশে থাকুন।
তা এই সাইটে কী আছে?
১ — প্রথম পাতায় কিছুদিন অন্তর একটা নির্বাচিত বইকে Featured Book হিসাবে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে বিজ্ঞাপিত করা।
২ — একটা ব্লগ, সেখানে মূলত আমাদের লেখকদের সাক্ষাতকার বা আমাদের প্রকাশনার গল্প-সংবাদ-বিজ্ঞাপন থাকবে। যেমন আজ প্রকাশিত হয়েছে সঙ্গীতা দাশগুপ্ত রায়-এর সাক্ষাতকার।
৩ — আমাদের নিজস্ব অনলাইন স্টোর। খুব দরকার ছিল। প্রতিটা বই এখন আমাদের সাইট থেকেই সরাসরি কেনা যাবে। মাঝে আর কোনও কমিশন নেওয়ার মতো থার্ড পার্টি নেই বলে আমরা সুবিধামতো ডিসকাউন্ট দিতে পারব। দিতে পারব একই লেখকের একাধিক বইয়ের ওপর কম্বো অফার।
৪ — প্রতিটা বইয়ের সংক্ষিপ্ত পরিচয়, বইয়ের লেখকের সংক্ষিপ্ত পরিচয়। বইটির ই-বুক-এর লিংক। সঙ্গে গুগল বুক থেকে বইটির প্রিভিউ-এর লিংক। বই আপলোডের কাজ চলছে। আশা করা যায়, খুব তাড়াতাড়িই সে কাজটা শেষ করতে পারব আমরা। কোনও বিশেষ বই এখনই কেনার দরকার হলে কমেন্টে বইটির নাম দিতে পারেন, আমরা ব্যবস্থা করব।
৫ — প্রতিটা বই সম্পর্কে পাঠকদের সরাসরি রিভিউ লেখার সুযোগ (অন্তত ১০০ শব্দে)। আপনার প্রতিক্রিয়া সৃষ্টিসুখ-এর সাইটে প্রকাশিত হলে পাবেন আমাদের সাইট থেকে আপনার পরবর্তী কেনাকাটায় ৩০% ছাড়। ও হ্যাঁ, ফেসবুকে আপনার ইতিমধ্যে প্রকাশিত রিভিউটিও পোস্ট করে আসতে পারেন।
অতএব বন্ধুরা, www.sristisukh.com...
]]>
রোহণ — আমি তোমার লেখা পড়েছি একেবারে পাণ্ডুলিপি হিসাবে। অনেক ম্যাচিওরড লেখা সেগুলো। কিন্তু সবারই একটা হাতমকশোর ব্যাপার থাকে। সেই গল্পটা জানি না। তোমার লেখালেখির শুরুটা নিয়ে বলো।
সঙ্গীতা — শুরু বলতে স্কুলে দেওয়ালপত্রিকায় ছোট দু-চারটে কবিতা লিখে নিজে নিজেই খুশি হওয়া। তারপর আর কখনওই কিছু লিখিনি। কলেজ শেষ করে চাকরিজীবনের শুরুতে মিনিয়াপলিসে গিয়ে দেখি সেখানে অনেক আগে প্রতি পুজোয় একটা ম্যাগাজিন বেরোনোর চল ছিল, নাম ‘সন্নিকট’, যেটা লেখা ও উদ্যোগের অভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমি অতি উৎসাহে সেই ম্যাগাজিনের দায়িত্ব নিয়ে লেখা যোগাড় করার পাশাপাশি নিজেই লিখতে শুরু করি এবং তাতে বাৎসরিক একটা করে গল্প লিখতে থাকি। এই সময়েই বাংলালাইভ-এর খোঁজ পাই। সেখানে মজলিশ এবং মাসিক পত্রিকা বিভাগে লেখা নেওয়া হত। সেই ছিল আমার হাতমকশোর স্লেট। মজলিশে ছোট গল্প বা প্রাসঙ্গিক সামাজিক ঘটনা নিয়ে লিখতে লিখতে বেশ উৎসাহ পাই এবং সাহস করে ওদের মাসিক পত্রিকায় লেখা দিই একটি। সেই লেখাটি ভীষণভাবে চর্চিত হয়েছিল সাইটের ‘মতামত’ বিভাগে। এরপর ওদের শারদীয় সংখ্যাতেও লিখেছি দু-একবার। তবে মজলিশ বিভাগে নিয়মিত পাঠকদের পজিটিভ এবং নেগেটিভ ফিডব্যাকের মধ্যে দিয়ে চলতে থাকে আমার হাতমকশোর পাঠ।
