অপেক্ষা আর অপেক্ষা। আগে আগে উৎকণ্ঠা হত খুব। আজকাল অন্যভাবে ভাবি।
এক-একটা খবর, এক-একটা চিঠি… আলাদা আলাদা সব গন্ধ নিয়ে আসে! এই যেমন ঠাম্মার লেখা চিঠি আমাকে… যেন গতজন্মের… ওই কাগজে নাক ডোবালেই ক্ষীর-কমলার গন্ধ আর জবাকুসুম তেল আর চার্মিস ক্রিম। দিদুর লেখা ছেঁড়া ডায়রির ভাঁজে ভাঁজে বসন্তমালতী আর সন্ধেবেলা গা ধোয়ার পর পাটভাঙা শাড়ি। মায়ের পোস্টকার্ডে অঙ্ক বইয়ের গন্ধ। বাবার হাতের লেখায় কেমিক্যাল রিএজেন্ট। ছোটবেলার বন্ধুদের যে ক-টা চিঠি… সব কটাতেই কাটা ফলের গন্ধ, আমার টিফিনবেলার। অনেক অনেক দিন পর রুখু মাটিতে বৃষ্টি নামা। চলে যাওয়াতে সমুদ্রের লোনা বাতাস, ভালোবাসাতে জুঁই-বকুল আর অভিমানে অনেক দূর থেকে ভেসে আসা সদ্য-ফোটা চাঁপাফুল।
আর প্রেমপত্রে? কাগজপোড়া ছাইয়ের! আমার প্রাণপণে ভুলে থাকার গন্ধ।
কিন্তু অপেক্ষা হল গন্ধহীন। কাগজফুলের মতো। বাগান আলো করে থাকে। সীমারেখা নির্ধারণ করে।
অবশ্য এবারে আইসিং অব দ্য কেক আর চেরি অন দ্য শেক হল ‘অ্যাইসি কি ত্যাইসি’। গতবার যখন ‘ফিসফাস ২’ বেরোয়, তখন তিনি সবেমাত্র ধরাধামে এসেছেন, তাই মর্ত্যাবতারে তাঁর কীর্তিকলাপ লিপিবদ্ধ করার সময় পাইনি। এবারে একদম ফুলটুস উপন্যাস। ফাঁকফোকরের জায়গা নেই। তবে একটা আপ্তবাক্য আছে। প্রত্যেকটি শিশু নিজের মতো করে এক-একটা প্রতিভার ভিসুভিয়াস। তাকে লাগাম পরাতে গেলে পম্পেইয়ের মমি হয়ে যাবার সম্ভাবনা। তার থেকে নিজের ছবি নিজে আঁকুক, রেল লাইনের মতো বাঁধনসর্বস্ব জীবনে তারাই না হয় শোলের মতো বাঁধনহারা পথ তৈরি করুক নিজের মতো করে।
আর আমি আপনি? পাঠক-পাঠিকারা আমরাও ক্ষুদ্র জীবনে দিলটাকে বড় করে আত্মমহাকাব্য রচনা করে যাই মহানন্দে। মনে রাখি যেন, মুখের অবস্থান চোখ আর কানের নিচেই। দেখে শুনে আগে উইকেটে সেট হয়ে যাই! তারপর না হয় ফিসফাস সাড়ম্বরে সকলের জীবনগল্প হয়ে উঠবে। মনুষ্যজীবনের সব না পাওয়ার গল্পের অ্যাইসি কি ত্যাইসি!
