প্রথমেই বলে নিই আমাদের ইলাস্ট্রেটার এবং কভার ডিজাইনারদের কথা।
অরিজিৎ ঘোষ আমাদের সঙ্গে কাজ শুরু করেছে সদ্য। ওর করা টগবগ-এর উৎসব সংখ্যার কভার থেকে ভেতরের ইলাস্ট্রেশান দারুণ প্রশংসা পেয়েছে। এবারে ও করল ফিসফাস ৩-এর প্রচ্ছদ।
যোগ দিয়েছে নক্ষত্র সেন। ওর প্রচ্ছদ মুগ্ধ করছে। সৌরভ মিত্র, অলোকপর্ণা, উমাপদ কর, স্বপন রায় — এরকম আরও কিছু প্রচ্ছদের দায়িত্বে ছিল নক্ষত্র।
আমাদের সঙ্গে এবার কাজ শুরু করলেন আরও একজন — দীপাঞ্জন বোস। কার্টুনধর্মী আঁকাআঁকি থেকে শুরু করে সিরিয়াস প্রচ্ছদ সবেতেই তাঁর অবাধ যাতায়াত।
একটাই বইয়ের কাজ করেছেন দেবাশীষ রায়। সুজন দাশগুপ্তের ‘সুজনকথা’য় লেখককে যোগ্য সঙ্গত দিয়েছেন দেবাশীষ।
অভিষেক হল অমৃতরূপা কাঞ্জিলালেরও। ঋজুরেখ চক্রবর্তীর কবিতা সংকলনের অসাধারণ একটা প্রচ্ছদ করেছেন তিনি।
অন্যান্য বারের মতোই আছে পার্থপ্রতিম দাস, আমাদের পার্থদা, হাসিমুখে যে কোনও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া তার বিশেষত্ব। পার্থদার কাজের তালিকা দীর্ঘ। আশা করা যায়, সৃষ্টিসুখ-এর স্টলে চোখ বন্ধ করে যে কোনও বইয়ে হাত দিলে সেটাতে পার্থদার কাজ থাকার সম্ভাবনা ৭০ শতাংশ।
আর যিনি না থাকলে সৃষ্টিসুখ এবং হ য ব র ল সম্পূর্ণ নয়, সুমিত রায়, সুমিতদার কাছে আমাদের ঋণ বেড়েই চলেছে। সুমিতদার ইলাস্ট্রেশান, প্রচ্ছদ এবং একনাগাড়ে উৎসাহ দেওয়ার ক্ষমতা উজ্জীবিত করে। আজকাল লেখকদের সঙ্গে সঙ্গেই পাঠকদেরও (হ্যাঁ, পাঠকদেরও) ফরমায়েশ থাকে — “অমুক বইয়ে সুমিতবাবুর কাজ চাই।”
বই ছাপাখানায় যাওয়ার পর থাকে সবথেকে বড় ব্যাপার — ছাপা, ভাঁজাই, বাঁধাই, কাটাই — এককথায় বইয়ের বই হয়ে আসা। অনেকেই জানেন, সৃষ্টিসুখ এখন একটা ছাপাখানার অংশীদারও বটে। আমরা আদর করে ডাকি ‘সৃষ্টিসুখ প্রিন্ট’। এখন আমরা ডিজিটালে, মূলত প্রিন্ট অন ডিমান্ডের কথা মাথায় রেখে। ক্রেতা-পাঠকের আশীর্বাদে বছরখানেকের মধ্যে আমরা অফসেটেও একই রেটে খেলতে শুরু করব। যাই হোক, সৃষ্টিসুখ প্রিন্ট থেকে আমাদের সমস্ত আবদার, চাহিদা, শেষ মুহূর্তের অন্যায় বায়না সামলে চলেন রাজীব রায়চৌধুরী। বিরাটের যেমন ধোনি, আমার তেমন ‘ক্যাপ্টেন কুল’ রাজীবদা। কোন বই কত কপি হবে, কেমন হবে তার সমস্ত খুঁটিনাটি রাজীবদার নখদর্পণে।
আর সবশেষে যার কথা না বললেই নয়, যে ছাড়া সৃষ্টিসুখ এভাবে কাজ করতেই পারত না, বিশ্বজিৎ বেরা। হাসিমুখে রোদ-ঝড়-বৃষ্টি মাথায় করে যে ছেলেটা প্রেস থেকে আউটলেট হয়ে পোস্ট-অফিস, কুরিয়ার, ধ্যানবিন্দু, দে-জ, অভিযান হেঁটে চলে এবং তারপরেও আপনাদের রাস্তা দেখিয়ে আমাদের আউটলেটে নিয়ে আসে। এমনকী, পুজোর ছুটিতেও একটা মাত্র বই পৌঁছে দিতে যে হাওড়া থেকে বিশরপাড়া রওনা দেয়, তার ডেডিকেশান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে না। সবথেকে বড় কথা, সমস্ত কিছুর পরেও হাসিমুখে আমায় সহ্য করে এবং প্রয়োজনে আমায় ধমক দেয়, বিশ্বজিৎ। এবার বইমেলার 442 নাম্বার স্টলে হাজিরা দিলে দেখবেন সে এককোণে আপনাদের ফরমায়েশ মিটিয়ে চলেছে। একবার হাত মিলিয়ে আসবেন অবশ্যই। আজ থেকে অনেকগুলো বছর পর আমরা যখন আর একটু বড় হব, এই বিশ্বজিৎকেই ‘ডিয়ার স্যর’ বলে মেল করতে হবে কিন্তু।