সরাসরি পাঠকের প্রতিক্রিয়া পড়তে পড়তেই একবার সাহস করে দেশ পত্রিকার অফিসে গিয়ে কবিতা জমা করে আসি এবং আমাকে অবাক করে দিয়ে কিছুদিন পরে কবিতা দপ্তর থেকে চিঠি আসে আমার পাঠানো চারটি কবিতা থেকে দুটি তাঁদের পছন্দ হয়েছে। এই সময়েই ২০০৭-এ আনন্দবাজার রবিবাসরীয় বিভাগ একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করে, যাতে সীমিত শব্দসংখ্যার মধ্যে (সংখ্যাটা মনে নেই এখন) গল্প লিখে পাঠাতে হবে। গল্পের প্রথম লাইনটি ওরা লিখে দিয়েছিলেন। বলা হয়েছিল মনোনীত গল্পটি রবিবাসরীয়র পাতায় ছাপা হবে। আমি আবার অতি দুঃসাহস দেখিয়ে একখানা গল্প লিখে পাঠাই এবং আবারও আমাকে অবাক করে গল্পটি রবিবাসরীয়তে ছাপা হয়।
এরপর আমি মাঝেমাঝেই লিখতে থাকি। কখনও বড় পত্রিকায় কখনও লিটল ম্যাগাজিনে। তবে একটা কথা মানতেই হবে লেখার অভ্যেসের ব্যাপারে প্রথমে বাংলালাইভ আর পরে ফেসবুক আমাকে খুব বড় প্ল্যাটফর্ম দিয়েছে। হাতমকশো এখনও চলছে, তবে তা মূলত ফেসবুক এবং বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়।
রোহণ — যে কোনও লেখকেরই লেখালেখির মূলে থাকে তাঁর পড়াশোনা। তোমার লেখালেখির শুরুতে পড়াশোনাটা কেমন ছিল? সেটা কীভাবে তোমার লেখাকে প্রভাবিত করেছে বলে মনে হয়?
সঙ্গীতা — লেখালেখির শুরুতে পড়াশুনো কিচ্ছুই ছিল না আলাদা করে। আর যখন লিখতে ভালোবাসতে শুরু করলাম, তখন হাতের কাছে পড়ার জন্য সবচেয়ে বেশি পেতাম খবরের কাগজ। সেটা খুব ভালোবেসে পড়তাম, কারণ মূলত যে বাঙালি সমাজের গল্প লিখতাম, তাঁদের থেকে অনেক দূরে বিদেশে এক্কেবারে অন্যরকম মানুষজনের সাথেই থাকতাম বেশি। অতএব খবরের কাগজে পড়া সাম্প্রতিক ঘটনা আমাকে লেখার বিষয় জোগাত কিছুটা হলেও।
পরে আমি বুঝতে পারি যে, লিখতে গেলে পড়তে থাকাটা জরুরি। পড়তে শুরু করি যা পাই তাই-ই। এমনকী ম্যাপও পড়তাম। দেখেছিলাম ম্যাপে একটা জায়গার নাম পড়ে আমার বেশ ভাবতে ভালো লাগত, সেসব জায়গার মানুষের জীবনযাত্রা, পোশাক, তারা দুধ থেকে ছানা বানায় নাকি চিজ, মাংস কীভাবে রাঁধে, পোড়ায় না সেদ্ধ করে। থ্যাঙ্কস টু গুগল, নিজের ভাবনার সাথে কতটা মেলে সেটা অনায়াসে খুঁজে বারও করতাম। অতএব একটা জায়গার নাম থেকে উইকিতে সেটাকে খুঁজে তার লোকজন, জীবনযাত্রা অবধি গিয়ে হয়তো পরের সার্চটা দিলাম ‘ফেমাস মানুষ অফ অমুক প্লেস’… এভাবে পড়েই যেতাম। এদিকে পাশাপাশি পড়তাম বাংলা গল্পের বই। বুঝতে চেষ্টা করতাম কোন ধরনের লেখা আমাকে টেনে রাখে। এটাও জরুরি, জানো? মানে কেমন লেখা পড়তে ভালো লাগে আর কেমন লেখা বেশিক্ষণ টেনে রাখে না, সেটা বুঝে নিজের লেখাতেও সেটা অ্যাপ্লাই করা যায় বলে মনে হয় আমার।