]]>আলগোছে অনিমেষ ভাবনা ছড়িয়ে সরু, কাটা আলপথ পেরিয়ে হনহন চলে লোকটা। মৃদু কুলকুল শব্দে ভুলুকপথে জল এগিয়ে যায় এক সীমানা ছেড়ে অন্য সীমানার দিকে। যাযাবরের নির্দিষ্ট নিয়মের কোনও তোয়াক্কাই করে না সে। কাঁধে ঝুলি, গামছা কিম্বা পাগড়ি, নিদেনপক্ষে হাতে এক গাঁঠওয়ালা তৈলাক্ত বাঁশের লাঠি, এ সব কিছুই তার কাছে অনভ্যস্ত ছদ্মবেশ। মাঠের সীমাহীন আলপথে কুয়াশায় মোড়া ক্ষীণ দৃশ্যমানতায় এগিয়ে চলে লোকটা। তার স্বল্পকেশ আর অনির্দেশ দৃষ্টি সম্বল।
কুকুকুকু আওয়াজে ভৈরবী রাগে বেহালায় ছড় তোলে কোনও মেঘনাদ পাখি। নিকুম্ভিলায় বসার আগে বাজিয়ে নিতে চায় চারপাশের শত্রু অবস্থান। মাঝে মাঝে অরোমান্টিক দাড়িতে হাত বোলায়, চুলকায় লোকটা। গতরাতের নরম মেয়েটার সূক্ষ্ম যোনিভেদের উত্তাল বৃত্তান্ত, এখন আর তার মনে নেই। যেমন মনে নেই কাল সন্ধেয় হাতে গোনা তিন টুকরো রুটি জুটেছিল কিনা ঠিকঠাক! চারদিক সচকিত করে হঠাৎ হাঁচি আসে, গুনে গুনে ঠিক দু-বার।
জীবনের যত ঝর্নাপ্রপাত, বিষাদের সমুদ্রে কল্কেফুলের রঙ পরিবর্তন, সব সবকিছু তুচ্ছ হয়ে যায় এই রাত সকালের সন্ধিক্ষণে। চড়া সূর্যের আলোয় নৌকাবিহীন নদীর জলে আলোর ঝলকানি মুহূর্ত বিপর্যস্ত করে না স্বভাব যাযাবরকে। উশকোখুশকো চুলের গোপন কোণ থেকে উঁকি দেয় সূক্ষ্ম রুপোলি রেখা। কত মুখ এল গেল, কত মুখই রয়ে গেল, হারাল অন্ধকারের নিষিদ্ধ গলিতে। লেগে থাকে সময়ের গায়ে কত না বোঝা অভিমান, না পাওয়া আদর। কোনোদিকে ভ্রূক্ষেপ না করেই এগোয় সে জন। তার কোনও অতীত নেই, ভবিষ্যত নেই। আছে শুধু কুয়াশাময় নিপাট বর্তমান।
ছেঁড়া ছেঁড়া কাটা স্বপ্ন-নকশায় রাত্রি পার হয়। জঙ্গলের দূর ঘনছায়ায় খটখট শব্দে নিশিবাসর চকিতে জাগিয়ে তোলা সাদা লক্ষ্মীবাহন অজর গমন শেষে ঘরে ফিরে যায়। সেইসব তরুণী কস্তুরি মুখ, অথবা কস্তুরি মুখের হরিণী ছায়া, হেমন্তভোরের চুপিচুপি অভিমান হয়ে কুঁড়ি হয়, ফোটে, ফের ঝরে যায় নাছোড় জাতিস্মর স্মৃতির অক্ষম বাহক হয়ে। অগস্ত্য অভিযানে গালের দু-পাশে বলি ক্রমশ গভীর হয়। আলপথ ধরে ভাঙাচোরা অবয়ব এগিয়েই চলে সকল চাওয়ার হাতের ধরাছোঁয়ার সীমানার বাইরে। আঁকাবাঁকা রঙধনু দিগন্তরেখা একবার হলেও ছোঁবেই সে।