এর পরেও অনেকেই নামই বলা হল না। আমার যা স্মৃতির বহর… এরপরও কমেন্টে দেখবেন অনেকেই মনে করিয়ে দেবেন। তাঁদের নিয়ে না হয় আরও একটা পোস্ট হবে। আপাতত এটুকুই। দিনটা ভালো যাক সব্বার।
]]>
সৃষ্টিসুখ-এর সৌজন্যে নানা রকম মজার অভিজ্ঞতা রোজ হয়। ছোট বড়। যেমন, আগের বইমেলায় একদিন স্টল গোছানোর আগে বিশ্বজিৎকে অমিতাভদা বলছে পরের দিন কোন কোন বই আউটলেট থেকে স্টলে আনতে হবে। বেশ কয়েকটার পর আমি বললাম, “নোট করে নাও, নাহলে ভুলে যাবে।” বিশ্বজিতের চকিতে উত্তর — “মাথায় কম্পিউটার বসানো আছে।” আমার যুগপৎ বিরক্তি আর অবিশ্বাস দেখে পাশ থেকে বাপির (নাকি অমিতাভদার?) মন্তব্য — “সেই জন্যেই মাথাটা অত বড়।”যাক গে, আজ দেবাশিসদার (সেনগুপ্ত) ‘স্বপ্নের ভিতর’http://sristisukh.com/ss_wp/faq/ বইটার কভারের ব্রিফ পাঠিয়েছি। সুমিতদা খসড়ার সঙ্গে যথারীতি কিছু মাশাল্লাহ টাইপ ইম্প্রোভাইজেশান যোগ করেছেন। আমি উত্তর করলাম — “You are an angel Sir ![]()
“, ওদিক থেকে ঝটিতি জবাব — “banan vul nei to?” অ্যাটাচমেন্টে অ্যাকিউট অ্যাঙ্গেলের একটা সুমিত সংস্করণ।
বাংলা বইয়ের দাম কেন এত বেশি সেই নিয়ে প্রায়ই কথা শুনতে হয় নানা জায়গায়। সত্যি বলতে কী, সৃষ্টিসুখ থেকে যে বইগুলো আমরা করি, চেষ্টা করি যতটা সম্ভব সেগুলোর দাম কম রাখা যায়। কিন্তু সেটাও একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দস্তুর এটাই যে, বইয়ের মুদ্রিত মূল্যের ওপর ২০%-২৫% ছাড় দিতে হবে। কিছুদিন আগেই এক সিনিয়র প্রকাশকের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। একটা বইয়ের দাম আমরা রাখছি ১২৫, ১০% ছাড়ে সেটা বিকোচ্ছে ১১২ টাকায়। ওই একই আকারের (মানে একই পৃষ্ঠাসংখ্যা, গড়নের) বইয়ের দাম তাঁরা রাখছেন ১৫০ টাকা। সেটা ২৫% ছাড়ে বিক্রি করছেন। হরেদরে পাঠক সেটা পাচ্ছেন ১১২ টাকায়। তিনি সুজন হিসাবেই পরামর্শ দিলেন — যে পুজোর যে মন্ত্র।
এর সঙ্গেই যুক্ত হচ্ছে বইবিক্রেতার কমিশন। না, কোনও অভিযোগ নেই কোনও বইবিক্রেতার ওপর। তাঁদের এটাই বাণিজ্য, এটাই পেশা। কিন্তু স্বল্পমূল্যের এই বইগুলোতে যদি ৩০ শতাংশ ছাড় তাঁদের দিতে হয় (কারণ তাঁদের ২০ শতাংশ ছাড় পাঠককে দিতে হয়), তাহলে প্রকাশকের আদৌ কিছু থাকে কি? প্রিয় পাঠক, আপনি বুদ্ধিমান। আপনিই ঠিক করুন, বাংলা প্রকাশনার নতুন তরঙ্গ হিসাবে যে প্রকাশনাগুলোকে আপনারা চিহ্নিত করছেন, তাদের কম দামের বইগুলোর ওপর কম ছাড় নেবেন? নাকি সামনের বইমেলায় তারা আকাশছোঁয়া দামের বই করুক এবং তাতে চোখধাঁধানো ছাড় নেবেন?
