দ্বিতীয় উপন্যাসের কেন্দ্রে থাকে বিপর্যয়। বিপর্যয় যেমনই হোক না কেন, জনজীবনকে তা কতটা বিধ্বস্ত, অসহায় করে তোলে- এ উপন্যাস তার সন্ধান করে। নিসর্গের অনন্ত শোকগাথা ধ্বনিত হলে মানুষের হাহাকার-ও যেন শব্দহীন। আর তারই ভিতর ঘনিয়ে ওঠে রাজনীতি। ত্রাণ নিয়ে ছেলেখেলা। এ-উপন্যাস যেন আমাদের অস্তিত্বশীলতার মূল প্রশ্নের দিকে ফিরিয়ে দেয়। বেঁচে-থাকার এই উদযাপনে প্রকৃতি ধ্বংসের খেসারত, রাজনীতির দাবা যে মানবজীবনকেই কতখানি আবাদহীন করুণ ও বিষণ্ণ করে তোলে, তার মুখোমুখি হতে হয় পাঠককে।
‘হে নবীন সন্ন্যাসী’ রণ-রক্ত-সফলতার ভিতরে সভ্যতার শান্তির প্রদীপ খুঁজে চলে। কাহিনিতে আসে মারী প্রসঙ্গ। আসে, ধর্মীয় গোঁড়ামি। মানুষের উগ্রতায় মানুষেরই বিপর্যয়ের আখ্যান। তার পাশেই থাকে বুদ্ধের শান্ত সমাহিত দর্শন। এ উপন্যাস আমাদের শাশ্বত জীবনপ্রবাহের স্রোতের সন্ধান দেয়, শত ঝঞ্ঝা পেরিয়েও যা বয়ে চলেছে অচঞ্চল।
বিষয়ে, বৈচিত্রে পাঠককে এক অক্ষ থেকে অন্য অক্ষে টেনে নিয়ে যান লেখক। কাহিনি পেরিয়ে অন্তঃস্থ দর্শনেই উপন্যাসগুলি হয়ে ওঠে সচেতনভাবে সমকালীন।
]]>২০২০ সালের মার্চ মাস। দেশে মারণব্যাধি ধেয়ে এল। তখন সবে শুরু। সে-মাসের ঠিক মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু হল ‘লক-ডাউন’ বা গৃহবন্দি দশা। ভয়ঙ্কর একটা অস্বস্তি ও আশঙ্কার মধ্যে কাটছে জীবন। যত দিন যাচ্ছে, শুনেছি একের পর এক মানুষের অকাল প্রয়াণের খবর। যে যে উপায় অবলম্বন করলে নিরাপদ থাকা যায় শুনেছিলাম, তারও বেশ কিছু দেখা গেল হিসেবে মিলছে না। এই অবস্থায় কিছু একটা আঁকড়ে ধরতে চেয়েছেন অনেকেই। আমার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে কিছুটা পরীক্ষামূলক ভাবেই শুরু করলাম একটা লেখা। নাম দিলাম ‘কল্পবিন্যাস’। কেন, তা বলি— প্রথমেই নাম দিয়ে ফেললাম ‘আলো চালের ভাত’। এ নাম কেন দিলাম, কী ভাবে এই নামের ব্যাখ্যায় পৌঁছব, কিছুই জানা ছিল না। কিছু কিছু ছোটগল্প লেখার সময়ে আমি এমন কাণ্ড আগে করেছি। উপন্যাসের মাঝামাঝি পৌঁছে একসময়ে নামটির ব্যাখ্যা দিতে পেরে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।
কোনও প্লট ভাবিনি, কোনও স্টোরিলাইন ছিল না। এক কিশোর ও এক ফুলওয়ালিকে নিয়ে কাহিনি শুরু করলাম। তাঁরা পরদিন কী করবেন, তাঁরাও জানতেন না, আমিও। প্রতিদিন পাঠকরা উৎসাহ যুগিয়ে গেছেন এবং বহু ক্ষেত্রে, তাঁরাই বলে দিয়েছেন কাহিনির গতিপথ। সকলের কথা যে শুনেছি, তা বলতে পারি না, কিন্তু বহু ক্ষেত্রেই নিজের মাথায় যা এসেছিল, তা বদলে ফেলেছি পাঠকদের সেন্টিমেন্টের কথা চিন্তা করে। কাহিনি শেষ করার অব্যবহিত আগেও ঘুরিয়েছি গল্পের মোড়।