লাল কাঁকুরে ল্যাটেরাইট মাটিতে সূর্য ওঠার আগের হিম আর সকালের প্রারম্ভ রোদ্দুর ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে পড়ে। টলমল পায়ে হাঁটে, খিলখিল হাসে। হাসে আর লুটোপুটি খায়। গায়ে মেখে নেয় লাল ধুলোর আদুরে আস্তরণ। ভাঙে নিজেদের অহং, আজন্ম লালিত সংস্কার, অন্ধ কানাগলির বোধ। ভাঙতে ভাঙতে একসময় বিদ্যুৎ চমকের মতো জন্ম নেয় গোলাপি মুক্তোর খণ্ড।
একমুখ দাড়ি, গোঁফ আর ঝাঁকড়া চুল, কতদিনের না কাচা জামা আর বোতাম ছেঁড়া জিনস সম্বল লোকটা হেঁটে চলে সযত্নে মুক্তোগুলোকে পাশ কাটিয়ে। সম্পূর্ণ উদাস দুটো চোখে পৃথিবীর কোনও অনাচার কিম্বা আপাত দুর্লভ সম্পদমায়া কোনও ছাপই ফেলতে পারে না। একে একে পার হয় রুক্ষ অকৃষিযোগ্য মাঠের আল।
কোন দূরে সদগোপ গৃহস্থ সন্ধানী চাউনিতে খুঁজে ফেরে আগের রাতে গোয়ালের নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে না ফেরা গাভীর ঝুন্ড। সেদিকে একঝলক তাকিয়েই এলোমেলো লোকটার মনে পড়ে যায় গতরাতের স্বপ্নে রাগী মোষের লেজ কেটে নেওয়ার বিক্ষিপ্ত সিদ্ধান্ত। ঘুমভাঙা পাখিদের চমকে দিয়ে একাকী প্রান্তর কাঁপিয়ে হা হা করে হেসে ওঠে সে। স্বপ্নেও তাকে পালাতে হয় ক্রুদ্ধ মোষের তাড়া থেকে উদাসীন জীবন বাঁচানোর নিষ্ফল চেষ্টায়।
এইভাবে জীবনও তাড়া করে। আশেপাশে লোভী হাত যখন নির্জন রাতে কাজফেরত যোনির ওপর হামলে পড়ে। নেশাড়ু মননে ফাঁকা রাস্তায় ব্লাউজ ছিঁড়ে অনাবৃত করে সুডৌল স্তন।
যখন বলিরেখা আঁকা মুখের সামনে নেচে বেড়ায় শেষ বয়সের সম্বল দেবার আশ্বাসে অর্থলোলুপ হাত। বহু বসন্ত দেখা বৃদ্ধ চোখের সামনে নেমে আসে গাঢ় শীত। বরফ পড়ে। পাতা হারিয়ে সবুজ গাছেরা মৃতপ্রায়।
যখন চোদ্দো বছরের বিবাহিত জীবনে নপুংসক কিলবিলে হাত শুধু ঘুষি মেরে যায় কোমল প্রত্যঙ্গে। কালশিটে দেখে ভোগ করে নরকের দাউদাউ আনন্দ। চুরি করে বেচে দেয় কামনা মেটানো সোনালি শৈশব।
তখনও লোকটা দৌড়ায়। আধঘন জঙ্গলের আঁকাবাঁকা গাছেদের এড়িয়ে খোলা প্রান্তরের সীমানার দিকে।
খোঁচা খোঁচা আগাছার ভিড়ে শুধু মশাদের গুনগুন। সূর্য ওঠে। লাফ দেয় দেরি হয়ে যাওয়া নৈমিত্তিক দিনের শুরুতে। লোকটা হাঁটে নির্বোধপ্রায় চাউনির মরা আভা দিয়ে পথ খুঁজে খুঁজে।
কোথাও ধানকলের ভোঁতা সাইরেন জানান দেয় — ভাত দাও গো! বড় খিদে আজ চড়াপড়া এ পেটসর্বস্ব দেহে!