আর একটা কথা শুনতে একটু অদ্ভুত লাগলেও বলি, আমার লেখাকে প্রভাবিত করে ভালো ইলাস্ট্রেশন। মানে আমার লেখার ইলাস্ট্রেশন নয়। ধরো, আমি পুরনো ইন্দ্রজাল কমিক্স বা দেব সাহিত্য কুটিরের কোনও বই খুলে কোনও ছবির দিকে তাকিয়ে আছি অনেক সময়। এমনকী চাঁদমামা বা ছোটদের যে কোনও বইয়ের ইলাস্ট্রেশনই অনেকক্ষণ দেখি বসে বসে। কোনও ভালো ইলাস্ট্রেশন মাথার মধ্যে নাড়াচাড়া করতে করতে অনেক লেখা উঠে এসেছে আমার। একটা ভাঙা দেওয়ালের পাশে একটা পাগড়ি পরা লোক উঁকি দিচ্ছে আর ঝুড়ি মাথায় মহারাস্ট্রিয়ান স্টাইলে শাড়ি পরা এক ফেরিওয়ালি হেঁটে যাচ্ছে পিছন ফিরে… এমন একটা ইলাস্ট্রেশন যে গল্পেরই হোক না কেন, আর একটা গল্প জন্ম দেয় মাথার মধ্যে। এই সবের প্রভাবই আমার লেখার মধ্যে আছে মনে হয় আমার।
রোহণ — তুমি এর আগে বলেছ ফেসবুক তোমার জন্যে একটা বড় প্ল্যাটফর্ম। এটা কি জাস্ট তোমার লেখালেখি বা বইয়ের প্রচারের জন্যে? নাকি এখানেও ভাবনার আদানপ্রদান বা ইন্টার্যাকশান হয়ে চলেছে? সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং এখন সাহিত্যকে কতটা প্রভাবিত করছে বলে তোমার মনে হয়?
সঙ্গীতা — ভাবনার আদানপ্রদান কিছুটা থাকে কোনও সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে লিখলে। কোনও ঘটনাকে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কে কীভাবে দেখছে তা জানা যায়। যেমন ধরো, আমি এখনকার টিভি সিরিয়ালে বাচ্চাদের চরিত্রায়নের সমালোচনা করে লিখলাম এবং দেখলাম আমি একা নই, এ নিয়ে প্রচুর মানুষ চিন্তিত এবং ক্ষুব্ধ। লেখার নিচের মন্তব্য, শেয়ার ইত্যাদি দেখে আমি আন্দাজ করতে পারি সাধারণ মানুষ কী চায়, কী চায় না। কিন্তু সেটা আমাকে লেখার ব্যাপারে প্রভাবিত করবে না, কারণ আমি টিভি সিরিয়ালের চিত্রনাট্য লিখি না। লেখালেখির জন্য ফেসবুক আমার প্ল্যাটফর্ম অন্যভাবে। আমি লিখছি। কখনও পরিচিত ছন্দের বা লেখার ধরনের বাইরে গিয়ে লিখছি, দেখছি কতজন পড়ছে, কেমন মন্তব্য করছে… শিখছি সেগুলো থেকেও। যেমন একবার ছোটদের একটি পত্রিকার জন্য গল্প লিখে আমি গল্পের নাম দিয়েছিলাম ‘দাদা হওয়া’। পত্রিকাটিতে লেখাটা ছাপা হয়েছিল, প্রশংসিতও হয়েছিল। আমার টাইমলাইনে লেখাটি যখন দিই, তখনও অনেকেই খুব ভালো ভালো মন্তব্য করেন। শুধু একজন লিখেছিলেন, গল্পের নামেই তো গল্পটা বলে দিয়েছ। এরপর আর গল্পটা না পড়লেও জানা যায় যে, কী আছে গল্পে। কথাটা কিন্তু ঠিক। ছোটদের জন্য লিখেছি, তাই অত মাথাতে আসেনি যে, গল্পের নামকরণেই মূল গল্পটা দেওয়া উচিত না। পরের বার থেকে গল্প সে ছোটদেরই হোক বা বড়দের, নামকরণ ভেবেচিন্তে করি।