এ উপন্যাস যদি সফল হয়, তার কৃতিত্ব আমার একার নয়, অনেকের। ডিটেল জিনিসটার ব্যাপারে আমি নিজে খুব খুঁতখুঁতে। আমার ফেসবুক বন্ধুবৃত্তে নানা পেশার মানুষ আছেন, অ্যাডভোকেট, পুলিশ, টিচার, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের নানা শ্রেণির কর্মী ও আধিকারিক, সকলের মতামত চেয়েছি ফোনে, বিভিন্ন কাজ কী ভাবে হয়, সবই জেনে নিয়েছি। এ লেখার পেছনে কৃতিত্ব তাঁদেরও। সকলের নাম উল্লেখ করতে পারলাম না। লেখার ঝোঁকে কিছু ডিটেলে ভুল করেছিলাম, পরে বদলেছি সে সব।
এ উপন্যাসে বেশ কিছু চরিত্র বাস্তবে যা দেখা যায়, তেমন নয়। তেমন হওয়ার কথাও নয়। নইলে মানুষ গল্পের বই না পড়ে খবরের কাগজ পড়বেন। সেটুকু আনন্দ পাঠককে দিতে পেরে থাকলেই আমার অসীম আনন্দ।
এই বছর মার্চ মাসের ২১ তারিখ ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে শুরু করেছিলাম ‘আলো চালের ভাত’, প্রতিদিন একটি করে পর্ব পোস্ট করেছি, হয়তো লিখেছি তিন-চারটি সর্বাধিক, কিন্তু তার বেশি নয়। অগস্ট মাসের ১২ তারিখ শেষ করি উপন্যাস। শেষ হওয়ার তিন-চার দিন আগেও আমি জানতাম না শেষ এভাবে হবে।
খুব আনন্দ হয়েছে এভাবে একটা সৃষ্টিকে এত কাছ থেকে দেখার জন্য।
সে সব দিন আর নেই, যখন বইয়ের মলাটে শুধু উপন্যাস বা গল্পের নাম থাকত, সঙ্গে থাকত লেখকের নাম। বেশ কয়েক দশক ধরে মলাট বা প্রচ্ছদ একটি বইয়ের অতি উল্লেখযোগ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মলাট চিত্তাকর্ষক হলে একটি বইয়ের সংগ্রহের আকর্ষণও অনেকাংশে বেড়ে যায়। এ বইয়ের প্রচ্ছদ এঁকেছে বিশ্বনাথ দাশগুপ্ত। কী অসম্ভব পরিশ্রম করে সে এই প্রচ্ছদ করেছে, তা কেবল সে জানে আর আমি জানি। নিত্যদিন ফোনে বায়না করে করে বিভিন্ন এলিমেন্ট বদল করিয়েছি। হাসিমুখে তা করেছে বিশ্বনাথ। সে আমার ভ্রাতৃস্থানীয় বলেই এত অত্যাচার সয়েও করেছে এই অপূর্ব প্রচ্ছদ। তাকে ধন্যবাদ দিলে ছোট করা হবে, তবে তার উল্লেখ তো করতেই হয়।
রূপঙ্কর সরকার
]]>প্রচ্ছদ - অভিব্রত সরকার
]]>‘অনুষ্টুপ’ এমনই এক চিরন্তন দ্বন্দ্বের যাত্রাকাহিনী। এ লেখকের কল্পনাপ্রসূত হলেও এক ছোট্ট সত্য ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রচিত।
]]>প্রচ্ছদ - পার্থপ্রতিম দাস
]]>প্রচ্ছদ - পার্থপ্রতিম দাস
]]>হ্যাঁ কন্যা, সংগীতই মানুষের দুঃখহরণ করে শান্তি দিতে পারে। যা আমাদের অন্তরকে রঞ্জিত করে, তাই রাগ। ইহজগতের শোকতাপ, মান-অভিমান, দুঃখকষ্ট প্রশমিত করে একমাত্র সংগীত।”
