বাংলায় ছোটদের জন্য লেখালেখি নবজাগরণের সমবয়সি। রূপকথার যে আদলটিকে আমরা সযত্নে ধার করে নিলাম— ঈশপের, গ্রিমভাইদের, হান্স অ্যান্ডারসনের পথ ধরে, সে রূপকথাতে অনেক ক্ষেত্রেই মেয়েদের খুব একটা কাজে দেখতে পাওয়া যায় না। গোটা শিশুসাহিত্যের এলাকাতে আজব পুরুষ প্রাধান্য। আন্তর্জালে, এক মার্কিন মহিলার লেখা ব্লগে দেখছি তিনি নিজের কন্যার জন্য বই কিনতে গিয়ে শিশুসাহিত্যের গপ্পো বইতে রীতিমতো আদমশুমারি করে দেখেছেন, সমস্ত চরিত্রদের সংখ্যাগুরু পুরুষ চরিত্র, অতি অল্প মেয়েচরিত্র। আর হ্যাঁ যাবতীয় অ্যাডভেঞ্চার বা গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র পুরুষ। যাবতীয় রাক্ষস খোক্কস জাতীয় চরিত্রেরাও বাই ডিফল্ট পুরুষ, এমনকি পশুপাখি চরিত্ররাও বাই ডিফল্ট মিস্টার ফক্স, মিস্টার পর্কুপাইন গোছের।
ইংরেজি শিশুসাহিত্যের দুনিয়ার এই ছায়া আমাদের দেশের শিশুসাহিত্যেও অত্যন্ত প্রকটভাবে আছে। ছোটবেলা থেকে পড়া পঞ্চতন্ত্র থেকে শুরু করে যাবতীয় শিশুমোহিনী কাহিনিতে যে কোনও চরিত্র— হাঁস বেড়াল কুকুর শেয়াল বাঁদর বা সিংহ, কারুকে মেয়ে বলে আলাদা করে মনে করতে পারছি না। টুনটুনির বইয়ের টুনটুনি মেয়ে হতেও পারে। কিন্তু মজন্তালী সরকার, হ য ব র ল-র বেড়াল বা কাক্কেশ্বর কুচকুচে, ব্যাকরণ সিং থেকে বড়দের বইয়ের লম্বকর্ণ অব্দি বিস্তৃত গল্পের পশুচরিত্রেরাও লিঙ্গগতভাবে পুরুষ। রূপকথার বইগুলি চূড়ান্ত জনপ্রিয় হয়েও প্রায় যেন দাগিয়ে দাগিয়ে দেখিয়ে দেয় মেয়েদের সক্রিয় ভূমিকার অনুপস্থিতি। একটি বাড়ন্ত বয়সি মেয়েপড়ুয়ার কোথায় যেন অতৃপ্তি থেকেই যায় রূপকথার গল্পে।
বিশেষ করেই বলতে হবে, অধিকাংশ রূপকথাই অসহায় রাজকন্যাকে “উদ্ধার” ও “জয়” করার গল্প। রাজপুত্ররা যাবে ঘোড়ায় চেপে দূরের অভিযানে। আর নানা দুর্বিপাক বিপদ জয় করে শেষ পর্যন্ত সফল হলে পুরস্কার হিসেবে জুটবে অচেনা দেশের রাজামশাইয়ের কন্যাটিকে, সঙ্গে গ্যারান্টি হিসেবে অর্ধেক রাজত্ব। একেবারে কড়ায়গন্ডায় হিসেব। লালকমল নীলকমল, বুদ্ধু ভুতুম থেকে গুগাবাবা অব্দি। রাজকন্যেরা সবাই অতি সুন্দরী হবেন, বিপদ-টিপদ তাঁদের জন্য নয়। ফুলের ঘায়ে মুচ্ছো যায় টাইপের চরিত্র।
তারা গল্পে নিষ্ক্রিয় বা প্যাসিভ ভূমিকার স্টিরিওটাইপে বন্দি। ঘুমিয়ে থাকা রাজকন্যাকে রুপোর কাঠি সোনার কাঠি দিয়ে জাগিয়ে তোলার গল্প অথবা স্লিপিং বিউটি— যেদিকেই যাই এমন নঞর্থক নিষ্ক্রিয় মেয়েতে ভরপুর থাকে রূপকথারা।