তাছাড়া সোশ্যাল নেটওয়ার্কে যথেচ্ছ লেখার স্বাধীনতা আছে। ফলে, হয়তো আমি এমনিই লিখতে বসলাম এবং দেখলাম একটা ছোট অণুগল্প লিখেও ফেললাম। লোকে পড়ল, মতামত দিল, আমিও উৎসাহ পেলাম আরও অণুগল্প লেখার। পরীক্ষামূলক লেখা নিজের ইচ্ছেমত ফর্মে লেখার স্বাধীনতাও সেখানে আছে ভালোমত। ভালো লেখার খিদে জন্মানোর ব্যাপারে পাঠকের মতামতের একটা বিরাট ভূমিকা আছে, যা সোশ্যাল নেটওয়ার্ক দেয়। আমাকে দিয়েছে। লিখতে ভালোবাসি, কেউ পড়ছে জানলে আরও ভালো লাগে, ভালো লাগে তাৎক্ষণিক ফিডব্যাকও। যথেচ্ছ লেখার এবং সে লেখা পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অবাধ স্বাধীনতা সোশ্যাল নেটওয়ার্কই সবচেয়ে বেশি দেয়।
আর হ্যাঁ, বইয়ের প্রচারের জন্যও খুব কার্যকরী। আমি যত বড় পত্রিকাতেই লিখি না কেন, ক’টা মানুষ আমার লেখা পড়ছেন ভালোবেসে আমি কখনই জানতাম না এবং আমার বই বেরোলেও তা কেউ কিনতে চান কিনা এবং কেউ আদৌ কিনবেন কিনা তাও আমার অজানাই থাকত। আমি যখন ফেসবুকে আমার বই বেরোনোর কথা জানালাম, তখন আশাতীত আগ্রহ দেখেছিলাম পাঠকের। আমার মনে হয় আমার বই যে পাঠকরা নিজেরাই খুঁজে কিনেছে, তার কারণ তারা বইয়ের নাম, ধাম, ঠিকানা সবই ফেসবুকের মাধ্যমে জানতে পেরেছিল ঠিকমতো।
তবে এটাও ঠিক সোশ্যাল নেটওয়ার্কে যারা মতামত দেন, অনেকদিন ধরে লিখতে লিখতে তাঁদের সাথে লেখকের একটা পরিচিতি গড়ে ওঠে। তাই কিছুদিন লেখার পর থেকে লেখকের নিজের লেখা ইভ্যালুয়েট করতে শেখাটা খুব জরুরি। কারণ অনেক সময়েই ফিডব্যাকগুলো সাহিত্যের বিচারে আসে না, আসে পরিচিতির কারণে। লাইক বা কমেন্ট দিয়ে জনপ্রিয়তার মাপ বোঝা গেলেও নিজের লেখার সাহিত্যমূল্য বুঝতে গেলে শুধুমাত্র সোশ্যাল মিডিয়ার ফিডব্যাকের ওপর নির্ভর করাটা আমার ঠিক মনে হয় না। লেখার কারণে লেখাটি আদৃত, না লেখকের কারণে, সেটা বোঝার মতো ম্যাচিওরিটি না থাকলে সোশ্যাল মিডিয়াতে পাওয়া মন্তব্য একজন লেখকের লেখার ক্ষমতা সীমিত গণ্ডিতে বেঁধে ফেলতেও পারে। অতএব ভালো এবং মন্দ দুদিকেই সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব বেশ ভালোমতই থাকে আমার মতে।
রোহণ — পাঠকের মতামতকে একজন লেখক গুরুত্ব দেবেন সেটা স্বাভাবিক। ফেসবুক সেটার একটা বড় মাধ্যম বোঝা গেল। কিন্তু কোনও লেখা লিখতে শুরু করে পাঠকের মতামতের ব্যাপারটা কি তোমার মাথায় আসে? ধরো, ‘চন্দ্রলেখার প্রেম’ গল্পটা। একটা ব্যাঙ একজন মানুষকে ভালোবাসতে শুরু করেছে। ব্যাপারটা তো একেবারেই ফ্যান্টাসি, তোমার অন্য লেখার থেকে অনেকটাই আলাদা। লেখার সময় মনে হয়নি, তোমার অন্য লেখার থেকে একেবারে অন্যরকম এটা, পাঠকের হয়তো ভালো লাগতে না-ও পারে?