পিরিয়ড পিস কথাটার কোনও চালু বা স্বীকৃত বাংলা প্রতিশব্দ আছে কিনা আমার জানা নেই, অন্তত আমি আজ অবধি তেমনকিছু কোথাও পাইনি। আজ এ নিয়ে ভাবতে বসে মনে হল, পিরিয়ড পিস কথাটার বাংলা হিসেবে যুগাখ্যান যদি বলি, হয়তো নেহাত মন্দ হবে না।
তা, পিরিয়ড পিস কিংবা যুগাখ্যান যাই বলি না কেন, যে একজোড়া সংলাপ বিনিময়ের উদ্ধৃতি দিয়ে লেখাটা শুরু করেছি, সেটা ওইরকম এক উপন্যাস থেকেই নেওয়া। উপন্যাসটার নাম ‘রাগ রঞ্জাবতী’, লেখক বিপুল দাস। দ্বাদশ শতাব্দীর শেষভাগের গৌড়বঙ্গ এই উপন্যাসের প্রেক্ষাপট, মানুষের ব্যক্তিক ও সামাজিক নৈতিকতার মান যেসময় তলানিতে এসে ঠেকেছে, যখন—লেখকের নিজেরই ভাষায়—আখ্যানের মুখবন্ধ ‘কিছু কথা’-এ লেখক যেমনটা আমাদের জানাচ্ছেন—”গৌড়বঙ্গের প্রতিটি ঘর নীতিভ্রষ্ট কামলীলার আগার”। এরকমই এক অন্ধকার কালপর্বে স্থাপিত গৌড়বঙ্গের কাল্পনিক দুটি নগরীর পটভূমিতে লেখক গড়ে তুললেন তাঁর অনির্বচনীয় এই আখ্যান, যেখানে নরনারীর প্রেমের উত্তরণের মাধ্যম হয়ে উঠল সংগীত, বিরহের ঐশ্বর্যে সম্পন্ন সেই মিলনে হৃদয়ের নিষেকে জন্ম নিল নতুন এক রাগ, যার নাম রঞ্জাবতী।
এ এক আশ্চর্য আখ্যান। দশ ফর্মার এই পেপারব্যাকটির—যার মধ্যে মূল আখ্যানাংশ সাড়ে নয় ফর্মার—শুরু থেকে শেষ অবধি পড়তে পড়তে ও ক্রমশ চেনাজানা হয়ে উঠতে থাকা অচেনা নরনারীদের অজানা জীবনযাপনের শরিক হয়ে উঠতে উঠতে সারাক্ষণ, অনুক্ষণ, আপনি যেন শুনতে পাবেন স্বর্গসম্ভব বীণায় মৃদু অলৌকিক রাগবিস্তারের আবহসংগীত।
কী অদ্ভুত সুন্দর বুনন উপন্যাসটির! ডাকযোগে এসেছিল বইটি—পরম যত্নে এবং আমার পক্ষে শ্লাঘনীয় দুটি কথা লিখে উপহার হিসেবে পাঠিয়েছিলেন আমাকে বিপুলদা—তাও প্রায় মাসখানেক আগে। হাজারটা কাজের চাপের মধ্যে অল্প অল্প করে, একটু একটু করে পড়ছিলাম। পড়া শেষ করে আক্ষেপ হল, কী ভালোই না হত যদি এক টানে শুরু থেকে শেষ অবধি পড়ে ফেলতে পারতাম!
…
এমন একটি মহতী গ্রন্থ পাঠকের কাছে নিয়ে আসার জন্য প্রকাশক ‘সৃষ্টিসুখ’ কর্তৃপক্ষকে, এই সুযোগে, জানাই আমার আন্তরিক অভিবাদন।
– ঋজুরেখ চক্রবর্তী
]]>
সৃষ্টিসুখ প্রকাশিত এই বইটি অস্ট্রিয়ার এক উচ্ছিন্ন যুবকের ফুয়েরার হয়ে ওঠার কাহিনি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, বিয়ার বার বিদ্রোহ, নাজি দলের জন্ম, ইতিহাসের সেই মর্মন্তুদ অধ্যায় এই বইয়ে অনুপুঙ্খ বিবৃত। ইতিহাসে নিষ্ঠাবান লেখক। আর একটি সাধারণ যুবক, যে কি না শিল্পী হবে এই স্বপ্ন লালন করত মনে, সে কীভাবে মহাপরাক্রান্ত স্বৈরাচারী এক শাসক হয়ে উঠল, লক্ষ লক্ষ নিরূপায় মানুষের হত্যাকারী হয়ে উঠবে তা বিশ্লেষণ করেছেন লেখক। এই বই ফুয়েরার হয়ে ওঠা পর্যন্ত। এর পরের খণ্ডের জন্য অপেক্ষা করে থাকলাম। রোহণ কুদ্দুসকে অভিনন্দন।