আমরা নিতান্তই ছোট প্রকাশক। ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর কাটে আমাদের প্রেসের ধার মেটাতে। আর অক্টোবর থেকে জানুয়ারি পকেট খালি হয় প্রেসে অ্যাডভান্স পেমেন্ট দিতে।
এই সমস্যা এখন আমাদের অস্তিত্বের সংকট হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সৃষ্টিসুখ এবং আরও যে নতুন প্রকাশনাগুলো নতুন করে বই করতে চাইছে, তারা না থাকলে কারও বই করা আটকাবে না ঠিকই। কিন্তু যে নতুন বাংলা সাহিত্যের ধারা এবং নতুন প্রকাশনার স্বপ্ন নিয়ে আমরা বলাবলি করছি, সেটাকে বাঁচিয়ে রাখার দরকার আছে কিনা সে সিদ্ধান্ত পাঠককেই নিতে হবে। বই একটা পণ্য, প্রকাশনা একটা বাণিজ্য। শুধুমাত্র সাহিত্যপ্রেমের দোহাই দিয়ে সেটাকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
অথচ তালাই তো আর সুন্দর নেই। তাকে দেখলে বৃদ্ধা মনে হয়। তার চামড়ায় বয়সের কুঞ্চন। তার পেটটি সর্বদাই উঁচু হয়ে থাকে কোনও এক অজ্ঞাত রোগের প্রকোপে। দশ বছরে আটটি সন্তান হলে এইরকমই হয়। মনে মনে নিজের সঙ্গে তালাইয়ের শরীরের তুলনা করে একটা বিকৃত আনন্দ হচ্ছিল ইবার। অথচ, হৃদয়ের গভীরে সে তালাইকে হিংসা করে। তীব্র, বিষময় ঈর্ষা! তালাইয়ের দু’দুটি ছেলের পিতা তার ঈশির। অথচ এতদিনেও সে ইবাকে একটিও সন্তান দিতে পারল না। মাত্রই কিছুদিন আগে তালাই আর তার আট সন্তানের জন্য ইবাকে তার ঝিলের পাড়ের গুহাটি ছেড়ে দিতে হয়েছে। গুহাটি প্রশস্ত ও আরামদায়ক। অতএব তেমন বাসস্থান তালাইয়েরই প্রাপ্য। সন্তানবতী মায়ের আদর সকল গোষ্ঠীতেই বেশি। ইবার ভাগ্যে এখন জুটেছে পাহাড়ের মাথার শীতল অঞ্চলের এই ছোট্ট গুহাটি। বন্ধ্যা মেয়ের এর বেশি কী-ই বা আর প্রাপ্য হতে পারে! তাতে অবশ্য ইবার কোনও দুঃখ নেই। স্বেচ্ছায়, বিনা প্রতিবাদে সে ছেড়ে দিয়েছে তার আরামপ্রদ গুহাটিকে। গোষ্ঠীজীবনের এ-ই তো নিয়ম।
ইবার অবশ্য একটি বিরল সৌভাগ্য আছে। গত দশ বছরে তার প্রতি ঈশিরের আনুগত্য ও ভালোবাসাতে ঘাটতি পড়েনি কোনও। তাদের জুড়িটি এখনও গোষ্ঠীর অন্য মেয়েদের ঈর্ষার বস্তু। শুধু… একটি সন্তান… নিজের প্রাণ দিতে পারে ইবা একটি সন্তানের জন্য। তবু ঈশির কেন তাকে সেটুকু দিতে পারে না! কোন অভিশাপে!
নিচের থেকে দ্রুত পদক্ষেপের শব্দে চমক ভাঙল ইবার। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে দুটি শক্তিশালী বাহু এসে ঘিরে ধরল তাকে। তার দেহে অরণ্য ও চন্দ্রালোকের সুগন্ধ। ইবা ঈশিরের কোল ঘেঁষে এল। তার চোখের জল ধুইয়ে দিচ্ছিল ঈশিরের বুক। কিছু পরে নিজেকে সংযত করে সরে বসল সে। তারপর দৃঢ়স্বরে বলল, “বনের মধ্যে বৃক্ষদেবতার কাছে যাব আমি।”
ঈশিরের গলাটা যেন কেঁপে উঠল একবার — “কিন্তু… তিনি যে সাক্ষাৎ মৃত্যুর অধীশ্বর! যে প্রাণী তাঁর কাছে যায় তারই যে মৃত্যু অবধারিত! বৃদ্ধেরা কি আমাদের বারে বারে সাবধান করে দেন না? তাঁর কাছে যেতে নেই। খেতে নেই তাঁর ফল!”
“কিন্তু ঈশির… ঈশির… তিনিই যে সবচেয়ে শক্তিমান দেবতা! যাঁর নামে স্বয়ং গোষ্ঠীপতিও ভীত হয়ে নতজানু হন, তিনিই কি প্রকৃত ঈশ্বর নন? যিনি অরণ্যের সবচেয়ে শক্তিমান জীবকে মুহূর্তে হত্যা করতে পারেন, ইচ্ছা করলে কি তিনি সামান্য একটি জীবন উপহার দিতে পারবেন না আমার দেহের ভেতরে? ঈশির আমায় সন্তান দেয়নি। এবারে হয় সেই সেই দেবতা আমাকে একটি সন্তান দেবেন, অথবা দেবেন চোখের পলকে মৃত্যু। এই দুটির মধ্যে একটি ছাড়া আর আমার কিছু প্রয়োজন নেই ঈশির।”
ঈশিরের মনের ভিতরটি ভয়ে সংকুচিত হয়ে পড়েছিল, কিন্তু ইবাকে সে জানে। জগতের কোনও ভয়, কোনও প্রলোভনই আর তাকে থামাতে পারবে না এখন। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে বলল, “ঠিক আছে। তবে আজ রাতে নয়। কাল। সূর্যোদয়ের পর।”
অরণ্যের কেন্দ্রস্থলে, নিষিদ্ধ গাছটি নদীর পাশে একা দাঁড়িয়ে থাকে। মাত্রই দশ বছর বয়স তার। তবু, এই বয়সেই উচ্চতায় সে অরণ্যের বহু গাছকেই ছাড়িয়ে গেছে। এখন তার ফল ধরবার ঋতু। লালে হলুদে মেশানো উজ্জ্বল ফলগুলি যেন আলো করে রেখেছে গাছটিকে। তার নিচের ডালগুলি ফলভারে মাটিকে ছুঁয়ে থাকে প্রায়।