]]>সৃষ্টিসুখ থেকে প্রকাশিতব্য এই বইটির নির্বাচিত তিনটি গল্প পড়া যাবে Sristisukh E-Book অ্যাপে। অ্যাপ ডাউনলোডের লিংক এখানে।
]]>
প্রত্নবীজ
প্রথম প্রকাশ – বইমেলা ১৯৯৬প্রকাশক – হাওয়া-৪৯, সমীর রায়চৌধুরীপ্রচ্ছদ – মলয় রায়চৌধুরীদাম – ২০ টাকাগ্রন্থ স্বত্ব – সুবিমল বসাক
কৃতজ্ঞতা স্বীকার – ‘হা-রে-রে-রে-রে’ এবং ‘মহল্লা লোদিপুর’ নামে কয়েকটা অংশ কবিতা-দর্পণ কৌরব এবং অনুক্ষণ (সিউড়ি) হাওয়া-৪৯ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।
বইটির উৎসর্গপত্র —
আদরনীয় শ্রীসমীর রায়চৌধুরীআর শ্রীমতি বেলা রায়চৌধুরীরকরকমলে
বইটির ভূমিকা —
ইংরেজ বিতাড়িত নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ’এর বজরা এসে থামে মেটিয়াবুরুজে। পেছনে অর্ধশতাধিক বজরায় জীবজন্তু পাখী থেকে তওয়াএব, গায়িকা, নর্তকী, তবলিয়া, সারেঙ্গিঅলা, কোঠেবালি, আতরঅলা, খানসামা, বাবুর্চি, খাদিম, হেকিম, মৌলানা, মৌলভি, রাজমিস্ত্রি, ধোবি, হাজাম আরো আরো অনেক পেশাদার। নেমেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে এলাকা গড়ে তোলে। ইংরেজদের সংস্পর্শে বাঙ্গালিকুলের একটি অংশ তোষামোদ ও চাটুকারি শিল্পে উন্নত হয়ে গুছিয়ে নেয় আখের। সুবে-বাঙ্গলার বাঙ্গালির রমরমা তখন, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ডাক্তার, প্লীডার, ব্যরিষ্টার, অফিসার, টিচার, বিজনেসম্যান, প্রফেসার, ক্লার্ক, কন্ট্রাক্টর, ইঞ্জিনিয়ার, জমিদার। একদিকে ইংরেজি শিক্ষা, অন্যদিকে ব্রাহ্মদের উদারতা, মাঝখানে হিন্দুদের সংস্কার।বাঙ্গলার বাইরে গড়ে ওঠে বাঙ্গালিদের নিজস্ব ঘরানার এলাকা; সেই এলাকায় কপাল খুলতে এসে জোটে বাঙ্গালি দোকানদার, চাঁদসী ডাক্তার, ঠিকাদার, মুদি, দশকর্ম ভাণ্ডার, হোটেল ব্যবসায়ী, কম্পাউন্ডার, ড্রাইক্লিনার্স, যাত্রাদল, হোমিওপ্যাথ, স্বর্ণকার, মেস-পরিচালক, পুরুত, কেরানি, ওষুধ প্রতিষ্ঠান, কাপড়ের দোকান, ইমারতি দ্রব্যের দোকান, নানান পেশাজীবী। এই সব বাঙালিরা মিশে গেছেন বিভিন্ন রাজ্যের ভূমিপুত্রের সাথে। ভাষা, সংস্কৃতি সব গ্রাস করে মিলিয়ে গেছেন তাদের মাঝে। যে জীবন, যে বাঙলা ভাষা, সে সংস্কৃতি বাঙ্গালির, তবু তা অন্যরকম। যেমন আন্দামানের বাঙ্গালি, যেমন শ্রীলঙ্কার তামিল, যেমন মরিসাসের বিহারী, যেমন ক্যারিবিয়ানের নিগ্রো, যেমন ফরাসি দেশের আরব, জার্মানির তুর্কি, আজারবাইজানে রাশিয়ান। যাদের যে কী ইতিহাস তা কেউ জানে না। এই রচনাটি সেই সব ‘মিথ’-এর গল্প। — সুবিমল বসাক২২/৬, ভার্নার লেনবেলঘরিয়া, কোলকাতা-৫৬
বইটির পশ্চাদপটে লিখিত —