সঙ্গীতা — না, লেখার সময় পাঠকের মতামতটা নিয়ে ভাবি না। যা যেভাবে মাথায় আসে, তাই-ই লিখি। নিজের ফ্যান্টাসিকে কাগজে ফুটিয়ে তোলার সময় আমার ভাবনা আর কলম ছাড়া আর কিছুই থাকে না মাথায়। স্বার্থপরের মতো নিজের ভালোলাগাটাকেই প্রাধান্য দিই তখন। ‘চন্দ্রলেখার প্রেম’ লিখতে বসে আমি নিজেও জানতাম না লেখাটা কীভাবে এগোবে। লিখেছিও অনেকদিন ধরে। ওটা একটা চ্যালেঞ্জের মতো ছিল আমার কাছে। আমি কীভাবে ভাবতে পারি, কতদূর অবধি ফ্যান্টাসির মধ্যে গল্প বুনতে পারি, সেটা আমি জানতাম না। আজও যে জানি তা নয়। তবে ওই গল্পটা লিখতে বসে বুঝেছিলাম আমাদের ভাবনার পরিধি আমাদের কাছেও অজানা। তাই ভাবনার পায়ে কখনও শিকল পরাতে নেই। বরং তাকে লাগাম ছেড়ে ছুটতে দাও আর নিজেও ছোটো তার সাথে। যদিও লেখা শেষ করেই বুঝেছিলাম, কোনও ম্যাগাজিনের সম্পাদক এই গল্পটা ছাপবেন না। ছোটদের ম্যাগাজিনের সম্পাদকের কাছে ওটা ‘বড়দের রূপকথা’ আর বাকি সব ম্যাগাজিনের জন্য ওটা ‘ম্যাগের বাকি গল্পের সাথে যায় না’। তাও লিখেছি। কিচ্ছু না ভেবে শুধু চন্দ্রলেখা নামে একটা ব্যাঙকে ভালোবেসে লিখেছি, কারণ লেখা প্রথমে লেখকের, তারপর পাঠকের। পাঠকের মতামত ভীষণ মূল্যবান। লিখতে পারছি কিনা, লেখার ধরন পাঠককে টানছে কিনা, এগুলো বোঝা যায় মতামত থেকে। পরের লেখা এডিট করতে বসে সেই কথাগুলো মাথায় রাখলে লেখাটা যথাযথ সাজানো যায়। কিন্তু বিষয়বস্তু নির্বাচনে বা লেখার গতিপ্রকৃতির দিক নির্ণয়ের ক্ষেত্রে ওই মতামতটা গৌণ।
আমার মতে লিখতে বসে মাথায় কিছু না রাখাই ভালো। কারণ আগে লেখা, তারপর মতামত। আগে মতামত, তারপর লেখা নয়।
রোহণ — দারুণ ভাবনা এটা। সত্যি বলতে কী, কিছু কিছু পাণ্ডুলিপি পড়তে পড়তে মনে হয়, লেখক আগে থেকেই ঠিক করে নিয়েছেন একটা গল্প বা কবিতা কোথায় ছাপতে দেবেন সেটা ভেবে লিখছেন। একজন পাঠক হিসাবে সামান্য হলেও নিজেকে বঞ্চিত মনে হয় সেই সময়। যাই হোক, পরের প্রশ্নে আসি। ‘সুয়োকথা দুয়োকথা’ তোমার প্রথম বই। বইমেলায় তুমি গিয়েছিলে বইপ্রকাশের পর। তোমার পাঠকদের সঙ্গেও দেখা হয়েছে সে সময়। কেমন অভিজ্ঞতা হল?