একটি হাতি পরিবার সকালের দিকে নদীতে স্নান করতে এসেছিল। কিছু আগে তারা ফিরে গেছে। দলের সবচেয়ে ছোট সদস্যটি একটি ফল শুঁড়ে ধরে পরীক্ষা করতে গিয়েছিল। তার মা তাকে মাথা দিয়ে ধাক্কা মেরে মেরে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে ফের। সাক্ষাৎ মৃত্যুর দূত ওই গাছটিকে তারা সকলেই চেনে। গোটা এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা অজস্র হাড়গোড় ও পচাগলা মৃতদেহ ওই মৃত্যুদুতের শক্তির সাক্ষ্য বহন করে।
ঝোপঝাড় ভাঙবার মৃদু একটা শব্দ উঠল কাছেই কোথাও। প্রথমে একটি শুঁড়, তারপর তার পেছন পেছন সম্পূর্ণ শরীরটাই এবারে বার হয়ে এল বাইরে। হস্তীশিশুটি ফের ফিরে এসেছে। লোভেরই জয় হয়েছে শেষে। মা নেই কাছাকাছি। নিঃশব্দ পায়ে সে এবারে এগিয়ে এল গাছটির কাছে। শুঁড়ে তুলে পরখ করে নিল একটি ফল। তারপর সেটিকে মুখে পুরে দিল। অপূর্ব স্বাদ। এবারে আরও একটা…
পেটভর্তি করে ফল খাবার পর একটু নেশার মতোই হয়ে গিয়েছিল তার। ফলগুলোতে সামান্য মাদক ভাব আছে। শিশুটি এইবারে জলের ধারে রৌদ্রে গিয়ে বসল। তারপর একটি আরামের শব্দ করে আলস্যে শরীর এলিয়ে দিল মাটিতে। তার চোখে ঘুম আসছে।
পেটের ভেতর ফলের কোষগুলি দ্রুত ফেটে পড়ছিল। লক্ষ লক্ষ ভাইরাল ডি এন এ তন্তু তাদের নিউক্লিয়াসের বাসা ছেড়ে বার হয়ে আসছিল। পাচকরস তাদের কোনও ক্ষতি করতে পারেনি। অর্ধপাচিত খাদ্যের সঙ্গে মিশে তারা এগিয়ে গেল অন্ত্রের দিকে। তারপর সেখান থেকে পাচিত খাদ্যরসের সঙ্গে রক্তস্রোতে মিশে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল আক্রমণকারীরা।
হস্তীশিশুটি নরম রৌদ্রে পিঠ দিয়ে ঘুমায়। ফলের মাদকরস তার নার্ভতন্ত্রকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। আর ঠিক সেই সময় তার দেহের প্রতিটি কোষের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছিল এক-একটি আগন্তুক ডি এন এ তন্তু। আমূল বদল আনছিল কোষের গঠনে। কোষগুলি বদলে যাচ্ছিল প্রভুজীবের দেহকোষে। বদলাল না শুধু দেহের গঠন ও স্মৃতি। সেটা পরবর্তী প্রজন্মের সৃষ্টির আগে সম্ভবও নয়।
পড়ন্ত রোডের আলোয় ঘুম ভাঙল শিশুটির। মাদকের নেশা কেটে গেছে। সেই আচ্ছন্নতার মধ্যেই নিজের অগোচরে সে নিজেও বদলে গেছে ভেতর থেকে। চোখ পিটপিট করে চারদিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়াতে চাইল সে একবার। আর তার পরেই টলে উঠে আছড়ে পড়ল মাটির বুকে। সদ্য পরিবর্তিত, মানবকোষের মতো করে গড়ে তোলা দেহকোষগুলি একটা হাতির দেহকাঠামোকে আর নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম নয়। সমস্ত দেহ ও চেতনাটাই তার একটা চূড়ান্ত বিভ্রান্তির সম্মুখীন হয়েছে। একে একে তার শরীরের প্রধান যন্ত্রগুলি অচল হয়ে আসে। তারপর, এক তীব্র যন্ত্রণাদায়ক সময়ের পরে তার হৃৎপিণ্ডটি থেমে গেল।
আছড়ে পড়া মৃতদেহটির দিকে তাকিয়ে দেখল একবার প্রজাপতিটি। আরও একটি ব্যর্থ পরীক্ষা। আরও একটি মৃত্যু।
=================
‘নিষিদ্ধ ফল’ গল্পের অংশবিশেষ।
সংকলন — ঈশ্বরী
লেখক — দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
রোহণ — আমি তোমার লেখা পড়েছি একেবারে পাণ্ডুলিপি হিসাবে। অনেক ম্যাচিওরড লেখা সেগুলো। কিন্তু সবারই একটা হাতমকশোর ব্যাপার থাকে। সেই গল্পটা জানি না। তোমার লেখালেখির শুরুটা নিয়ে বলো।
সঙ্গীতা — শুরু বলতে স্কুলে দেওয়ালপত্রিকায় ছোট দু-চারটে কবিতা লিখে নিজে নিজেই খুশি হওয়া। তারপর আর কখনওই কিছু লিখিনি। কলেজ শেষ করে চাকরিজীবনের শুরুতে মিনিয়াপলিসে গিয়ে দেখি সেখানে অনেক আগে প্রতি পুজোয় একটা ম্যাগাজিন বেরোনোর চল ছিল, নাম ‘সন্নিকট’, যেটা লেখা ও উদ্যোগের অভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমি অতি উৎসাহে সেই ম্যাগাজিনের দায়িত্ব নিয়ে লেখা যোগাড় করার পাশাপাশি নিজেই লিখতে শুরু করি এবং তাতে বাৎসরিক একটা করে গল্প লিখতে থাকি। এই সময়েই বাংলালাইভ-এর খোঁজ পাই। সেখানে মজলিশ এবং মাসিক পত্রিকা বিভাগে লেখা নেওয়া হত। সেই ছিল আমার হাতমকশোর স্লেট। মজলিশে ছোট গল্প বা প্রাসঙ্গিক সামাজিক ঘটনা নিয়ে লিখতে লিখতে বেশ উৎসাহ পাই এবং সাহস করে ওদের মাসিক পত্রিকায় লেখা দিই একটি। সেই লেখাটি ভীষণভাবে চর্চিত হয়েছিল সাইটের ‘মতামত’ বিভাগে। এরপর ওদের শারদীয় সংখ্যাতেও লিখেছি দু-একবার। তবে মজলিশ বিভাগে নিয়মিত পাঠকদের পজিটিভ এবং নেগেটিভ ফিডব্যাকের মধ্যে দিয়ে চলতে থাকে আমার হাতমকশোর পাঠ।