সেই ১৯৬৫ সালে সুবিমল বসাকের প্রথম পেশকারী ছাতামাথা—যা আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে তুমুল আলোড়ন—যা ছিল তৃণমূল স্তরে ভাষার কারুকার্য, বিষয়হীনতার ঔজ্জ্বল্য। উপন্যাসের ব্যাকরণ সিদ্ধ প্রথা, মাপাজোকা উপস্থাপনা, আঁটোসাঁটো আঙ্গিক, লতাপাতা ঘেরা প্রাসাদ—সব ভেঙেচুরে ফুৎকারে উড়িয়ে দেয়া হয়েছিল বিধগ্ধ সমালোচকের ভ্রূকুটি উপেক্ষা করে।ত্বক ও শিরার মত দেহ-শরীরে, সুবিমলের গদ্যের ভাষা ও বিষয় সহ-অবস্থান করছে। সাব-অলটার্ন এই উপন্যাস বস্তুতঃ শ্রেণী-সংগ্রামের চেতনায় উজ্জীবিত। কি আঙ্গিক, কি চরিত্র, কি উপস্থাপনা, কি ভঙ্গিমা, কি ভাষা ইস্তেমাল — লেখা ও কথ্যভাষার সমৃদ্ধ রত্নরাজি সুবিমলের অধিকৃত খজানা। তাঁর হাতে রয়েছে সেই মূল্যবান কাসকেট, যার ভেতর অজস্র অভিজ্ঞতার মণিমুক্তা; ডালা খোলার সঙ্গে সঙ্গে বিরল রত্নরাজির রঙিন ছটায় ঝিকমিক করে সমগ্র সিন্ধু-সভ্যতা, মহেঞ্জোদারো-হরপ্পার খুঁটিনাটি দৃশ্যপট — প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার নস্টালজিক অভিপ্রেত।
এথি
প্রথম প্রকাশ – ডিসেম্বর, ২০০১প্রকাশক – এবং প্রকাশনী, শ্রীসুভাষ ঘোষপ্রচ্ছদ – সুবিমল বসাকদাম – ৩৫ টাকাগ্রন্থ স্বত্ব – শুভময় বসাক
কৃতজ্ঞতা স্বীকার – কালিমাটি, এবং, আজকের গল্প, মাঝি, একালে রক্তকরবী, এবং প্রিয়শিল্প, দধীচি, সান্নিধ্য
বইটির উৎসর্গপত্র —
উৎসর্গ
মহল্লা লোদিপুর, পাটনা
বইটির পশ্চাদপটে লিখিত —
সুবিমল বসাক ১৫.১২.১৯৩৯ বিহারে, পাটনায় জন্ম। শৈশব-কৈশোর, শুরু-যৌবন কাটে অপখ্যাত লোদিপুর মহল্লায়। কাজের ধান্ধা ও কায়িক পরিশ্রমে অর্থোপার্জনে আসা কয়েক ঘর বাঙালি পরিবার ছাড়া সেখানে আশেপাশে ছড়ানো-ছিটানো স্থানীয় অন্ত্যজ শ্রেণীর প্রান্তিক মানুষ, ভারতবর্ষের জনসমাজ।
১৯৬৫ সনে প্রকাশিত তাঁর প্রথম ডিন্যারেটিভাইজড উপন্যাস ‘ছাতামাথা’, কলকাতা কেন্দ্রিক সাহিত্যিক অনুশাসনে হেনেছিল মোক্ষম আঘাত। রচনাটির ন্যারেটিভ ঢাকার কুট্টি এক্কাচালকদের ভাষায় নির্মিত এবং সংলাপ রাঢ় অঞ্চলের। বাংলা ভাষায় প্রথম রাইজোম্যাটিক উপন্যাস — ঘাসের মতো বিশৃঙ্খল। মুক্ত সূচনা ও মুক্ত সমাপ্তির দিক চিহ্ন।
১৯৯৬ সনে প্রকাশিত তাঁর ‘প্রত্নবীজ’ উপন্যাসটি বাংলা সাব-অলটার্ন সাহিত্য হিসাবে একটি জল বিভাজক। এই উপন্যাসে সুবিমল বসাক নিজে বর্ণিত সমাজটির অন্তর্গত, সবর্ণচেতনা বহির্ভূত, নিম্নবর্গীয় শব্দচেতনা, ডিস্ট্রাকচার্ড রচনা কাঠামো, চরিত্র প্রান্তবাসী, সংস্কৃতিবস্তু স্থানিক, মনন-ভাঁড়ার বৈভিন্ন্যময়। তাঁর প্রতিস্ব মেট্রোপলিটান না-হওয়ায় তিনি পৃথক অনুশাসন এলাকায় বিচরণ করছেন।