বিদেশি গল্পের সেই “সত্যিকার রাজকন্যা”, যার দশ পরত কম্বল ও কুড়িটা তোশকের তলায় রাখা একটা কড়াইদানাও পিঠে লাগে, এতটাই পেলব ও সূক্ষ্ম না হলে বুঝি রূপকথার রাজকন্যা হওয়া যায় না। অন্যদিকে রাজপুত্তুররা কুড়মুড় করে লোহার কড়াই চিবিয়ে খান। এই ভয়ানক ও চূড়ান্ত বৈপরীত্য ভেঙে, রূপকথাকে উদ্ধার করে মেয়েদের ফেরত দেওয়া আমাদের প্রজন্মে এসে অবশ্যকর্তব্য ঠেকছে বইকি।
এইসব গল্প পড়তে পড়তে বড় হয়ে ওঠা পুরুষ শিশু আর মেয়ে শিশু দুই-ই তৈরি করে সেইসব ঐকাত্ম্য, নিজেকে দেখার চোখ আর বিপরীত লিঙ্গকে দেখার চোখ নিজের অজান্তেই এমন শক্তপোক্তভাবে তৈরি হয়ে যায় যা সারাজীবন ধরে বয়ে বেড়াতে হয়। যা আজকের দুনিয়ায় চলার পথে তাদের প্রস্তুত তো করবেই না, ঠেলে দেবে হয়তো চূড়ান্ত ভুল কিছু সিদ্ধান্তের দিকে। নারীঘৃণার শিকড় থাকে এইসব দেখায়— মেয়েদের শুধুই ভোগ্য, অবলা, পটের বিবি দেখতে চাওয়ার ভেতরেই ছোট ছেলেরা মেয়েদের অপর, ঊনমানব ভাবতে থাকে।
মেয়েরাও নিজেদের অক্ষম ভাবতে থাকে। কেননা বাইরের কোথাও সে তার বিপরীত চিত্র বা চিত্রণ কোনোটাই দেখতে পায় না। জীবনযুদ্ধে অংশগ্রহণের স্বাভাবিক কাজগুলোর মধ্যে বাজার যাওয়া, কাঠ কাটা, ধান কাটা, অথবা সাইকেলে পাম্প দেওয়াও পড়ে, দূর দূর জায়গায় গিয়ে চাকরি করাও… সে কাজের ভেতরে ডাকাত ধরা বা গুন্ডা পেটানোও থাকতে পারে যে, মেয়েদের, সে কথা ব্যতিক্রম নয়, স্বাভাবিক ঢঙেই বলতে হবে তাই।
মেয়েদের ব্যতিক্রম হিসেবে দেখানো হয়েছে যে সব গল্পে, শেক্সপিয়ার থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ অব্দি, নির্দয় নিষ্ঠুরের মতো, শেষ অব্দি দস্যি মেয়েগুলোকে নাক কান মুলে মূলধারায় ফিরিয়ে দিয়েছেন। ‘টেমিং অফ দ্য শ্রু’ থেকে ‘সমাপ্তি’ অব্দি, গাছে চড়া আর হেঁকে কথা বলা জাঁহাবাজ মেয়েদের শেষ অব্দি রান্নাঘর আর পতিসেবায় গতি!
তাই নতুন করে ভেঙে গল্প লিখছেন আজকের মেয়েরা। কী পাশ্চাত্যে, কী আমাদের দেশে। বিদেশে মেয়েদের কেউ কেউ ডাম্প ট্রাকের ড্রাইভার করে পাঠিয়ে দিচ্ছেন ময়লা ফেলতে। হাতেকলমে কাজের জগতে, পাথর ভেঙে জল আনতে পাঠাচ্ছেন বা ট্যাক্সি চালাতে। কথায় বলে, if they can see it, they can be it।
যশোধরা রায়চৌধুরী











Be the first to review “দস্যি মেয়ের রূপকথা ২”