সরাসরি পাঠকের প্রতিক্রিয়া পড়তে পড়তেই একবার সাহস করে দেশ পত্রিকার অফিসে গিয়ে কবিতা জমা করে আসি এবং আমাকে অবাক করে দিয়ে কিছুদিন পরে কবিতা দপ্তর থেকে চিঠি আসে আমার পাঠানো চারটি কবিতা থেকে দুটি তাঁদের পছন্দ হয়েছে। এই সময়েই ২০০৭-এ আনন্দবাজার রবিবাসরীয় বিভাগ একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করে, যাতে সীমিত শব্দসংখ্যার মধ্যে (সংখ্যাটা মনে নেই এখন) গল্প লিখে পাঠাতে হবে। গল্পের প্রথম লাইনটি ওরা লিখে দিয়েছিলেন। বলা হয়েছিল মনোনীত গল্পটি রবিবাসরীয়র পাতায় ছাপা হবে। আমি আবার অতি দুঃসাহস দেখিয়ে একখানা গল্প লিখে পাঠাই এবং আবারও আমাকে অবাক করে গল্পটি রবিবাসরীয়তে ছাপা হয়।
এরপর আমি মাঝেমাঝেই লিখতে থাকি। কখনও বড় পত্রিকায় কখনও লিটল ম্যাগাজিনে। তবে একটা কথা মানতেই হবে লেখার অভ্যেসের ব্যাপারে প্রথমে বাংলালাইভ আর পরে ফেসবুক আমাকে খুব বড় প্ল্যাটফর্ম দিয়েছে। হাতমকশো এখনও চলছে, তবে তা মূলত ফেসবুক এবং বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়।
রোহণ — যে কোনও লেখকেরই লেখালেখির মূলে থাকে তাঁর পড়াশোনা। তোমার লেখালেখির শুরুতে পড়াশোনাটা কেমন ছিল? সেটা কীভাবে তোমার লেখাকে প্রভাবিত করেছে বলে মনে হয়?
সঙ্গীতা — লেখালেখির শুরুতে পড়াশুনো কিচ্ছুই ছিল না আলাদা করে। আর যখন লিখতে ভালোবাসতে শুরু করলাম, তখন হাতের কাছে পড়ার জন্য সবচেয়ে বেশি পেতাম খবরের কাগজ। সেটা খুব ভালোবেসে পড়তাম, কারণ মূলত যে বাঙালি সমাজের গল্প লিখতাম, তাঁদের থেকে অনেক দূরে বিদেশে এক্কেবারে অন্যরকম মানুষজনের সাথেই থাকতাম বেশি। অতএব খবরের কাগজে পড়া সাম্প্রতিক ঘটনা আমাকে লেখার বিষয় জোগাত কিছুটা হলেও।
পরে আমি বুঝতে পারি যে, লিখতে গেলে পড়তে থাকাটা জরুরি। পড়তে শুরু করি যা পাই তাই-ই। এমনকী ম্যাপও পড়তাম। দেখেছিলাম ম্যাপে একটা জায়গার নাম পড়ে আমার বেশ ভাবতে ভালো লাগত, সেসব জায়গার মানুষের জীবনযাত্রা, পোশাক, তারা দুধ থেকে ছানা বানায় নাকি চিজ, মাংস কীভাবে রাঁধে, পোড়ায় না সেদ্ধ করে। থ্যাঙ্কস টু গুগল, নিজের ভাবনার সাথে কতটা মেলে সেটা অনায়াসে খুঁজে বারও করতাম। অতএব একটা জায়গার নাম থেকে উইকিতে সেটাকে খুঁজে তার লোকজন, জীবনযাত্রা অবধি গিয়ে হয়তো পরের সার্চটা দিলাম ‘ফেমাস মানুষ অফ অমুক প্লেস’… এভাবে পড়েই যেতাম। এদিকে পাশাপাশি পড়তাম বাংলা গল্পের বই। বুঝতে চেষ্টা করতাম কোন ধরনের লেখা আমাকে টেনে রাখে। এটাও জরুরি, জানো? মানে কেমন লেখা পড়তে ভালো লাগে আর কেমন লেখা বেশিক্ষণ টেনে রাখে না, সেটা বুঝে নিজের লেখাতেও সেটা অ্যাপ্লাই করা যায় বলে মনে হয় আমার।
আর একটা কথা শুনতে একটু অদ্ভুত লাগলেও বলি, আমার লেখাকে প্রভাবিত করে ভালো ইলাস্ট্রেশন। মানে আমার লেখার ইলাস্ট্রেশন নয়। ধরো, আমি পুরনো ইন্দ্রজাল কমিক্স বা দেব সাহিত্য কুটিরের কোনও বই খুলে কোনও ছবির দিকে তাকিয়ে আছি অনেক সময়। এমনকী চাঁদমামা বা ছোটদের যে কোনও বইয়ের ইলাস্ট্রেশনই অনেকক্ষণ দেখি বসে বসে। কোনও ভালো ইলাস্ট্রেশন মাথার মধ্যে নাড়াচাড়া করতে করতে অনেক লেখা উঠে এসেছে আমার। একটা ভাঙা দেওয়ালের পাশে একটা পাগড়ি পরা লোক উঁকি দিচ্ছে আর ঝুড়ি মাথায় মহারাস্ট্রিয়ান স্টাইলে শাড়ি পরা এক ফেরিওয়ালি হেঁটে যাচ্ছে পিছন ফিরে… এমন একটা ইলাস্ট্রেশন যে গল্পেরই হোক না কেন, আর একটা গল্প জন্ম দেয় মাথার মধ্যে। এই সবের প্রভাবই আমার লেখার মধ্যে আছে মনে হয় আমার।
রোহণ — তুমি এর আগে বলেছ ফেসবুক তোমার জন্যে একটা বড় প্ল্যাটফর্ম। এটা কি জাস্ট তোমার লেখালেখি বা বইয়ের প্রচারের জন্যে? নাকি এখানেও ভাবনার আদানপ্রদান বা ইন্টার্যাকশান হয়ে চলেছে? সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং এখন সাহিত্যকে কতটা প্রভাবিত করছে বলে তোমার মনে হয়?