‘এথি’ উপন্যাসটি প্রত্নবীজের পরবর্তী কালীন।
তিজোরীর ভেতর তিজোরী
প্রথম প্রকাশ – ডিসেম্বর, ২০০৫প্রকাশক – হাওয়া-৪৯, সমীর রায়চৌধুরীপ্রচ্ছদ – সুবিমল বসাকদাম – ৩৫ টাকাগ্রন্থ স্বত্ব – সংরক্ষিত
কৃতজ্ঞতা স্বীকার – খনন, এবং মুশায়েরা, শৈলী, ভগ্নাংশ, কালিমাটি, হাওয়া-৪৯, ছিটেফোঁটা
বইটির উৎসর্গপত্র —
উৎসর্গ
চিরঞ্জীব শূররাহুল পুরকায়স্থ
প্রিয়জনেষু
বইটির পশ্চাদপটে লিখিত —
সুবিমল বসাকের গদ্য শরীর যে ভাবে ভাষা ব্যবহারে গড়ে উঠেছে, তা তাঁর অন্ত্যজ শব্দে, নিম্নবর্গীয় বুলিতে, বাক্যের অধোগঠনে, যুক্তিভিন্নতায়, সামঞ্জস্য ভঙ্গে, অনুশাসন হীনতায়, মূলধারার বিপক্ষে, অভিজ্ঞতার গভীরতা ও ব্যাপ্তির এথিকাল তালুকে উদ্দীপ্ত হয় বলে, বিষয় বস্তু ও প্লটের বৈভিন্ন্যকে অনায়াসে সে খেলাতে পারে।
ভাঙাচোরা মানুষেরা খড়কুটো ধরে বেঁচে থাকে
কাকের চেহারা নিয়ে সবখানে ঘোরে
ভোরবেলা জেগে ওঠে ঘোর অনিচ্ছায়
সূর্য নগ্ন শত্রু তার, বর্ষণেও ভয়
তবুও সমুদ্র জাগে বিক্ষত পাঁজরে
ধাতব গর্জনে কাঁপে ল্যাম্পপোস্ট, পুরনো দেয়াল
ভেঙে পড়া মানুষেরা চুপ করে থাকে
গোপনেই চলে গেছে বসন্তের ঋতু
পাখিদের দিন কাটে পালকের শোকে
১৯৯৪, আমার তখন ২১। মানুষের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেললাম। ২১ বছর যতটা বিশ্বাস পুষতে পারে আর যতটা হারাতে পারে, ততটাই আর কী। সঞ্জীব, সঞ্জীব ভক্ত গোলগাল ছোট্ট মানুষ মডার্ন বেকারি পেরিয়ে এক ভাড়া ঘরে থাকত। তার একতরফের প্রতিবেশী এক ছুকরি বেলজিয়ান আর অন্যতরফে এক মঙ্গোলবালক। সঞ্জীব, একদিন হাঁফাতে হাঁফাতে এসে অনামিকা বয়েজ হোস্টেলে সত্যর ঘরে সান্ধ্য আড্ডায়, চোখ বিস্ফারিত —“জানো সব্যদা, সমস্ত মঙ্গোলিয়ানদের পাছায় একটা করে নীলদাগ আছে। মঙ্গোল বলল এইমাত্র।” চিনা, জাপানি, কোরিয়ানদেরও তাই। সে দাগ নাকি খোদ তেমুজিনের স্মৃতি, সারা পৃথিবীর তেমুজিনের বংশের উত্তরাধিকার। এরপরও মানুষে বিশ্বাস রাখা যায়? জেনেটিক ডাইলুশান বলেও কি কোনও জিনিস নেই? তো, সেই নাম না-জানা মঙ্গোলের নাম হয়ে গেল নীলদাগ আর করোলারি হিসেবে বেলজিয়ান ছুকরির নাম লালদাগ।
১৯৯৮-এ আমি যখন কোরিয়ায়, তদোগেনের সাথে দেখা। মদ খেতে খেতে ঠাট্টার ছলে বলেই ফেললাম। তদোগেন সিরিয়াসলি বলল, “সে কী, তুমি দেখোনি?” পরের দিন ডর্মিটরির কমিউনাল শাওয়ারে স্নান করতে করতে প্রথমবারের মতো চারিদিকে চোখ বোলালাম। কী আশ্চর্য! সাদা তীব্র স্টেরাইল আলোয় কোথাও সাবানের ফেনা ভেদ করে, কোথাও জলধারা ফুঁড়ে সারি সারি কালসিটের মতো নীলদাগ! সেই আবার মানুষের ওপর বিশ্বাস করতে শিখলাম, ২৫ বছর বয়সে যতটা বিশ্বাস করতে পারা যায় আর কী।