সঙ্গীতা — অবিশ্বাস্য লাগছিল প্রথমে। বইমেলায় স্টলে সাজানো একরাশ বই, তাতে শুধু আমার লেখা কিছু গল্প, এমন কিছু কখনও কল্পনাই করিনি আমি। অনেকে এসেছেন, আমাকে খুঁজে বলেছেন বই কিনেছি, সই চাই। হাত কাঁপছিল তখন। কারণ এমন কোনও মুহূর্ত আমার কল্পনায় ছিল না কখনও। অনেকের সাথে সামনাসামনি আলাপ হয়েছে যারা, ফেসবুকে বা অন্য পত্রিকায় আমার লেখা পড়েছেন আগে এবং আরও পড়তে চেয়েছেন। ফেসবুকে বইয়ের খবর পেয়ে কিনতে এসেছেন। নিজের শখে লিখতে বসে এত মানুষের মনে পৌঁছতে পারব, এটা ভাবার কথাও ভাবিনি আমি কোনওদিন। নিজের লেখা বই অন্যের হাতে দেখার যে আনন্দ, তা ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতা আমার নেই। কেউ অভিনন্দন জানিয়েছেন, কেউ বলেছেন এই তো শুরু, আরও অনেক দূর যেতে হবে, কেউ বলেছেন পড়ে জানাব কেমন লাগল। আমার কেবলই মনে হচ্ছিল এও কি সত্যি!

সঙ্গীতা এবং লেখক, বার্ড ফটোগ্রাফার রূপঙ্কর সরকার, কলকাতা বইমেলা ২০১৭
রোহণ — এখন কী লিখছ? কোনও নতুন পাণ্ডুলিপি কি তৈরি হচ্ছে?
সঙ্গীতা — হ্যাঁ, লিখছি। আমোদিনী লিখছি ধীরে সুস্থে । আর তাছাড়া বেশ কিছু অণুগল্প লিখেছি, যেগুলো ফেসবুকে বা অন্যান্য ম্যাগাজিনে দিয়েছি। আরও কিছু অণুগল্প লিখে একটা সংকলন করতে চাই। প্রতিটি গল্প একেবারে আলাদা ধরনের যেন হয়, সেটা মাথায় রাখতে ব্রেক নিয়ে নিয়ে লিখছি। তাছাড়া বেশ কিছু পত্রিকায় নিয়মিত এবং কোথাও অনিয়মিত গল্প লিখছি। যেমন জিলিপি, অন্যদেশ, বম্বে ডাক ইত্যাদি। কিছু ম্যাগাজিন বছরে এক বা দু’বার বেরোয়, বৈশাখী ও শারদীয়া। সেরকম কয়েকটায় লিখছি। লিরিক্যালের একটা গল্প সংকলনের জন্যও লিখছি। তবে মনোযোগের সিংহভাগ জুড়ে আছে আমোদিনী।
রোহণ — যদ্দূর জানি আমোদিনী একটা সিরিজ হিসাবে আগে প্রকাশ পেত ফেসবুক। আমোদিনী সম্পর্কে কিছু বলো প্লিজ।
সঙ্গীতা — হ্যাঁ, আমোদিনীর বেশ কিছু গল্প ফেসবুকে আমার পাতায় প্রকাশিত। পরে ফেসবুকেরই একটা কমিউনিটি তাদের মাসিক পত্রিকাতেও সিরিজটা ছাপতে শুরু করে। কিন্তু বারোটা গল্প প্রকাশের পর আমি পত্রিকাটিতে আমোদিনী দেওয়া বন্ধ করে দিই। কারন আমোদিনী যত জনপ্রিয় হয়েছে, তত আমি চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করেছি নিজেকে। আমোদিনীর প্রতিটি গল্প আলাদা ধরনের রাখতে চাই, তাই পত্রিকার ডিমান্ড আর ডেডলাইন মেনে লেখা সম্ভব হচ্ছিল না। ওই যে, নিজের জন্য লেখা… ওটা মাথায় রেখেই অনেকদিন পর পর ভেবে চিন্তে একটা করে গল্প লিখছি। এখনও আমি প্রায়ই পাঠকের কাছ থেকে অনুরোধ পাই ‘আমোদিনীকে আনো’ বলে। সুয়োকথা দুয়োকথা বেরোনোর সময়ে অনেকেই বলেছেন ‘সে কী! আমোদিনী বেরোবে না বই হয়ে?’ বইমেলাতে বারবার শুনেছি পরেরবার আমোদিনী আসছে তো?
রোহণ — আমাদের এতটা সময় দেওয়ার জন্যে অনেক ধন্যবাদ সঙ্গীতা। পাঠকদের মতো আমরাও অধীর অপেক্ষায় থাকব আমোদিনী-র বই হয়ে আসার অপেক্ষায়। আগাম শুভেচ্ছা রইল।