সঙ্গীতা — ভাবনার আদানপ্রদান কিছুটা থাকে কোনও সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে লিখলে। কোনও ঘটনাকে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কে কীভাবে দেখছে তা জানা যায়। যেমন ধরো, আমি এখনকার টিভি সিরিয়ালে বাচ্চাদের চরিত্রায়নের সমালোচনা করে লিখলাম এবং দেখলাম আমি একা নই, এ নিয়ে প্রচুর মানুষ চিন্তিত এবং ক্ষুব্ধ। লেখার নিচের মন্তব্য, শেয়ার ইত্যাদি দেখে আমি আন্দাজ করতে পারি সাধারণ মানুষ কী চায়, কী চায় না। কিন্তু সেটা আমাকে লেখার ব্যাপারে প্রভাবিত করবে না, কারণ আমি টিভি সিরিয়ালের চিত্রনাট্য লিখি না। লেখালেখির জন্য ফেসবুক আমার প্ল্যাটফর্ম অন্যভাবে। আমি লিখছি। কখনও পরিচিত ছন্দের বা লেখার ধরনের বাইরে গিয়ে লিখছি, দেখছি কতজন পড়ছে, কেমন মন্তব্য করছে… শিখছি সেগুলো থেকেও। যেমন একবার ছোটদের একটি পত্রিকার জন্য গল্প লিখে আমি গল্পের নাম দিয়েছিলাম ‘দাদা হওয়া’। পত্রিকাটিতে লেখাটা ছাপা হয়েছিল, প্রশংসিতও হয়েছিল। আমার টাইমলাইনে লেখাটি যখন দিই, তখনও অনেকেই খুব ভালো ভালো মন্তব্য করেন। শুধু একজন লিখেছিলেন, গল্পের নামেই তো গল্পটা বলে দিয়েছ। এরপর আর গল্পটা না পড়লেও জানা যায় যে, কী আছে গল্পে। কথাটা কিন্তু ঠিক। ছোটদের জন্য লিখেছি, তাই অত মাথাতে আসেনি যে, গল্পের নামকরণেই মূল গল্পটা দেওয়া উচিত না। পরের বার থেকে গল্প সে ছোটদেরই হোক বা বড়দের, নামকরণ ভেবেচিন্তে করি।
তাছাড়া সোশ্যাল নেটওয়ার্কে যথেচ্ছ লেখার স্বাধীনতা আছে। ফলে, হয়তো আমি এমনিই লিখতে বসলাম এবং দেখলাম একটা ছোট অণুগল্প লিখেও ফেললাম। লোকে পড়ল, মতামত দিল, আমিও উৎসাহ পেলাম আরও অণুগল্প লেখার। পরীক্ষামূলক লেখা নিজের ইচ্ছেমত ফর্মে লেখার স্বাধীনতাও সেখানে আছে ভালোমত। ভালো লেখার খিদে জন্মানোর ব্যাপারে পাঠকের মতামতের একটা বিরাট ভূমিকা আছে, যা সোশ্যাল নেটওয়ার্ক দেয়। আমাকে দিয়েছে। লিখতে ভালোবাসি, কেউ পড়ছে জানলে আরও ভালো লাগে, ভালো লাগে তাৎক্ষণিক ফিডব্যাকও। যথেচ্ছ লেখার এবং সে লেখা পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অবাধ স্বাধীনতা সোশ্যাল নেটওয়ার্কই সবচেয়ে বেশি দেয়।
আর হ্যাঁ, বইয়ের প্রচারের জন্যও খুব কার্যকরী। আমি যত বড় পত্রিকাতেই লিখি না কেন, ক’টা মানুষ আমার লেখা পড়ছেন ভালোবেসে আমি কখনই জানতাম না এবং আমার বই বেরোলেও তা কেউ কিনতে চান কিনা এবং কেউ আদৌ কিনবেন কিনা তাও আমার অজানাই থাকত। আমি যখন ফেসবুকে আমার বই বেরোনোর কথা জানালাম, তখন আশাতীত আগ্রহ দেখেছিলাম পাঠকের। আমার মনে হয় আমার বই যে পাঠকরা নিজেরাই খুঁজে কিনেছে, তার কারণ তারা বইয়ের নাম, ধাম, ঠিকানা সবই ফেসবুকের মাধ্যমে জানতে পেরেছিল ঠিকমতো।