তারপর থেকেই তদোগেনের সাথে একটা সখ্য। মদ, গান, কোরিয়ান রকব্যান্ডের সাথে এখানে সেখানে। তদোগেন মান্দারিন জানে, রাশান জানে, কম্পারেটিভ লিটারেচার পড়তে এসেছিল। কোরিয়ানও শিখে নিয়েছিল। আমার চেয়ে বছর ছয়ের বড় তদোগেন শান্ত, ধীর, মদ খেয়েও চুপ। ‘বুধা’ বলে ডাকত কিম ইয়ং জুন, রকব্যান্ডের রাজা! কবিতা লিখত তদোগেন, কোনোদিন শুনিনি, ইংরেজি জানত না। কোরিয়ান ভাষায় কবিতা বোঝার এলেম আমার ছিল না। ২০০২-এ যখন সে দেশ ছাড়ি, তদোগেন তখনও কোরিয়ায়। আর তারপর জীবন। ১৩ বছর পর, ২০১৫-য় ইয়ং জুন-এর কাছ থেকে মেল অ্যাড্রেস নিয়ে যোগাযোগ করে তদোগেন। তদোগেন এখন উলান বাটোর থেকে পুবে ওন্দোরহান শহরে ইউনিভার্সিটিতে পড়ায়। অ্যাদ্দিনে সে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে তার মঙ্গোল কবিতা অনুবাদ করে আমায় পাঠায় আর আমি তাকে বাংলায় তুলে আনি। এ এমন একটা সময় যখন মানুষের ওপর বিশ্বাস রাখব কি রাখব না — এই দ্বিধা নিয়েই দিন কাটে।
সব্যসাচী সান্যাল
]]>অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া রাস্তা দেখাতে টর্চ বিক্রি করার কোনও অভিপ্রায় থেকে আমি লিখি না। এ কথা জানলে সুখী হবেন যে, অন্ধকারও বেচি না আমি। সুতরাং ক্ষয়রোগ থেকে আপনার পকেট সালামত থাকুক, এই বিবেচনা থেকে আমার অক্ষরেরা ঘুরে বেড়ায় আপনার মাথার ওপরের কালো অঞ্চলে। সেই শকুনের পালক থেকে ঝাড়াই করে আমি আমার প্লট খুঁজে আনি, যার দিকে চোখ ও মন দেওয়া রুচিতে বাধে আপনার। তীব্র মানসিক অবসাদ থেকে ফ্রয়েডকে মুক্ত করার কথা ভাবতেই আমার অর্ধেক শব্দ খরচ হয়ে যায়, যেখানে আপনার আশি ডেসিবেলের শব্দ পাই আমি। আমি লোন নিতে আসি আপনার বোধের কাছে। তবে এই ভাবনাতে একটু চোনার মতো থেকেই যায় যে, সেই লোন শুধুমাত্র আপনার সুদ-আসল বাড়াব বলেই নেওয়া, যেহেতু মহাজন ছাড়া কিছুই ভাবা যায় না আপনাকে। সেই লোন নেওয়া ভাবের ঘরে আমি ঢুকি পর্যন্ত না, যেমন রক্ষিতার খোপ এড়িয়ে চলেন আপনি। সেই অন্ধকার নিয়ে আমার যা কিছু লেখা আপনি পড়তে পারেন ও পড়েন, তাতে আপনাকে ডার্করুমে কাজ করা পারদর্শী একজন ডেভলপারের তকমা দিতে আমি বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করি না (যদিও ফোটোগ্রাফার যে আমিই ও আমার সৃষ্টিতেই চোখ পাকাচ্ছেন ও টাটাচ্ছেন আপনি, সে কথা উহ্য রাখার অর্থ, অহংকার নিজের থেকে থুকে ফেলা)। এতটা জমাট অন্ধকারের সাথে পরিচিতি ঘটানোর জন্য ক্ষমাপ্রার্থী। আপনার সময় আলোকোজ্জ্বল হোক, যার অর্থ এখনও আপনি…
]]>