তবে এটাও ঠিক সোশ্যাল নেটওয়ার্কে যারা মতামত দেন, অনেকদিন ধরে লিখতে লিখতে তাঁদের সাথে লেখকের একটা পরিচিতি গড়ে ওঠে। তাই কিছুদিন লেখার পর থেকে লেখকের নিজের লেখা ইভ্যালুয়েট করতে শেখাটা খুব জরুরি। কারণ অনেক সময়েই ফিডব্যাকগুলো সাহিত্যের বিচারে আসে না, আসে পরিচিতির কারণে। লাইক বা কমেন্ট দিয়ে জনপ্রিয়তার মাপ বোঝা গেলেও নিজের লেখার সাহিত্যমূল্য বুঝতে গেলে শুধুমাত্র সোশ্যাল মিডিয়ার ফিডব্যাকের ওপর নির্ভর করাটা আমার ঠিক মনে হয় না। লেখার কারণে লেখাটি আদৃত, না লেখকের কারণে, সেটা বোঝার মতো ম্যাচিওরিটি না থাকলে সোশ্যাল মিডিয়াতে পাওয়া মন্তব্য একজন লেখকের লেখার ক্ষমতা সীমিত গণ্ডিতে বেঁধে ফেলতেও পারে। অতএব ভালো এবং মন্দ দুদিকেই সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব বেশ ভালোমতই থাকে আমার মতে।
রোহণ — পাঠকের মতামতকে একজন লেখক গুরুত্ব দেবেন সেটা স্বাভাবিক। ফেসবুক সেটার একটা বড় মাধ্যম বোঝা গেল। কিন্তু কোনও লেখা লিখতে শুরু করে পাঠকের মতামতের ব্যাপারটা কি তোমার মাথায় আসে? ধরো, ‘চন্দ্রলেখার প্রেম’ গল্পটা। একটা ব্যাঙ একজন মানুষকে ভালোবাসতে শুরু করেছে। ব্যাপারটা তো একেবারেই ফ্যান্টাসি, তোমার অন্য লেখার থেকে অনেকটাই আলাদা। লেখার সময় মনে হয়নি, তোমার অন্য লেখার থেকে একেবারে অন্যরকম এটা, পাঠকের হয়তো ভালো লাগতে না-ও পারে?
সঙ্গীতা — না, লেখার সময় পাঠকের মতামতটা নিয়ে ভাবি না। যা যেভাবে মাথায় আসে, তাই-ই লিখি। নিজের ফ্যান্টাসিকে কাগজে ফুটিয়ে তোলার সময় আমার ভাবনা আর কলম ছাড়া আর কিছুই থাকে না মাথায়। স্বার্থপরের মতো নিজের ভালোলাগাটাকেই প্রাধান্য দিই তখন। ‘চন্দ্রলেখার প্রেম’ লিখতে বসে আমি নিজেও জানতাম না লেখাটা কীভাবে এগোবে। লিখেছিও অনেকদিন ধরে। ওটা একটা চ্যালেঞ্জের মতো ছিল আমার কাছে। আমি কীভাবে ভাবতে পারি, কতদূর অবধি ফ্যান্টাসির মধ্যে গল্প বুনতে পারি, সেটা আমি জানতাম না। আজও যে জানি তা নয়। তবে ওই গল্পটা লিখতে বসে বুঝেছিলাম আমাদের ভাবনার পরিধি আমাদের কাছেও অজানা। তাই ভাবনার পায়ে কখনও শিকল পরাতে নেই। বরং তাকে লাগাম ছেড়ে ছুটতে দাও আর নিজেও ছোটো তার সাথে। যদিও লেখা শেষ করেই বুঝেছিলাম, কোনও ম্যাগাজিনের সম্পাদক এই গল্পটা ছাপবেন না। ছোটদের ম্যাগাজিনের সম্পাদকের কাছে ওটা ‘বড়দের রূপকথা’ আর বাকি সব ম্যাগাজিনের জন্য ওটা ‘ম্যাগের বাকি গল্পের সাথে যায় না’। তাও লিখেছি। কিচ্ছু না ভেবে শুধু চন্দ্রলেখা নামে একটা ব্যাঙকে ভালোবেসে লিখেছি, কারণ লেখা প্রথমে লেখকের, তারপর পাঠকের। পাঠকের মতামত ভীষণ মূল্যবান। লিখতে পারছি কিনা, লেখার ধরন পাঠককে টানছে কিনা, এগুলো বোঝা যায় মতামত থেকে। পরের লেখা এডিট করতে বসে সেই কথাগুলো মাথায় রাখলে লেখাটা যথাযথ সাজানো যায়। কিন্তু বিষয়বস্তু নির্বাচনে বা লেখার গতিপ্রকৃতির দিক নির্ণয়ের ক্ষেত্রে ওই মতামতটা গৌণ।
আমার মতে লিখতে বসে মাথায় কিছু না রাখাই ভালো। কারণ আগে লেখা, তারপর মতামত। আগে মতামত, তারপর লেখা নয়।
রোহণ — দারুণ ভাবনা এটা। সত্যি বলতে কী, কিছু কিছু পাণ্ডুলিপি পড়তে পড়তে মনে হয়, লেখক আগে থেকেই ঠিক করে নিয়েছেন একটা গল্প বা কবিতা কোথায় ছাপতে দেবেন সেটা ভেবে লিখছেন। একজন পাঠক হিসাবে সামান্য হলেও নিজেকে বঞ্চিত মনে হয় সেই সময়। যাই হোক, পরের প্রশ্নে আসি। ‘সুয়োকথা দুয়োকথা’ তোমার প্রথম বই। বইমেলায় তুমি গিয়েছিলে বইপ্রকাশের পর। তোমার পাঠকদের সঙ্গেও দেখা হয়েছে সে সময়। কেমন অভিজ্ঞতা হল?
সঙ্গীতা — অবিশ্বাস্য লাগছিল প্রথমে। বইমেলায় স্টলে সাজানো একরাশ বই, তাতে শুধু আমার লেখা কিছু গল্প, এমন কিছু কখনও কল্পনাই করিনি আমি। অনেকে এসেছেন, আমাকে খুঁজে বলেছেন বই কিনেছি, সই চাই। হাত কাঁপছিল তখন। কারণ এমন কোনও মুহূর্ত আমার কল্পনায় ছিল না কখনও। অনেকের সাথে সামনাসামনি আলাপ হয়েছে যারা, ফেসবুকে বা অন্য পত্রিকায় আমার লেখা পড়েছেন আগে এবং আরও পড়তে চেয়েছেন। ফেসবুকে বইয়ের খবর পেয়ে কিনতে এসেছেন। নিজের শখে লিখতে বসে এত মানুষের মনে পৌঁছতে পারব, এটা ভাবার কথাও ভাবিনি আমি কোনওদিন। নিজের লেখা বই অন্যের হাতে দেখার যে আনন্দ, তা ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতা আমার নেই। কেউ অভিনন্দন জানিয়েছেন, কেউ বলেছেন এই তো শুরু, আরও অনেক দূর যেতে হবে, কেউ বলেছেন পড়ে জানাব কেমন লাগল। আমার কেবলই মনে হচ্ছিল এও কি সত্যি!

সঙ্গীতা এবং লেখক, বার্ড ফটোগ্রাফার রূপঙ্কর সরকার, কলকাতা বইমেলা ২০১৭
রোহণ — এখন কী লিখছ? কোনও নতুন পাণ্ডুলিপি কি তৈরি হচ্ছে?
সঙ্গীতা — হ্যাঁ, লিখছি। আমোদিনী লিখছি ধীরে সুস্থে । আর তাছাড়া বেশ কিছু অণুগল্প লিখেছি, যেগুলো ফেসবুকে বা অন্যান্য ম্যাগাজিনে দিয়েছি। আরও কিছু অণুগল্প লিখে একটা সংকলন করতে চাই। প্রতিটি গল্প একেবারে আলাদা ধরনের যেন হয়, সেটা মাথায় রাখতে ব্রেক নিয়ে নিয়ে লিখছি। তাছাড়া বেশ কিছু পত্রিকায় নিয়মিত এবং কোথাও অনিয়মিত গল্প লিখছি। যেমন জিলিপি, অন্যদেশ, বম্বে ডাক ইত্যাদি। কিছু ম্যাগাজিন বছরে এক বা দু’বার বেরোয়, বৈশাখী ও শারদীয়া। সেরকম কয়েকটায় লিখছি। লিরিক্যালের একটা গল্প সংকলনের জন্যও লিখছি। তবে মনোযোগের সিংহভাগ জুড়ে আছে আমোদিনী।
রোহণ — যদ্দূর জানি আমোদিনী একটা সিরিজ হিসাবে আগে প্রকাশ পেত ফেসবুক। আমোদিনী সম্পর্কে কিছু বলো প্লিজ।
সঙ্গীতা — হ্যাঁ, আমোদিনীর বেশ কিছু গল্প ফেসবুকে আমার পাতায় প্রকাশিত। পরে ফেসবুকেরই একটা কমিউনিটি তাদের মাসিক পত্রিকাতেও সিরিজটা ছাপতে শুরু করে। কিন্তু বারোটা গল্প প্রকাশের পর আমি পত্রিকাটিতে আমোদিনী দেওয়া বন্ধ করে দিই। কারন আমোদিনী যত জনপ্রিয় হয়েছে, তত আমি চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করেছি নিজেকে। আমোদিনীর প্রতিটি গল্প আলাদা ধরনের রাখতে চাই, তাই পত্রিকার ডিমান্ড আর ডেডলাইন মেনে লেখা সম্ভব হচ্ছিল না। ওই যে, নিজের জন্য লেখা… ওটা মাথায় রেখেই অনেকদিন পর পর ভেবে চিন্তে একটা করে গল্প লিখছি। এখনও আমি প্রায়ই পাঠকের কাছ থেকে অনুরোধ পাই ‘আমোদিনীকে আনো’ বলে। সুয়োকথা দুয়োকথা বেরোনোর সময়ে অনেকেই বলেছেন ‘সে কী! আমোদিনী বেরোবে না বই হয়ে?’ বইমেলাতে বারবার শুনেছি পরেরবার আমোদিনী আসছে তো?
রোহণ — আমাদের এতটা সময় দেওয়ার জন্যে অনেক ধন্যবাদ সঙ্গীতা। পাঠকদের মতো আমরাও অধীর অপেক্ষায় থাকব আমোদিনী-র বই হয়ে আসার অপেক্ষায়। আগাম শুভেচ্ছা রইল।
বিড়াল আপনার মুলোর তরকারির ভাগ পেয়েছে? সাবধান! একঘরে রাত কাটাবেন না। বিড়ালের থেকে আত্মরক্ষার এমন অজস্র টিপস্ রয়েছে মাত্র এক ক্লিক দূরত্বে।
সৌরাংশু সিংহ আরো যোগ করেছেন-দোগন পদ্দিস একটি দু পেয়ে অলপ্পেয়ের নাম। ক্ষণজন্মা অলপ্পেয়ে। কথায় বলে না বোলার যদি ক্যাপ্টেন হয় তাহলে হয় বেশি বোলিং করে অথবা কম! ইনি কম। প্রকৃত ক্যাপ্টেনের মতো পিছন থেকে নেতৃত্ব দিতে ভাল বাসেন। কিন্তু তাতে তার প্রতি ভালবাসা একটুও কমে না আমার।
দোগন পদ্দিস রচিত ‘প্রতিবেশীর বিড়ালের সঙ্গে ভাব জমানোর সহজ উপায়
]]>